যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের সঙ্গে দ্রুত বাড়ছে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ। কিন্তু এসব বিশাল স্থাপনা ঘিরে স্থানীয় মানুষের উদ্বেগও তীব্র হচ্ছে। বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা, পানির ব্যবহার, অবকাঠামোর ওপর চাপ এবং নির্মাণকাজের দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ—সব মিলিয়ে অনেক এলাকাতেই তথ্যকেন্দ্র এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে।
তথ্যকেন্দ্র নিয়ে জনমনে বাড়ছে আপত্তি
দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে তথ্যকেন্দ্রবিরোধী মনোভাব রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। ওহাইও থেকে ওয়াইওমিং পর্যন্ত বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা এমন প্রকল্প নিয়ে আগের তুলনায় বেশি সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন।
পেনসিলভানিয়ায় গভর্নর জশ শাপিরো তথ্যকেন্দ্রকে অঙ্গরাজ্যের দ্রুত অনুমোদন ব্যবস্থার বাইরে রেখেছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় অনুমোদন, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার নিয়ে বাধ্যতামূলক অঙ্গীকার এবং স্থানীয় জনগণের জন্য সুবিধা নিশ্চিত করার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
জনগণের প্রশ্নও এখন স্পষ্ট—তথ্যকেন্দ্র থেকে লাভ করবে কারা, আর দীর্ঘমেয়াদি খরচ বহন করবে কারা?
বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে অন্তত চার হাজার তথ্যকেন্দ্র চালু রয়েছে। আরও প্রায় তিন হাজার নির্মাণাধীন বা পরিকল্পনাধীন। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এসব তথ্যকেন্দ্র দেশটির মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ৯ দশমিক ৫ থেকে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত নিতে পারে। ২০২৪ সালে এ হার ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
বড় তথ্যকেন্দ্রগুলো বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করার পাশাপাশি শীতলীকরণের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানিও ব্যয় করতে পারে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, নতুন প্রকল্পের কারণে বিদ্যুতের দাম বাড়তে পারে এবং পানির ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
এক জরিপে দেখা গেছে, ৭১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক নিজেদের এলাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের বিরোধিতা করেন। স্থানীয় প্রকল্প সম্পর্কে মানুষ সবচেয়ে বেশি জানতে চায় বিদ্যুৎ, পানি ও পরিবেশের ওপর এর প্রভাব।
কোম্পানির খরচ কোম্পানিকেই দিতে হবে
সমাধান হিসেবে লেখক এমন একটি নতুন সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছেন, যেখানে বড় তথ্যকেন্দ্র নিজেদের তৈরি করা অবকাঠামোগত খরচ নিজেরাই বহন করবে।
প্রতিটি বড় তথ্যকেন্দ্রের জন্য আলাদা বিদ্যুৎ চুক্তি করার প্রস্তাব রয়েছে। এতে নির্দিষ্ট সক্ষমতার জন্য ন্যূনতম অর্থ প্রদান, নতুন উপকেন্দ্র ও বিদ্যুৎ সংযোগ তৈরির খরচ বহন এবং প্রকল্প ছেড়ে দিলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান থাকতে পারে।
একই সঙ্গে তথ্যকেন্দ্রের চাহিদা পূরণে নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে। পুরোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে নতুন প্রকল্প চালু করলে অন্য গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রকল্পের তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব
অনুমোদনের আগে প্রতিটি প্রকল্পের জন্য সাধারণ মানুষের বোঝার মতো একটি তথ্যপত্র প্রকাশের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেখানে কত বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার হবে, কী ধরনের শীতলীকরণ ব্যবস্থা থাকবে, বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসবে, সরকারি সুবিধা কতটা দেওয়া হবে এবং কত স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে—এসব তথ্য থাকতে হবে।
সড়ক, জরুরি সেবা ও কর্মীদের প্রশিক্ষণে প্রকল্পটি কতটা অবদান রাখবে, সেটিও জানাতে হবে। প্রকল্প চালুর পর স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করার প্রস্তাব রয়েছে।

সরকারি অর্থ বা জনসম্পদ ব্যবহার করা হলে সংশ্লিষ্ট চুক্তিও প্রকাশ্য রাখার কথা বলা হয়েছে। ভুল বা মিথ্যা তথ্য দিলে জরিমানা এবং সরকারি সুবিধা ফেরত নেওয়ার বিধান রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
সরকারেরও দিতে হবে স্থিতিশীল নীতি
তবে শুধু কোম্পানির ওপর শর্ত চাপালেই হবে না—সরকারকেও নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে। কোনো প্রকল্প অনুমোদনের সময় করছাড় বা অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হলে বিনিয়োগের স্বার্থে সেই নীতি যথেষ্ট সময় স্থিতিশীল রাখার প্রয়োজন রয়েছে।
শর্ত পূরণকারী প্রকল্পের জন্য বিভিন্ন সরকারি সংস্থার আলাদা আলাদা অনুমোদনের বদলে সমন্বিত পর্যালোচনা ব্যবস্থা চালুর কথাও বলা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
পেনসিলভানিয়া ইতোমধ্যে স্থানীয় অনুমোদন, পরিবেশগত সুরক্ষা ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে কিছু কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। এর সঙ্গে যদি দ্রুত অনুমোদনের নিশ্চয়তাও যুক্ত করা যায়, তাহলে দায়িত্বশীল প্রকল্পগুলো দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
দুই দলের কাছেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে
এই ধরনের সমঝোতা দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে। রিপাবলিকানরা এটিকে বিদ্যুৎ গ্রাহকের সুরক্ষা, স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক শৃঙ্খলার দৃষ্টিতে দেখতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা গুরুত্ব দিতে পারে পরিবেশ সুরক্ষা, স্বচ্ছতা ও কোম্পানির জবাবদিহিতাকে।
মূল নীতিটি সহজ—যে প্রকল্প নতুন সক্ষমতা তৈরি করবে, নিজের খরচ নিজে বহন করবে এবং নিজের দেওয়া তথ্যের সত্যতা প্রমাণ করবে, সেটিকে দ্রুত অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু যে প্রকল্প স্থানীয় সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, খরচ অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয় কিংবা প্রকৃত প্রভাব গোপন করে, সেটি অনুমোদন না দেওয়াই যুক্তিযুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো সম্প্রসারণ থামার সম্ভাবনা নেই। তবে এই সম্প্রসারণ সফল করতে হলে প্রযুক্তি কোম্পানি ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে নতুন ধরনের আস্থা তৈরি করতে হবে। উন্নয়নের সুফল যেমন ভাগাভাগি হবে, তেমনি এর খরচও ন্যায্যভাবে বহন করতে হবে—এটাই হতে পারে ভবিষ্যতের সমঝোতার ভিত্তি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















