গরমের তীব্রতা বাড়লে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ছাড়া স্বস্তিতে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ না থাকা, অতিরিক্ত গরম কিংবা বিদ্যুৎ খরচ কমানোর প্রয়োজন—যে কারণই হোক, কিছু সহজ কৌশলে শরীর ও ঘরের তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কম রাখা সম্ভব।
অতিরিক্ত গরম দীর্ঘ সময় শরীরে থাকলে মস্তিষ্ক ও অন্যান্য অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। শরীর ঘামের মাধ্যমে নিজেকে ঠান্ডা রাখে। কিন্তু বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘাম সহজে শুকাতে পারে না, ফলে শরীরের স্বাভাবিক শীতল হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ে।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন
গরমে শরীর ঠান্ডা রাখার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো পর্যাপ্ত পানি পান করা। শরীরে পানির ঘাটতি হলে ঘামের মাধ্যমে তাপ বের করে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পানি খুব ঠান্ডা না হলেও সমস্যা নেই, কারণ শরীর সেটিকে নিজের তাপমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য করে নেয়।
ঠান্ডা পানিতে গোসল
ঠান্ডা পানিতে গোসল বা কিছুক্ষণ পানিতে শরীর ভিজিয়ে রাখা শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করতে পারে। আরও ঠান্ডা অনুভূতির জন্য পুদিনার সুগন্ধযুক্ত সাবান ব্যবহার করা যেতে পারে। পুদিনার তেলের মেন্থল ত্বক ও মস্তিষ্কের কিছু স্নায়ুকে ঠান্ডার অনুভূতি দেয়।
কবজি ও ঘাড়ে ঠান্ডা কাপড়
ঠান্ডা পানিতে ভেজানো কাপড় বা বরফের প্যাক কবজিতে কিংবা ঘাড়ের চারপাশে রাখতে পারেন। এসব জায়গায় রক্তনালি ত্বকের কাছাকাছি থাকায় সেখানে ঠান্ডা প্রয়োগ করলে শরীর দ্রুত কিছুটা শীতল অনুভব করতে পারে।
ঘরের গরম বাতাস বাইরে বের করুন
ঘরে পাখা থাকলে সেটি জানালার দিকে মুখ করে বাইরে থেকে নয়, বরং ঘরের গরম বাতাস বাইরে বের করে দেওয়ার মতো করে ব্যবহার করা যায়। এতে ঘরের ভেতরের জমে থাকা গরম বাতাস বের হয়ে তুলনামূলক ঠান্ডা বাতাস ঢোকার সুযোগ পায়।
সকাল ও সন্ধ্যায় বাইরের তাপমাত্রা কম থাকলে বাড়ির বিপরীত পাশের জানালা খুলে দেওয়া যেতে পারে। এতে এক পাশ দিয়ে বাতাস ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে স্বাভাবিক বায়ু চলাচল তৈরি করে। তবে রোদ উঠলে জানালা বন্ধ করে দেওয়া এবং আবহাওয়া আবার ঠান্ডা হলে খুলে দেওয়া ভালো।
পাখার সামনে বিশ্রাম নিন
শুধু পাখার বাতাসের কাছাকাছি বসে থাকলেও শরীরের তাপমাত্রা কম অনুভূত হতে পারে। ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে শরীর থেকে তাপ বের হতে সাহায্য করে বাতাসের চলাচল।
জানালায় পর্দা ব্যবহার করুন
যে জানালাগুলো দিয়ে দিনের বড় সময় সরাসরি সূর্যের আলো ঢোকে, সেগুলোর পর্দা বা আড়াল দিনের শুরুতেই টেনে দেওয়া ভালো। এতে সূর্যের তাপ সরাসরি ঘরে ঢুকে ঘর গরম করে তুলতে পারে না।
ঘন ও আলো-রোধী পর্দা ব্যবহার করলে দিনের তাপমাত্রা বৃদ্ধিও কিছুটা কমানো সম্ভব।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চালালে মাত্রা খুব কমাবেন না
শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহার করলেও খুব কম তাপমাত্রা নির্ধারণ করলে ঘর দ্রুত ঠান্ডা হওয়ার বদলে যন্ত্রটি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে। তাই আরামদায়ক সর্বোচ্চ তাপমাত্রায় যন্ত্র চালানো তুলনামূলকভাবে কার্যকর।![]()
তুলার চাদর ব্যবহার করুন
তুলা বাতাস চলাচলের উপযোগী একটি উপাদান। তাই রাতে তুলার চাদর বা পাতলা কম্বল ব্যবহার করলে শরীর তুলনামূলক স্বস্তিতে থাকতে পারে। কম ঘন বুননের তুলার কাপড় সাধারণত বেশি বাতাস চলাচলের সুযোগ দেয়।
রাতে নিচের তলায় ঘুমানোর চেষ্টা করুন
গরমে রাতে ঘুমাতে সমস্যা হলে সম্ভব হলে অন্য কোনো ঘরে চলে যেতে পারেন। উষ্ণ বাতাস ওপরে ওঠে বলে বাড়ির নিচতলা বা ভূগর্ভস্থ অংশ তুলনামূলক ঠান্ডা থাকতে পারে। সেখানে সাময়িকভাবে ঘুমানোর ব্যবস্থা করলে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে।
ভেজা কাপড় বা মোজা ব্যবহার না করাই ভালো
গরমে কেউ কেউ ভেজা মোজা, চাদর বা পোশাক ঠান্ডা করে রাতে ব্যবহার করেন। কিন্তু এতে শরীরের তাপ খুব অল্প সময়েই ওই ভেজা কাপড়কে উষ্ণ করে ফেলতে পারে। পাশাপাশি ভেজা কাপড়ের কারণে বিছানায় আর্দ্রতা জমে ছত্রাক তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ব্যবহার না করা ঘরের দরজা বন্ধ রাখুন
যে ঘরে কেউ নেই এবং যেখানে ঠান্ডা বাতাস পৌঁছানোর ব্যবস্থা নেই, সেই ঘরের দরজা বন্ধ রাখা ভালো। এতে ঘরের ঠান্ডা বাতাস অপ্রয়োজনীয় জায়গায় ছড়িয়ে না গিয়ে মানুষ যে অংশে অবস্থান করছে সেখানে সীমাবদ্ধ থাকে।
রান্নাঘর ও বাথরুমের বাতাস বের করে দিন
রান্নার পর রান্নাঘরের গরম বাতাস বের করতে নিষ্কাশন পাখা চালাতে পারেন। একইভাবে গোসলের পর বাথরুমের গরম ও আর্দ্র বাতাস বের করে দিতে পাখা ব্যবহার করা উচিত। এতে বাড়ির ভেতরে অতিরিক্ত তাপ ও আর্দ্রতা জমে থাকা কমে।
কম তাপ উৎপন্ন করে এমন বাতি ব্যবহার করুন
পুরোনো ধরনের বৈদ্যুতিক বাতি তুলনামূলক বেশি তাপ উৎপন্ন করে। ধীরে ধীরে সেগুলোর পরিবর্তে কম শক্তি ব্যবহারকারী বাতি লাগানো যেতে পারে। এতে বিদ্যুৎ খরচ কমার পাশাপাশি বিশেষ করে যেসব জায়গায় মানুষ দীর্ঘ সময় বসে থাকে, সেখানে অতিরিক্ত তাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।
রান্নার তাপ ঘরের বাইরে রাখুন
চুলা বা ওভেনে রান্না করলে সেই তাপ ঘরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে যেতে পারে। গরমের দিনে সম্ভব হলে বাইরে রান্না করা যেতে পারে। আর ঘরের ভেতরে রান্না করতে হলে ধীরগতিতে রান্না করা যায় এমন যন্ত্র ব্যবহার করে তাপ একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ রাখা যেতে পারে।
ঠান্ডা খাবারে অতিরিক্ত চিনি নয়
বরফজাতীয় খাবার বা আইসক্রিম সাময়িকভাবে শরীরকে ঠান্ডা অনুভব করাতে পারে। তবে অতিরিক্ত চিনি খাওয়া ঠিক নয়। বেশি চিনি বিপাকীয় কার্যক্রম বাড়িয়ে শরীরের ভেতরে উষ্ণতা অনুভূত করতে পারে। তাই গরমে ঠান্ডা খাবার খেলেও পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
অতিরিক্ত গরমে সতর্ক থাকুন
এসব উপায় অনুসরণ করার পরও যদি ঘরে থাকা অসহনীয় হয়ে ওঠে, স্থানীয়ভাবে শীতল থাকার জন্য কোনো জনসাধারণের ব্যবস্থা রয়েছে কি না তা খোঁজ নেওয়া যেতে পারে। প্রচণ্ড গরমের সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জনসাধারণের স্থানে কিছু সময় অবস্থান করাও নিরাপদ থাকার একটি উপায় হতে পারে।
গরমে শুধু অস্বস্তিই নয়, তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকিও তৈরি হয়। তাই প্রচুর পানি পান, শরীর ঠান্ডা রাখা এবং অতিরিক্ত গরমের সময় প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















