যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে স্বাস্থ্যবিমার ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় লাখো মানুষ চিকিৎসা-সুরক্ষা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। চলতি বছরে প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজার ফ্লোরিডাবাসী সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইনের আওতাধীন স্বাস্থ্যবিমা পরিকল্পনা ছেড়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে অনেকেই এখন কোনো স্বাস্থ্যবিমা ছাড়াই দিন কাটাচ্ছেন।
মাসে অতিরিক্ত ১০০ ডলারেই বিমা ছাড়লেন লাখো মানুষ
ফ্লোরিডার সেন্ট ক্লাউডের ২১ বছর বয়সী রাঁধুনি এলিজা বাটনের অভিজ্ঞতা এই সংকটের একটি বড় উদাহরণ। জুন মাসে রান্নার সময় ছুরি পিছলে তাঁর মধ্যমা আঙুলের হাড় পর্যন্ত কেটে যায়। অথচ হাসপাতালে যাওয়ার মতো অর্থ তাঁর হাতে ছিল না।
বছরের শুরুতে মাসিক বিমা খরচ প্রায় ১০০ ডলার বেড়ে যাওয়ায় তিনি স্বাস্থ্যবিমা বাতিল করেছিলেন। ফলে গুরুতরভাবে কেটে যাওয়া আঙুলের চিকিৎসাও তাঁকে নিজের মতো করে করতে হয়েছে। ব্যান্ডেজ, স্প্লিন্ট এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচর্যার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ক্ষত সেরে ওঠে।
বাটনের ভাষায়, হাসপাতালে যাওয়া তাঁর জন্য কোনো বিকল্পই ছিল না। চিকিৎসার খরচ বহনের সামর্থ্য না থাকায় তাঁকে নিজের মতো করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে।
ভর্তুকি বন্ধ হওয়ার পর বেড়েছে খরচ

গত জানুয়ারিতে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইনের আওতায় দেওয়া অতিরিক্ত সরকারি ভর্তুকি শেষ হয়ে যাওয়ার পর অনেক মার্কিন নাগরিকের স্বাস্থ্যবিমার মাসিক খরচ দ্বিগুণ বা তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। ফলে অনেকে বিমা চালিয়ে যাবেন, নাকি বিমা ছাড়াই ঝুঁকি নেবেন—এই কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েন।
ফ্লোরিডায় এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। রাজ্যটিতে প্রায় ৩৮ লাখ মানুষ এই স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থার আওতায় ছিলেন, যা পুরো দেশের মোট গ্রাহকের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
বিশেষ করে ছোট ব্যবসার কর্মী, নির্মাণশ্রমিক, পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতের কর্মী এবং স্বনিযুক্ত মানুষের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়েছে। কারণ এসব পেশায় নিয়োগকর্তার কাছ থেকে স্বাস্থ্যবিমা পাওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম।
বিমা রেখেও খরচ কমাতে বাধ্য অনেকে
শুধু যারা বিমা ছেড়ে দিয়েছেন তারাই সমস্যায় নেই। যারা কোনোভাবে বিমা ধরে রেখেছেন, তাঁদেরও সংসারের অন্য খরচ কমাতে হচ্ছে।
ফ্লোরিডার লিসবার্গের ৫১ বছর বয়সী ট্রেসি র্যান্ডের মাসিক বিমা খরচ একসময় ৫৫ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ১০০ ডলারে যাওয়ার কথা ছিল। বাধ্য হয়ে তিনি কম সুবিধার একটি পরিকল্পনায় চলে যান। এখন তাঁর মাসিক খরচ ১৬০ ডলার হলেও এতে বেশি পরিমাণ নিজস্ব খরচ ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত অংশীদারি অর্থ দিতে হয়।
খরচ সামলাতে তিনি উচ্চশিক্ষার একটি কর্মসূচি ছেড়েছেন, কম দামের দোকান থেকে বাজার করছেন, স্বামীর সঙ্গে নিয়মিত বাইরে খাওয়া বন্ধ করেছেন এবং বন্ধুদের সঙ্গে অবসর কাটানোর অনেক অভ্যাস বাদ দিয়েছেন।
তিনি আশঙ্কা করছেন, আগামী বছর আবার বিমার খরচ বাড়লে সংসারের আর কী কী খরচ বাদ দিতে হবে, তা তিনি জানেন না।
বিনামূল্যের চিকিৎসাকেন্দ্রেও চাপ বাড়ছে
বিমাহীন ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ফ্লোরিডার বিভিন্ন দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র এখন গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয় হয়ে উঠেছে। অরল্যান্ডোর একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে মাত্র ৫ ডলার পরিদর্শন খরচে দরিদ্র ও বিমাহীন মানুষ চিকিৎসা নিতে পারছেন।
তবে রোগীর সংখ্যা বাড়ায় এসব কেন্দ্রও চাপে পড়ছে। ফ্লোরিডায় প্রায় ১১০টি বিনামূল্যের বা দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক বিমাহীন মানুষের তুলনায় এই ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
অরল্যান্ডোর ওই চিকিৎসাকেন্দ্র গত বছর প্রায় ১ হাজার ৩৫০ জনকে চিকিৎসা দিয়েছে এবং প্রতিবছর প্রায় ৩৫০ জন নতুন রোগী গ্রহণ করে। চাহিদা আরও বাড়লেও সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ইস্যু স্বাস্থ্যব্যয়
স্বাস্থ্যবিমার খরচ এখন ফ্লোরিডার রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী ইস্যু হয়ে উঠেছে। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা স্বাস্থ্যবিমার সরকারি ভর্তুকি পুনর্বহালের দাবি তুলছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা সরকারি স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে জালিয়াতি বন্ধ করা এবং অন্যান্য ব্যয় কমানোর উদ্যোগকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ফ্লোরিডার একটি নির্বাচনী এলাকার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ড্যারেন সোটো বলেছেন, তাঁর এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার খরচ নিয়ে মানুষের উদ্বেগ সর্বত্র শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে পর্যটননির্ভর ছোট ব্যবসাগুলোর অনেক কর্মী নিয়োগকর্তার কাছ থেকে স্বাস্থ্যবিমা পান না।

এদিকে এলিজা বাটনের মতো অনেক মানুষের কাছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল এখন সরাসরি ব্যক্তিগত জীবনের সংকটে পরিণত হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন—চিকিৎসার প্রয়োজন এখনই, কিন্তু আইন পাস বা নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্য তিনি ছয় মাস থেকে এক বছর অপেক্ষা করবেন কীভাবে?
স্বাস্থ্যসেবা সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা
ফ্লোরিডার পরিস্থিতি শুধু একটি অঙ্গরাজ্যের সমস্যা নয়। স্বাস্থ্যবিমার ভর্তুকি কমে যাওয়া, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিমাহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রজুড়েই উদ্বেগ তৈরি করছে।
স্বাস্থ্যবিমা ছাড়া থাকা মানুষ অনেক সময় চিকিৎসা প্রয়োজন হলেও হাসপাতালে যেতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে সামান্য অসুস্থতা বা দুর্ঘটনাও পরবর্তী সময়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে বিমা ধরে রাখা পরিবারগুলোও খাদ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে চিকিৎসার খরচ সামলাতে বাধ্য হচ্ছে।
মাসে অতিরিক্ত মাত্র ১০০ ডলারের খরচও যে একটি পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যসেবা থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়ার কারণ হতে পারে, ফ্লোরিডার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তারই স্পষ্ট উদাহরণ।
ফ্লোরিডায় স্বাস্থ্যবিমার খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজার মানুষ চলতি বছরে বিমা ছেড়েছেন। ভর্তুকি বন্ধের পর চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে চাপে পড়েছেন আরও লাখো পরিবার।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















