১০:০৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬
ভবিষ্যতের ঠিকানা কি এখন চীনে? ভূরাজনীতির ঝুঁকি: কোম্পানি কি প্রস্তুত? জ্বালানি নিরাপত্তার টেকসই পথ হতে পারে নবায়নযোগ্য শক্তি নিউইয়র্কে মোহন ভাগবতের অনুষ্ঠান আয়োজকদের এক্স অ্যাকাউন্ট স্থগিত ৬৪ জেলার দায়িত্ব পেলেন হুইপসহ ৩০ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ‘টুকু আসে, টুকু যায়’—সংসদে জ্বালানি সংকট ও দ্রব্যমূল্য নিয়ে রুমিনের কড়া সমালোচনা কঙ্গোয় ইবোলা মহামারি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, ৩ মাসে মৃত্যু ২,৫০০ ছাড়িয়েছে ‘ইনট্রিনসিক ক্যাপাসিটি’: সুস্থভাবে বার্ধক্য মাপার নতুন বৈজ্ঞানিক সূচক নজরুলের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত, কবির প্রেরণায় আন্দোলনের কথা স্মরণ কাদের গনি চৌধুরী হলেন বিএসএসের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক

ভবিষ্যতের ঠিকানা কি এখন চীনে?

একসময় আমেরিকা শুধু একটি দেশ ছিল না; পশ্চিমা বিশ্বের কল্পনায় সেটি ছিল ভবিষ্যতের প্রতীক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মানুষ হলিউড, ঝকঝকে গাড়ি, আধুনিক গৃহস্থালি প্রযুক্তি কিংবা নতুন ভোক্তা সংস্কৃতির ছবি দেখে মনে করত, তারা যেন নিজেদের আগামী দিনটাকেই দেখতে পাচ্ছে। লৌহপর্দার আড়ালে থাকা পূর্ব ইউরোপের মানুষের কাছে আমেরিকান স্বপ্নের আকর্ষণ ছিল আরও গভীর। একইভাবে, ১৯৭৬ সালে মাও সেতুংয়ের মৃত্যুর পর চীনের সংস্কার ও উন্মুক্ততার যুগে কোটি কোটি মানুষ পশ্চিমা আধুনিকতার দিকে তাকিয়েছিল। ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় দেং শিয়াওপিংয়ের অভিজ্ঞতাও চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষাকে প্রভাবিত করেছিল।

কিন্তু ২০২৬-এর পৃথিবীতে সেই মানচিত্র বদলে যাচ্ছে। এখন বিশ্বের বহু তরুণের চোখে ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি ওয়াশিংটন নয়, বেইজিংয়ে দেখা যাচ্ছে।

চীনের প্রযুক্তি ও নতুন আধুনিকতা

আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের তরুণদের কাছেও চীন ক্রমেই এমন এক অর্থনীতির নমুনা হয়ে উঠছে, যেখানে সবুজ জ্বালানি, মোবাইলভিত্তিক লেনদেন, ডিজিটাল সেবা এবং উন্নত রোবোটিক প্রযুক্তি দৈনন্দিন জীবনের অংশ। একসময় হলিউড যেভাবে আধুনিক জীবনের চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরত, এখন চীনের প্রযুক্তি ও ভোক্তা সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রে সেই ভূমিকা পালন করছে।

পশ্চিমা বিশ্বের একটি অংশ যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈচিত্র্য ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রতি সন্দিহান হয়ে উঠছে, বিশেষ করে ট্রাম্পবাদী রাজনীতির প্রভাবে, তখন চীন নিজেকে প্রযুক্তিনির্ভর অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে পারছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘চায়নাম্যাক্সিং’-এর প্রবণতাও এই পরিবর্তনের একটি লক্ষণ। কিছু আমেরিকান ও ইউরোপীয় ইনফ্লুয়েন্সার চীনা জীবনযাপন, নান্দনিকতা ও সংস্কৃতির প্রতি প্রকাশ্য আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

তবে বিষয়টি শুধু সাংস্কৃতিক অনুকরণের নয়। বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলের বহু তরুণ চীনের প্রভাবকে তাদের দৈনন্দিন জীবনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অনুভব করছে। প্রযুক্তি, পণ্য, অবকাঠামো ও ডিজিটাল সেবা—সব মিলিয়ে চীন তাদের কাছে একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা।

পশ্চিমকেন্দ্রিক বিশ্বদৃষ্টির অবসান

এখানেই পরিবর্তনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব। বহু দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজেদের উন্নয়ন ও পররাষ্ট্রনীতিকে কোনো না কোনোভাবে পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখেছে। কেউ ওয়াশিংটন কনসেনসাসের মতো পশ্চিমা অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করেছে, কেউ পশ্চিমা প্রযুক্তি ও সহায়তা চেয়েছে, আবার কেউ পশ্চিমা আধিপত্যের বিরোধিতা করেছে। কিন্তু বিরোধিতাও প্রায় সবসময় পশ্চিমকে কেন্দ্র করেই সংজ্ঞায়িত হয়েছে।

এই পশ্চিমকেন্দ্রিক কাঠামো এখন দুর্বল হচ্ছে।

সাহেল অঞ্চলে রাশিয়ার ওয়াগনার যোদ্ধাদের উপস্থিতিকে যেমন দীর্ঘদিন ফরাসি প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়েছে, তেমনি অ্যাঙ্গোলার তেলক্ষেত্রে চীনা কোম্পানির ভূমিকা ব্যাখ্যা করা হয়েছে পর্তুগাল বা ব্রিটেনের পুরনো প্রভাবের বিকল্প হিসেবে। মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করার ঘটনাগুলোকেও এতদিন পশ্চিমা আধিপত্যের পাল্টা অবস্থান হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে বিষয়টি আর এত সরল নয়। তারা নিজেদের পশ্চিমাপন্থী বা পশ্চিমবিরোধী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে আগ্রহী নয়। বরং তারা ক্রমেই ‘পোস্ট-ওয়েস্টার্ন’—অর্থাৎ পশ্চিমকে বিশ্বের স্বাভাবিক কেন্দ্র হিসেবে না-দেখা একটি প্রজন্মে পরিণত হচ্ছে।

তারুণ্যই বদলে দিচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি

এই পরিবর্তনের পেছনে জনসংখ্যাগত বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মানুষের মধ্যম বয়স যেখানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছর, সেখানে নাইজেরিয়ায় তা ১৯ এবং দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত ও লেবাননে প্রায় ২৯ বছর। ফলে বিশ্বের বহু তরুণের রাজনৈতিক স্মৃতিতে পশ্চিমা আধিপত্যের পুরনো অধ্যায়গুলো আদৌ উপস্থিত নেই।

নাইজেরিয়ার বিপুলসংখ্যক তরুণ ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ বা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় জন্মগ্রহণও করেনি। তাদের রাজনৈতিক স্মৃতি গড়ে উঠেছে এমন এক সময়ে, যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকাই ছিল তাদের কাছে পরিচিত আমেরিকা। সেই আমেরিকা যদি তাদের কাছে অনুপ্রেরণার চেয়ে বিভাজন, সামাজিক রক্ষণশীলতা কিংবা আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে ওঠে, তাহলে চীনের প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতাও তাৎপর্যপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে চীনের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক জটিল হলেও তরুণদের মধ্যে চীনবিরোধী পূর্বধারণা কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় পশ্চিমা দেশগুলোর সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে। অনেকে নিজেদের ইতিহাস এবং এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর ইতিহাস নতুনভাবে দেখতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও চীনা ভোক্তা পণ্যের বিস্তার দেশটির ভাবমূর্তিও বদলে দিয়েছে।

What Will China's Future Look Like?

মধ্যপ্রাচ্যে চীনের আকর্ষণের আরেকটি কারণ

মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে চীনের আকর্ষণকে শুধু তার উপস্থিতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; বরং অনেক সময় তার অনুপস্থিতিও একটি সুবিধা। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ, হস্তক্ষেপ ও অস্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত একটি অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ গভীর। আরব মতামত জরিপেও এই মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে—বিপুলসংখ্যক উত্তরদাতা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছেন, যেখানে চীনের ক্ষেত্রে সেই অনুপাত অনেক কম।

চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর অতীতও নেই। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক স্মৃতির সেই বোঝা কাজ করে না, যা ইউরোপীয় উদ্যোগকে প্রায়ই জটিল করে তোলে।

তবে চীনের উত্থান নিঃশর্ত গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করছে না

চীনের জনপ্রিয়তা নিয়ে অতিরিক্ত আত্মতুষ্টিরও কারণ নেই। উন্নয়নশীল বিশ্বে বেইজিং তার অর্থনৈতিক স্বার্থ আগ্রাসীভাবে এগিয়ে নেয়—এমন অভিযোগ রয়েছে। ঋণের শর্ত, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ কিংবা নিজেদের অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতার পণ্য বিদেশে ঠেলে দেওয়ার মতো বিষয় অনেক দেশেই অসন্তোষ সৃষ্টি করছে। থাইল্যান্ড, মেক্সিকো বা নাইজেরিয়ার মতো দেশেও চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, যেমনটি যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে উঠছে।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো স্থানীয় সরকারের প্রতি তরুণদের অবিশ্বাস। কোনো সরকার যদি চীনকে অতিরিক্ত সুবিধা দিচ্ছে বলে জনমনে ধারণা তৈরি হয়, সেই অসন্তোষ সহজেই চীনের বিরুদ্ধেও ঘুরে যেতে পারে।

তাই চীনের প্রতি নতুন আকর্ষণকে কোনো নতুন আদর্শিক আনুগত্য হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি অনেক বেশি বাস্তববাদী ও প্রয়োজনভিত্তিক। যে দেশ প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির বাস্তব সুযোগ দিতে পারবে, মানুষের আগ্রহ শেষ পর্যন্ত তার দিকেই যাবে।

প্রতিযোগিতার আসল জায়গা

এই বাস্তবতাই পশ্চিমের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। চীনের ‘প্রচারযন্ত্রের’ মোকাবিলা করতে আরও কার্যকর প্রচারণা চালানো যথেষ্ট নয়। সফট পাওয়ার প্রতিযোগিতা বিজ্ঞাপন বা জনসংযোগের প্রতিযোগিতা নয়; এটি বাস্তব ফলাফলের প্রতিযোগিতা।

মানুষের জীবনে কে উন্নতি আনতে পারছে, কে নতুন সুযোগ তৈরি করছে, কে প্রযুক্তিকে সবার নাগালে আনছে, কে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়াতে পারছে—শেষ পর্যন্ত তারাই মানুষের আস্থা অর্জন করবে।

বিশ্বের তরুণ প্রজন্ম চীনকে ভালোবাসে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন নয়। বরং তারা ভবিষ্যৎকে কোথায় দেখতে পাচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম বিশ্ব ভবিষ্যতের সংজ্ঞা দিয়েছে। এখন সেই একচেটিয়া অবস্থান আর নেই।

চীনের উত্থান তাই শুধু শক্তির ভারসাম্যের পরিবর্তন নয়; এটি ভবিষ্যৎ কল্পনা করার ক্ষমতারও পরিবর্তন। আর এই প্রতিযোগিতায় পশ্চিমের সবচেয়ে কার্যকর জবাব হবে না চীনকে নিয়ে আরও জোরালো প্রচারণা। বরং নিজেদের সমাজ ও অর্থনীতিকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে বিশ্বের নতুন প্রজন্ম আবারও পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে তাদের আগামী দিনের সম্ভাবনা দেখতে পায়।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভবিষ্যতের ঠিকানা কি এখন চীনে?

ভবিষ্যতের ঠিকানা কি এখন চীনে?

১০:০০:৪৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

একসময় আমেরিকা শুধু একটি দেশ ছিল না; পশ্চিমা বিশ্বের কল্পনায় সেটি ছিল ভবিষ্যতের প্রতীক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মানুষ হলিউড, ঝকঝকে গাড়ি, আধুনিক গৃহস্থালি প্রযুক্তি কিংবা নতুন ভোক্তা সংস্কৃতির ছবি দেখে মনে করত, তারা যেন নিজেদের আগামী দিনটাকেই দেখতে পাচ্ছে। লৌহপর্দার আড়ালে থাকা পূর্ব ইউরোপের মানুষের কাছে আমেরিকান স্বপ্নের আকর্ষণ ছিল আরও গভীর। একইভাবে, ১৯৭৬ সালে মাও সেতুংয়ের মৃত্যুর পর চীনের সংস্কার ও উন্মুক্ততার যুগে কোটি কোটি মানুষ পশ্চিমা আধুনিকতার দিকে তাকিয়েছিল। ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় দেং শিয়াওপিংয়ের অভিজ্ঞতাও চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষাকে প্রভাবিত করেছিল।

কিন্তু ২০২৬-এর পৃথিবীতে সেই মানচিত্র বদলে যাচ্ছে। এখন বিশ্বের বহু তরুণের চোখে ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি ওয়াশিংটন নয়, বেইজিংয়ে দেখা যাচ্ছে।

চীনের প্রযুক্তি ও নতুন আধুনিকতা

আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের তরুণদের কাছেও চীন ক্রমেই এমন এক অর্থনীতির নমুনা হয়ে উঠছে, যেখানে সবুজ জ্বালানি, মোবাইলভিত্তিক লেনদেন, ডিজিটাল সেবা এবং উন্নত রোবোটিক প্রযুক্তি দৈনন্দিন জীবনের অংশ। একসময় হলিউড যেভাবে আধুনিক জীবনের চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরত, এখন চীনের প্রযুক্তি ও ভোক্তা সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রে সেই ভূমিকা পালন করছে।

পশ্চিমা বিশ্বের একটি অংশ যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈচিত্র্য ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রতি সন্দিহান হয়ে উঠছে, বিশেষ করে ট্রাম্পবাদী রাজনীতির প্রভাবে, তখন চীন নিজেকে প্রযুক্তিনির্ভর অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে পারছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘চায়নাম্যাক্সিং’-এর প্রবণতাও এই পরিবর্তনের একটি লক্ষণ। কিছু আমেরিকান ও ইউরোপীয় ইনফ্লুয়েন্সার চীনা জীবনযাপন, নান্দনিকতা ও সংস্কৃতির প্রতি প্রকাশ্য আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

তবে বিষয়টি শুধু সাংস্কৃতিক অনুকরণের নয়। বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলের বহু তরুণ চীনের প্রভাবকে তাদের দৈনন্দিন জীবনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অনুভব করছে। প্রযুক্তি, পণ্য, অবকাঠামো ও ডিজিটাল সেবা—সব মিলিয়ে চীন তাদের কাছে একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা।

পশ্চিমকেন্দ্রিক বিশ্বদৃষ্টির অবসান

এখানেই পরিবর্তনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব। বহু দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজেদের উন্নয়ন ও পররাষ্ট্রনীতিকে কোনো না কোনোভাবে পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখেছে। কেউ ওয়াশিংটন কনসেনসাসের মতো পশ্চিমা অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করেছে, কেউ পশ্চিমা প্রযুক্তি ও সহায়তা চেয়েছে, আবার কেউ পশ্চিমা আধিপত্যের বিরোধিতা করেছে। কিন্তু বিরোধিতাও প্রায় সবসময় পশ্চিমকে কেন্দ্র করেই সংজ্ঞায়িত হয়েছে।

এই পশ্চিমকেন্দ্রিক কাঠামো এখন দুর্বল হচ্ছে।

সাহেল অঞ্চলে রাশিয়ার ওয়াগনার যোদ্ধাদের উপস্থিতিকে যেমন দীর্ঘদিন ফরাসি প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়েছে, তেমনি অ্যাঙ্গোলার তেলক্ষেত্রে চীনা কোম্পানির ভূমিকা ব্যাখ্যা করা হয়েছে পর্তুগাল বা ব্রিটেনের পুরনো প্রভাবের বিকল্প হিসেবে। মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করার ঘটনাগুলোকেও এতদিন পশ্চিমা আধিপত্যের পাল্টা অবস্থান হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে বিষয়টি আর এত সরল নয়। তারা নিজেদের পশ্চিমাপন্থী বা পশ্চিমবিরোধী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে আগ্রহী নয়। বরং তারা ক্রমেই ‘পোস্ট-ওয়েস্টার্ন’—অর্থাৎ পশ্চিমকে বিশ্বের স্বাভাবিক কেন্দ্র হিসেবে না-দেখা একটি প্রজন্মে পরিণত হচ্ছে।

তারুণ্যই বদলে দিচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি

এই পরিবর্তনের পেছনে জনসংখ্যাগত বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মানুষের মধ্যম বয়স যেখানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছর, সেখানে নাইজেরিয়ায় তা ১৯ এবং দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত ও লেবাননে প্রায় ২৯ বছর। ফলে বিশ্বের বহু তরুণের রাজনৈতিক স্মৃতিতে পশ্চিমা আধিপত্যের পুরনো অধ্যায়গুলো আদৌ উপস্থিত নেই।

নাইজেরিয়ার বিপুলসংখ্যক তরুণ ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ বা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় জন্মগ্রহণও করেনি। তাদের রাজনৈতিক স্মৃতি গড়ে উঠেছে এমন এক সময়ে, যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকাই ছিল তাদের কাছে পরিচিত আমেরিকা। সেই আমেরিকা যদি তাদের কাছে অনুপ্রেরণার চেয়ে বিভাজন, সামাজিক রক্ষণশীলতা কিংবা আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে ওঠে, তাহলে চীনের প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতাও তাৎপর্যপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে চীনের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক জটিল হলেও তরুণদের মধ্যে চীনবিরোধী পূর্বধারণা কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় পশ্চিমা দেশগুলোর সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে। অনেকে নিজেদের ইতিহাস এবং এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর ইতিহাস নতুনভাবে দেখতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও চীনা ভোক্তা পণ্যের বিস্তার দেশটির ভাবমূর্তিও বদলে দিয়েছে।

What Will China's Future Look Like?

মধ্যপ্রাচ্যে চীনের আকর্ষণের আরেকটি কারণ

মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে চীনের আকর্ষণকে শুধু তার উপস্থিতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; বরং অনেক সময় তার অনুপস্থিতিও একটি সুবিধা। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ, হস্তক্ষেপ ও অস্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত একটি অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ গভীর। আরব মতামত জরিপেও এই মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে—বিপুলসংখ্যক উত্তরদাতা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছেন, যেখানে চীনের ক্ষেত্রে সেই অনুপাত অনেক কম।

চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর অতীতও নেই। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক স্মৃতির সেই বোঝা কাজ করে না, যা ইউরোপীয় উদ্যোগকে প্রায়ই জটিল করে তোলে।

তবে চীনের উত্থান নিঃশর্ত গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করছে না

চীনের জনপ্রিয়তা নিয়ে অতিরিক্ত আত্মতুষ্টিরও কারণ নেই। উন্নয়নশীল বিশ্বে বেইজিং তার অর্থনৈতিক স্বার্থ আগ্রাসীভাবে এগিয়ে নেয়—এমন অভিযোগ রয়েছে। ঋণের শর্ত, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ কিংবা নিজেদের অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতার পণ্য বিদেশে ঠেলে দেওয়ার মতো বিষয় অনেক দেশেই অসন্তোষ সৃষ্টি করছে। থাইল্যান্ড, মেক্সিকো বা নাইজেরিয়ার মতো দেশেও চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, যেমনটি যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে উঠছে।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো স্থানীয় সরকারের প্রতি তরুণদের অবিশ্বাস। কোনো সরকার যদি চীনকে অতিরিক্ত সুবিধা দিচ্ছে বলে জনমনে ধারণা তৈরি হয়, সেই অসন্তোষ সহজেই চীনের বিরুদ্ধেও ঘুরে যেতে পারে।

তাই চীনের প্রতি নতুন আকর্ষণকে কোনো নতুন আদর্শিক আনুগত্য হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি অনেক বেশি বাস্তববাদী ও প্রয়োজনভিত্তিক। যে দেশ প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির বাস্তব সুযোগ দিতে পারবে, মানুষের আগ্রহ শেষ পর্যন্ত তার দিকেই যাবে।

প্রতিযোগিতার আসল জায়গা

এই বাস্তবতাই পশ্চিমের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। চীনের ‘প্রচারযন্ত্রের’ মোকাবিলা করতে আরও কার্যকর প্রচারণা চালানো যথেষ্ট নয়। সফট পাওয়ার প্রতিযোগিতা বিজ্ঞাপন বা জনসংযোগের প্রতিযোগিতা নয়; এটি বাস্তব ফলাফলের প্রতিযোগিতা।

মানুষের জীবনে কে উন্নতি আনতে পারছে, কে নতুন সুযোগ তৈরি করছে, কে প্রযুক্তিকে সবার নাগালে আনছে, কে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়াতে পারছে—শেষ পর্যন্ত তারাই মানুষের আস্থা অর্জন করবে।

বিশ্বের তরুণ প্রজন্ম চীনকে ভালোবাসে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন নয়। বরং তারা ভবিষ্যৎকে কোথায় দেখতে পাচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম বিশ্ব ভবিষ্যতের সংজ্ঞা দিয়েছে। এখন সেই একচেটিয়া অবস্থান আর নেই।

চীনের উত্থান তাই শুধু শক্তির ভারসাম্যের পরিবর্তন নয়; এটি ভবিষ্যৎ কল্পনা করার ক্ষমতারও পরিবর্তন। আর এই প্রতিযোগিতায় পশ্চিমের সবচেয়ে কার্যকর জবাব হবে না চীনকে নিয়ে আরও জোরালো প্রচারণা। বরং নিজেদের সমাজ ও অর্থনীতিকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে বিশ্বের নতুন প্রজন্ম আবারও পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে তাদের আগামী দিনের সম্ভাবনা দেখতে পায়।