মন্ট্রিয়েলের স্বপ্নের বাড়ি, সঞ্চয়, চাকরি—সবকিছুই ছিল কানাডার বাসিন্দা জেনিন কানিলাসের জীবনে। তারপর ক্যালিফোর্নিয়ায় এক সফরে এক মার্কিন তরুণের প্রেমে পড়ে বদলে গেল তাঁর পুরো জীবন। সেই প্রেমের টানে তিনি বিক্রি করে দেন নিজের স্বপ্নের বাড়ি, গুটিয়ে ফেলেন পরিচিত জীবন এবং পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে।
স্বপ্নের বাড়ি থেকে নতুন জীবনের পথে
২০২২ সালের আগস্টে মন্ট্রিয়েলে নিজের পছন্দের বাড়ির চাবি হাতে পেয়ে জেনিনের মনে হয়েছিল, জীবনের বড় একটি স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। ল্যাশিন খালের দৃশ্য দেখা যেত বাড়িটি থেকে। ছিল মার্বেলের রান্নাঘর, উষ্ণ মেঝে এবং ছাদে সুইমিং পুল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই নিরাপদ জীবনই যেন তাঁকে একঘেয়ে করে তুলছিল। শীতের হাত থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় কয়েক সপ্তাহ কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্রের পাশে বসে লেখা, নতুন কিছু দেখা এবং অনুপ্রেরণা নিয়ে মন্ট্রিয়েলে ফিরে আসা।
কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়ে পরিকল্পনা বদলে যায়।
খেলতে গিয়ে প্রেম
ভেনিস বিচে নতুন একটি খেলা শেখার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে জেনিনের পরিচয় হয় স্থানীয় প্রশিক্ষক মার্কাস কানিলাসের সঙ্গে। খেলা শেখানোর পাশাপাশি দুজনের মধ্যে শুরু হয় দীর্ঘ আলাপ।
একপর্যায়ে বন্ধুত্ব গড়ায় গভীর সম্পর্কে। জেনিনের ছুটি শেষ হয়ে মন্ট্রিয়েলে ফিরে যাওয়ার পরও তাঁদের যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। প্রতিদিন চলতে থাকে ফোনে ও বার্তায় কথা।
কয়েক সপ্তাহ পর হঠাৎ পাওয়া একটি অতিরিক্ত অর্থ তিনি সঞ্চয় না করে আবার ক্যালিফোর্নিয়ায় যাওয়ার জন্য খরচ করেন। এবার মার্কাস তাঁকে ফুল নিয়ে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান।
এরপর শুরু হয় দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত। শেষ পর্যন্ত তাঁদের বাগদান হয়।
প্রেমের জন্য বড় মূল্য দিতে হয়েছে
বাগদানের পর জেনিন বুঝতে পারেন, প্রেমের গল্পের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়টি তখনও বাকি।
তিনি নিজের প্রায় সবকিছু বিক্রি বা দান করে দেন। এমনকি বহু কষ্টে কেনা মন্ট্রিয়েলের স্বপ্নের বাড়িটিও বাজারদরের তুলনায় কম দামে বিক্রি করতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি। তাঁর ছিল না দেশটির সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর, ছিল না স্থানীয় ঋণ-ইতিহাস। ফলে অনেক বাড়ির মালিক তাঁদের ভাড়া দিতে রাজি হননি।
শেষ পর্যন্ত ভেনিসে প্রায় ৫০০ বর্গফুটের একটি ছোট ভাড়ার বাসা পান তাঁরা। অথচ সেই বাসার মাসিক ভাড়া তাঁর মন্ট্রিয়েলের বাড়ির চেয়েও বেশি ছিল। নানা অসুবিধার পাশাপাশি ছিল ছাঁচের সমস্যা এবং রাতে জানালা দিয়ে তীব্র নিরাপত্তাবাতির আলো আসার মতো ঝামেলা।
এর মধ্যেই জেনিন চাকরি হারান। হারান কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত সুবিধা এবং কানাডার সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুবিধাও। অভিবাসনসংক্রান্ত কাগজপত্রের প্রক্রিয়া চলতে থাকায় নতুন চাকরি খোঁজাও কঠিন হয়ে পড়ে।
নিরাপত্তার চেয়ে সম্পর্কই বড়
জেনিনের সঞ্চয়ও দ্রুত কমতে থাকে। মুদ্রার বিনিময় হার তাঁর পক্ষে ছিল না। আর্থিক নিরাপত্তা, পরিচিত পরিবেশ এবং বহু বছরের গড়ে তোলা জীবন—সবকিছুই পেছনে ফেলে নতুন দেশে শূন্য থেকে শুরু করতে হয় তাঁকে।
তবুও শেষ পর্যন্ত মার্কাসকে বিয়ে করেন জেনিন। ছোট বাসাতেই তাঁরা নিজেদের মতো করে সংসার গড়ে তোলেন।
কখনো কখনো নিজের আগের নিরাপদ জীবনের কথা মনে পড়ে তাঁর। মনে হয়, মন্ট্রিয়েলের সেই বাড়ি, আর্থিক নিশ্চয়তা এবং পরিচিত পরিবেশ হয়তো অনেক বেশি স্বস্তির ছিল।
তবে এখন তিনি মনে করেন, সেটিই তাঁর প্রকৃত স্বপ্ন ছিল না। তাঁর কাছে আসল স্বপ্ন হলো এমন একজন মানুষকে খুঁজে পাওয়া, যিনি অনিশ্চয়তার মধ্যেও হাত ধরে বলেন—দুজন মিলে সবকিছু সামলে নেওয়া যাবে।
প্রেমের জন্য জীবনের প্রায় সবকিছু ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাই জেনিনের কাছে এখনো কঠিন হলেও অনুতাপের নয়।
প্রেমের টানে দেশ বদলের এই গল্প দেখিয়ে দেয়, জীবনের কিছু সিদ্ধান্তের মূল্য অর্থ দিয়ে মাপা যায় না। কখনো কখনো পরিচিত নিরাপত্তা ছেড়ে অজানার পথে হাঁটার পেছনেও থাকে এমন এক সম্পর্ক, যার কাছে পুরোনো স্বপ্নগুলোও নতুন অর্থ পায়।
প্রেমের টানে কানাডা ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি, স্বপ্নের বাড়ি বিক্রি এবং নতুন জীবন শুরুর এই গল্প মানুষের মনে প্রশ্ন তুলেছে—জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন আসলে বাড়ি, অর্থ ও নিরাপত্তা, নাকি একজন সঙ্গী, যার সঙ্গে অনিশ্চয়তাও ভাগ করে নেওয়া যায়?
প্রেমের জন্য কানাডা ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি, স্বপ্নের বাড়ি বিক্রি এবং নতুন জীবন শুরুর এই গল্প মানুষের মনে প্রশ্ন তুলেছে—জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন আসলে বাড়ি, অর্থ ও নিরাপত্তা, নাকি একজন সঙ্গী, যার সঙ্গে অনিশ্চয়তাও ভাগ করে নেওয়া যায়?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















