বুধবার সকালে নেপালের ভোতেকোশী নদী হঠাৎ ভয়ংকর রূপ নেওয়ার পর কয়েকজন মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন। কেউ ছুটেছেন পাহাড়ের ঢালে, কেউ বন্যার স্রোতের আগে গাড়ি চালিয়ে পালিয়েছেন। আবার কেউ বিদ্যুতের তার আঁকড়ে ধরে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছেন। তবে বেঁচে গেলেও ভয়াবহ সেই দৃশ্যের স্মৃতি তাদের পিছু ছাড়ছে না।
কান্তিপুরের প্রতিবেদকদের কাছে সাতজন বর্ণনা করেছেন, কীভাবে তারা ভোতেকোশীর ভয়াবহ বন্যা থেকে প্রাণে বেঁচেছেন এবং চোখের সামনে কী দেখেছেন।
বিদ্যুতের তার আঁকড়ে আধা ঘণ্টা
রৌতহটের রাজদেবী পৌরসভা-২-এর ৩৬ বছর বয়সী রামবচন সাহ ত্রিশূলী বাজারের কাছে একটি মিষ্টির দোকানে ১৫ বছর ধরে কাজ করছিলেন। বুধবার সকালে দোকানে মিষ্টি তৈরির সময় হঠাৎ বন্যার পানি ঢুকে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। শেষ মুহূর্তে তিনি একটি বিদ্যুতের তার ধরে ফেলেন।
প্রায় আধা ঘণ্টা সেই তারে ঝুলে থেকে তিনি প্রাণ বাঁচান। তবে দোকানের সঙ্গী সংগীতা, তার ছেলে রাহুল এবং আরেক কর্মী বিনোদ ভগতের কোনো সন্ধান এখনো মেলেনি। রৌতহটের প্রধান জেলা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জেলার ১২ জনের নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
পরিবার হারানোর আশঙ্কায় বেঁচে থাকার আনন্দও ম্লান
ঝাপার শচীন খাতি বেঁচে যান কেবল একটি আকস্মিক কারণে। তার মামা রাজ কুমার দিয়ালি তাকে বন্যার কিছুক্ষণ আগে কাজের জন্য চিলিমে পাঠিয়েছিলেন। ফিরে এসে শচীন দেখেন, যে বসতিতে তারা থাকতেন সেটি পুরোপুরি ভেসে গেছে।
রাজ কুমার, তার স্ত্রী শৃতি এবং চার বছরের ছেলে শ্রীরাজ এখনো নিখোঁজ। ঝাপা পুলিশ জানিয়েছে, বন্যার পর রাশুয়ায় থাকা জেলার ১৩ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
বন্যার আগে ছুটে পালালেন চালক
মাকওয়ানপুরের রাজ কুমার কার্কি পণ্যবোঝাই কনটেইনার নিয়ে বন্যার সতর্কবার্তা শুনে দ্রুত গাড়ি ঘুরিয়ে দেন। তার পেছনে তখন ধেয়ে আসছিল ভোতেকোশীর পানির দেয়াল। তিনি গতি বাড়িয়ে ছুটতে থাকেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, পেছনে থাকা প্রায় নয়টি কনটেইনার ট্রাক ও তাদের চালক বন্যায় ভেসে যান। ধুঙ্গে বাজারের আগে পাহাড়ের দিকে গাড়ি তুলে দেওয়ায় তিনি এবং তার ট্রাক দুটিই রক্ষা পায়। পরে পাহাড়ে রাত কাটিয়ে তিনি দেখতে পান, বেত্রাবতীসহ আশপাশের বসতিগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।
‘স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে’
রাশুয়ার গাথে কামি পাহাড়ে পাথর ধসে পড়ার মতো শব্দ শুনে বন্যার পানি এগিয়ে আসতে দেখেন। সবাইকে দৌড়াতে বলে তিনি প্রায় ৫০০ মিটার উঁচু পাহাড়ি এলাকায় উঠে যান। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে দেখেন নিচের বসতি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
তার ভাষায়, পুরো ঘটনাটি এখনো স্বপ্নের মতো মনে হয়। শৈশবে পাহাড়ে গবাদিপশু চরানোর অভিজ্ঞতা তাকে দ্রুত ওপরে উঠতে সাহায্য করেছিল।
জঙ্গলে আশ্রয়েই বাঁচলেন অনেকে
রামেছাপের রাজু বুধাথোকি এবং কাঠমান্ডুর প্রকাশ গৌতমও জঙ্গলের দিকে দৌড়ে প্রাণ বাঁচান। বুধাথোকি দেখেন, মুহূর্তের মধ্যে তিমুরের ঘরবাড়ি ভেঙে নদীতে পড়ে যাচ্ছে। গৌতমের বর্ণনায়, পুরো বসতি অন্ধকার হয়ে কালো মেঘে ঢেকে যায়। পরে জঙ্গলে রাত কাটিয়ে তারা নেপালি সেনাবাহিনীর সহায়তায় উদ্ধার হন।
দোলখার তুলসি বাহাদুর ভাণ্ডারিকে বন্যার শক্তিশালী ঢেউ ধাক্কা দিয়ে পাহাড়ের দিকে ছুড়ে দেয়। তার ভাষায়, সেই ঢেউ তাকে অন্যদিকে সরিয়ে না দিলে তিনি আজ বেঁচে থাকতেন না।
বেঁচে ফেরা মানুষগুলোর শরীর হয়তো নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরেছে, কিন্তু চোখের সামনে হারিয়ে যাওয়া মানুষ, ধ্বংস হয়ে যাওয়া বসতি আর প্রবল স্রোতের সেই মুহূর্ত এখনো তাদের মনে জীবন্ত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















