১১:৩৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
ডুমডুমায় ব্যবসায়ীদের কাছে উলফা-আইয়ের চাঁদাবাজির চিঠি, জাল বলে দাবি সংগঠনের নেপালে ভয়াবহ বন্যার নেপথ্যে পাহাড়ধস, ড্রোনে ধরা পড়ল ধ্বংসযজ্ঞের শুরু ভাঙ্গায় বাস-মোটরসাইকেল মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ৩ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিতর্কিত ডানপন্থী মিলো ইয়ান্নোপোলোসকে যুক্তরাজ্যে ফেরত পাঠাল আইস ব্রুকলিনের সেই পরাজয়, যেদিন আমেরিকান বিপ্লব প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ভার্চুয়াল চাকরি মেলায় নতুন দিগন্ত, এক প্ল্যাটফর্মেই নিয়োগ ও অন্তর্ভুক্তি হিলি স্থলবন্দর বন্ধ:  নিত্যপণ্যের বাজারে কতটা চাপ পড়বে? হিলি স্থলবন্দরে অনির্দিষ্টকালের জন্য আমদানি-রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা ভারতীয় ব্যবসায়ীদের রংপুরে চার খুন: প্রধান আসামি সিদ্ধার্থের বাবা-ভাই ডিবি হেফাজতে কৈলাস-মানস সরোবর: শত শত বছর ধরে যেখানে তীর্থযাত্রায় যান চার ধর্মের মানুষ

হিলি স্থলবন্দর বন্ধ:  নিত্যপণ্যের বাজারে কতটা চাপ পড়বে?

দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের পণ্য আমদানি-রপ্তানি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের ঘোষণা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন দেশের নিত্যপণ্যের বাজার আগে থেকেই মূল্যচাপ, সরবরাহ সংকট ও পরিবহন ব্যয়ের চাপে অস্থির। ভারতের হিলি এক্সপোর্টার্স অ্যান্ড কাস্টমস ক্লিয়ারিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের অন্য স্থলবন্দরগুলোর তুলনায় হিলি বাণিজ্যিক সুবিধা ও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ৩০ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে পণ্য পাঠানো এবং বাংলাদেশ থেকে পণ্য নেওয়া—দুই কার্যক্রমই বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে ভারতীয় ব্যবসায়ী সংগঠনটি।

বন্দরটি বন্ধ হওয়া শুধু সীমান্তের দুই পাড়ের ব্যবসায়ীদের জন্য বাণিজ্যিক সমস্যা নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বড় বাজারগুলোর সরবরাহ ব্যবস্থায়। বিশেষ করে চাল, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচসহ যেসব কৃষিপণ্য প্রয়োজনের সময় ভারত থেকে আমদানি করে বাজারে সরবরাহ বাড়ানো হয়, সেসব পণ্যে হিলি হয়ে আমদানি বন্ধ থাকলে বিকল্প রুটের ওপর চাপ বাড়বে। তবে এর অর্থ এই নয় যে হিলি বন্ধ হলেই সারাদেশে সব নিত্যপণ্যের দাম এক লাফে বেড়ে যাবে। প্রভাব নির্ভর করবে কত দিন বন্দরটি বন্ধ থাকে, বিকল্প বন্দর দিয়ে কত দ্রুত পণ্য আনা যায় এবং স্থানীয় বাজারে মজুত ও উৎপাদনের পরিস্থিতি কেমন—এই তিন বিষয়ের ওপর।

হিলি দিয়ে আসলে কত পণ্য আসে?

হিলি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর হলেও এটি মূলত আমদানিনির্ভর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে হিলি দিয়ে ভারত থেকে ৯ হাজার ৩৮৪টি ট্রাকে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৪৯৩ মেট্রিক টন পণ্য বাংলাদেশে এসেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে গেছে ৪২৯টি ট্রাকে ১০ হাজার ৭৬২ মেট্রিক টন পণ্য। অর্থাৎ ওই পাঁচ মাসে ওজনের হিসাবে ভারত থেকে হিলি দিয়ে বাংলাদেশে আসা পণ্য বাংলাদেশের ভারতমুখী রপ্তানির চেয়ে প্রায় ৩১ গুণ বেশি।

ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্তে হিলি বন্দর দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য  আমদানি-রপ্তানি বন্ধ

এই পরিসংখ্যান হিলির বাণিজ্যিক চরিত্রটিই স্পষ্ট করে—বন্দরটি এখনো বাংলাদেশের জন্য মূলত ভারতীয় পণ্য প্রবেশের একটি বড় দরজা। জুলাই-নভেম্বর সময়ে দৈনিক গড়ে প্রায় ২ হাজার ১৮৬ টন পণ্য ভারত থেকে এসেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে ভারতে গেছে গড়ে প্রায় ৭০ টন পণ্য।

অবশ্য এই হিসাবকে পুরো বছরের চিত্র হিসেবে দেখা যাবে না। এটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসের তথ্য। পরবর্তী মাসগুলোতে পণ্যভেদে আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ বদলেছে। তবে হিলির আমদানিপ্রধান চরিত্রে বড় পরিবর্তন হয়নি। ২০২৫ সালের আগস্টে বন্দর-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন, হিলি দিয়ে চলাচল করা মোট পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশই আমদানি; একই সময়ে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানিও নতুন করে গতি পাচ্ছিল।

বাংলাদেশের রপ্তানিও বেড়েছিল

হিলিকে শুধু ভারতের পণ্য ঢোকার পথ হিসেবে দেখলে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। দীর্ঘদিন প্রায় একমুখী বাণিজ্যের পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।

জুলাই থেকে নভেম্বর—এই পাঁচ মাসে ৪২৯টি ট্রাকে ১০ হাজার ৭৬২ টন পণ্য ভারতে পাঠানো হয়। এসব পণ্যের মধ্যে ছিল দেশীয় কোম্পানির বিস্কুট, আসবাবপত্র, প্লাস্টিক পাইপসহ বিভিন্ন পণ্য।

এর আগে ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্টের ২০ তারিখ পর্যন্ত হিলি দিয়ে ২ হাজার ৯১ টন বাংলাদেশি পণ্য ভারতে রপ্তানি হয়েছিল। রপ্তানি হওয়া পণ্যের মধ্যে ছিল রাইস ব্র্যান অয়েল, টোস্ট বিস্কুট, আমের জুস, ঝুট কাপড়, নুডলস ও বিভিন্ন বেকারি পণ্য।

অর্থাৎ, হিলি বন্ধের অর্থ শুধু ভারতীয় পণ্য না আসা নয়; বাংলাদেশি উৎপাদকদের জন্য একটি স্থলবাজারের দরজাও আপাতত বন্ধ হয়ে যাওয়া।

নিত্যপণ্যে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোথায়?

হিলির সবচেয়ে বড় গুরুত্ব তৈরি হয় যখন কোনো পণ্যের স্থানীয় সরবরাহ কমে যায় এবং সরকার দ্রুত আমদানির মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে চায়। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাই এর সরাসরি প্রমাণ।

হিলিতে বেড়েছে ভারতীয় চালের আমদানি, একদিনেই এলো ৭৬...

২০২৫ সালের আগস্টে চালের বাজারে অস্থিরতার সময় হিলি দিয়ে ভারতীয় চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। আগস্টের ১২ তারিখ থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি মাত্র ৩৫ দিনে হিলি দিয়ে ১ লাখ ৪ হাজার ৮৫৯ টন চাল আমদানি হয়েছিল। ওই সময়ে চালের খুচরা দামে কেজিপ্রতি ৪ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত কমার তথ্যও পাওয়া যায়।

আরও পরে ডিসেম্বরের শুরুতে চার মাসে হিলি দিয়ে ২ লাখ ৩৪ হাজার ২৭০ টন চাল আমদানির তথ্য জানায় কাস্টমস। চাল আমদানির ফলে হিলির বাজারে দাম কেজিপ্রতি ৫-৬ টাকা কমে গিয়েছিল।

এখানে মূল শিক্ষা হলো—হিলি শুধু একটি বাণিজ্যিক রুট নয়, প্রয়োজনে এটি দ্রুত বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর একটি মূল্য-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও।

পেঁয়াজেও একই চিত্র

পেঁয়াজের বাজারে হিলির প্রভাব আরও সরাসরি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে ভারতীয় পেঁয়াজের আমদানি পুনরায় চালু হওয়ার পর হিলির বাজারে স্থানীয় পেঁয়াজের দাম কয়েক দিনের মধ্যে কেজিতে প্রায় ১০-১৫ টাকা কমে যায়। অন্য একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভারতীয় পেঁয়াজ আসার পর হিলির বাজারে দাম এক পর্যায়ে ১২০ টাকা থেকে প্রায় ৭০ টাকায় নেমে আসে।

অর্থাৎ ভারতীয় পেঁয়াজের সরবরাহ কেবল আমদানিকৃত পেঁয়াজের দামই কমায়নি; এটি স্থানীয় পেঁয়াজের দামেও চাপ সৃষ্টি করেছে।

এ কারণেই হিলি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে পেঁয়াজের মতো দ্রুত দামের ওঠানামা করা পণ্যে বাজারের প্রত্যাশা বদলে যেতে পারে। আমদানিকারকরা যদি মনে করেন ভারতীয় পণ্য দ্রুত আসছে না, তাহলে পাইকারি বাজারে সরবরাহের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। সেই অনিশ্চয়তা খুচরা দামে আগাম প্রভাব ফেলতে পারে।

কাঁচামরিচে ঝুঁকিটা এখন সবচেয়ে স্পষ্ট

বর্তমান পরিস্থিতিতে কাঁচামরিচ হিলির গুরুত্ব বোঝার সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ।

দেশে সরবরাহ সংকট ও বন্যা-বৃষ্টির কারণে কাঁচামরিচের দাম জুলাইয়ের শেষ দিকে ঢাকার বাজারে কেজিতে ২৪০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়। এরপর সরকার আমদানির সুযোগ দেয় এবং আগস্টের শুরুতে হিলি দিয়ে ভারতীয় কাঁচামরিচ ঢুকতে শুরু করে।

৩ আগস্ট হিলি দিয়ে প্রথম চালানে প্রায় ২৯.৪৪ টন কাঁচামরিচ আসে। মোট ৬৯টি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২৯ হাজার ৭১০ টন কাঁচামরিচ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। প্রথম চালান আসার দিনই হিলির পাইকারি বাজারে কাঁচামরিচের দাম কেজিতে ২৮০ টাকা থেকে ২৫০ টাকায় নেমে যায়।

ঢাকার বাজারেও আমদানির প্রভাব দেখা যায়। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে কাঁচামরিচের দাম ৪০০ টাকা থেকে নেমে ২৮০-৩২০ টাকায় আসে।

পেঁয়াজের বাজারে ফের অস্থিরতা

এখানেই হিলি বন্ধের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি সবচেয়ে পরিষ্কার। যে সময়ে সরকার বাজারে সরবরাহ বাড়াতে ভারত থেকে কাঁচামরিচ আনছে, সেই সময়েই হিলি দিয়ে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেলে আমদানির বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে সরবরাহের গতি আবার কমে যেতে পারে।

তবে কি হিলি বন্ধ হলেই দাম বাড়বে?

এখানে সতর্ক থাকা জরুরি। হিলি বন্ধ = সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাবে—এমন সরল সমীকরণ অর্থনীতিতে কাজ করে না।

কারণ ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশে আসার আরও কয়েকটি স্থলবন্দর রয়েছে। পণ্যভেদে বেনাপোল, সোনামসজিদ, ভোমরাসহ অন্যান্য রুট ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সমস্যা হলো, হিলির একটি অংশের পণ্য অন্য বন্দরে সরিয়ে নিলে শুধু বিকল্প রুট পাওয়া যথেষ্ট নয়; সেখানে অতিরিক্ত ট্রাক, দ্রুত কাস্টমস ছাড়পত্র, পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং আমদানিকারকদের জন্য কার্যকর খরচ নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যথায় রুট পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যয় বাড়বে। সেই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পাইকারি ও খুচরা দামে যুক্ত হতে পারে।

আর হিলির ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বন্দরটি উত্তরাঞ্চলের বাজারের খুব কাছে। একই পণ্য অন্য রুটে এনে উত্তরাঞ্চলে পাঠাতে হলে অতিরিক্ত দূরত্বের পরিবহন ব্যয় যুক্ত হতে পারে।

বাজারে ‘সরবরাহ সংকটের ভয়’ও দাম বাড়াতে পারে

নিত্যপণ্যের বাজারে প্রকৃত ঘাটতির পাশাপাশি প্রত্যাশাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো আমদানিনির্ভর পণ্যের সরবরাহ বন্ধ হতে পারে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে পাইকার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে সতর্ক হয়ে মজুত বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন।

ফলে বাজারে প্রকৃত ঘাটতি তৈরি হওয়ার আগেই দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

হিলির সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এই বিষয়টি বোঝায়। চাল আমদানির সময় বাজারে সরবরাহ বাড়ায় দাম কমেছিল। পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রেও ভারতীয় পণ্য প্রবেশের খবরের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় বাজারে দাম কমেছে। কাঁচামরিচের ক্ষেত্রেও আমদানি শুরু হওয়ার পর এক সপ্তাহের মধ্যে বড় ধরনের মূল্যপতন হয়েছে।

অর্থাৎ আমদানি শুধু পণ্য সরবরাহ করে না, বাজারের দাম সম্পর্কে প্রত্যাশাও নিয়ন্ত্রণ করে। সেই প্রত্যাশার বিপরীত বার্তা—দীর্ঘমেয়াদি বন্দর বন্ধ—বাজারে উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

মূল্যস্ফীতির সময়ে ঝুঁকিটা কেন বেশি?

হিলি বন্ধের সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশের ভোক্তারা ইতোমধ্যেই উচ্চ খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দামের চাপ অনুভব করছেন। আগস্টের শেষ দিকে বাজারে কাঁচামরিচ, পেঁয়াজসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম নিয়ে চাপ ছিল। জুলাইয়ের শেষ দিকে ঢাকার খুচরা বাজারে কাঁচামরিচ ৪০০ টাকা কেজি পর্যন্ত উঠেছিল এবং স্থানীয় পেঁয়াজও ৫৫-৬৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছিল।

কাঁচা মরিচ ও টমেটো আমদানিতে শুল্ক-কর অব্যাহতির প্রস্তাব অনুমোদন

সরকার পরে কাঁচামরিচ ও টমেটোর আমদানি শুল্ক কমিয়ে প্রথম মাসে সম্মিলিত করভার ৬১ শতাংশ থেকে ২০.৫ শতাংশে নামিয়েছে, যাতে আমদানি বাড়ে এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়।

এই প্রেক্ষাপটে হিলি বন্ধ হওয়া নীতিগতভাবেও একটি অসুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করছে। একদিকে সরকার আমদানি সহজ করে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আমদানি রুট ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্তে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: বন্ধ কত দিন থাকবে?

এক-দুই দিনের বন্ধে বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। কারণ পাইকারি বাজারে সাধারণত কিছু মজুত থাকে এবং অন্য রুট দিয়েও সীমিত আকারে পণ্য আসতে পারে।

কিন্তু এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় বন্ধ থাকলে পরিস্থিতি আলাদা হতে পারে।

প্রথম ধাপ: বন্দরে আটকে থাকা আমদানি কার্যক্রমের কারণে নতুন সরবরাহ কমবে।

দ্বিতীয় ধাপ: আমদানিকারকদের বিকল্প বন্দরে যেতে হবে, ফলে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বাড়তে পারে।

তৃতীয় ধাপ: দ্রুত নষ্ট হয় এমন পণ্য—কাঁচামরিচ, পেঁয়াজসহ কিছু কৃষিপণ্যে সরবরাহের ঘাটতি দ্রুত দৃশ্যমান হতে পারে।

চতুর্থ ধাপ: পাইকারি বাজারে ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে মজুতদারির প্রবণতা বাড়তে পারে।

পঞ্চম ধাপ: দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব খাদ্য মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়তে পারে—বিশেষ করে যেসব পণ্যে স্থানীয় উৎপাদন ও আমদানি উভয়ই বাজারের ভারসাম্য রক্ষা করে।

তবে অন্য স্থলবন্দরগুলো যদি দ্রুত অতিরিক্ত পণ্য গ্রহণ করতে পারে, তাহলে এই প্রভাব অনেকটাই সীমিত রাখা সম্ভব।

রাজস্বেও চাপ পড়বে

হিলি বন্ধের আরেকটি প্রভাব সরকারের রাজস্বে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে বন্দর দিয়ে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৪৯৩ টন পণ্য আমদানির বিপরীতে কাস্টমস রাজস্ব আদায় হয়েছিল ২২৩ কোটি ৭ লাখ টাকা।

অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে হিলি কাস্টমস থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের তথ্য পাওয়া যায়।

অতএব দীর্ঘ সময় বন্দর অচল থাকলে শুধু ব্যবসায়ীদের লেনদেন নয়, সরকারের আমদানি শুল্ক ও কর আদায়ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্যও ধাক্কা

হিলি স্থলবন্দর দিয়ে বাড়ছে রপ্তানি বাণিজ্য

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, হিলি দিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি সাম্প্রতিক সময়ে বাড়ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ১০ হাজার ৭৬২ টন পণ্য ভারতে পাঠানো হয়েছিল। বিস্কুট, আসবাব, প্লাস্টিক পাইপসহ দেশীয় পণ্যের নতুন বাজার তৈরি হচ্ছিল।

সুতরাং দীর্ঘমেয়াদি বন্ধ বাংলাদেশের ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য ও দ্রুত বাজারজাতযোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে বিকল্প রুটের খরচ ও সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

হিলির সংকট আসলে বড় একটি বাণিজ্যিক প্রশ্ন সামনে আনছে

ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এবার বন্দরটির অবকাঠামো, বাণিজ্যিক সুবিধা ও অন্য পশ্চিমবঙ্গের স্থলবন্দরের সঙ্গে প্রতিযোগিতার সক্ষমতার প্রশ্ন তুলেছেন। এর আগে হিলির ব্যবসায়ীরাও কাস্টমস জটিলতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, একসময় দৈনিক ১৫০-২০০ ট্রাক পণ্য এলেও তা কমে ২০-২৫ ট্রাকে নেমেছিল।

অর্থাৎ এবারের বন্ধের ঘটনা হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। এর পেছনে দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত ও বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার প্রশ্নও রয়েছে।

এ কারণে শুধু ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় সাময়িকভাবে বন্দর খুলে দেওয়া যথেষ্ট হবে না। হিলিকে প্রতিযোগিতামূলক করতে কাস্টমস প্রক্রিয়া, পণ্য খালাসের সময়, ট্রাক ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো, সংরক্ষণ সুবিধা ও ব্যবসায়িক খরচ—সবগুলো বিষয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন।

ভারতের স্বাধীনতা দিবসে হিলি স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ

 হিলি বন্ধের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বাজার ব্যবস্থাপনায়

হিলি দিয়ে পাঁচ মাসে ৩ লাখ ৩৪ হাজার টনের বেশি পণ্য বাংলাদেশে ঢোকার বিপরীতে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৭৬২ টন। এই বিশাল পার্থক্য দেখায়, হিলি বাংলাদেশের জন্য কতটা আমদানিনির্ভর একটি বাণিজ্যপথ। তবে হিলির গুরুত্ব শুধু মোট আমদানির পরিমাণে নয়। কোন সময়ে কোন পণ্য আমদানি হচ্ছে—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চালের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে হিলি দিয়ে এক লাখ টনের বেশি চাল এসেছে; পেঁয়াজের দাম বাড়লে ভারতীয় পেঁয়াজ ঢুকে বাজারদর কমেছে; কাঁচামরিচের দাম ৪০০ টাকা ছুঁলে হিলি দিয়ে আমদানি শুরু হওয়ার পর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে নেমেছে।

তাই হিলি যদি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সরাসরি ‘সব পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া’ নয়; বরং সরবরাহ ব্যবস্থার নমনীয়তা কমে যাওয়া। একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট বন্ধ হলে বাজারকে তখন বিকল্প পথ, অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় ও বেশি সময়ের ওপর নির্ভর করতে হয়।

বর্তমান মূল্যস্ফীতির সময়ে সেটিই উদ্বেগের জায়গা। সরকারকে তাই দ্রুত বিকল্প স্থলবন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, নিত্যপণ্যের আমদানি নির্বিঘ্ন রাখা, সীমান্তে পণ্য খালাসের সময় কমানো এবং বাজারে মজুতদারি বা কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ বন্ধ করতে হবে।

হিলি যত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, তত ভালো। কিন্তু এই ঘটনা আরও একটি শিক্ষা দিচ্ছে—নিত্যপণ্যের বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে কোনো একটি সীমান্ত বা বন্দরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকা নিরাপদ নয়। বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন একাধিক কার্যকর আমদানি রুট, দ্রুত কাস্টমস ব্যবস্থা এবং প্রতিযোগিতামূলক স্থলবন্দর নেটওয়ার্ক। তাহলেই কোনো একটি বন্দর বন্ধ হলেও বাজারে তার ধাক্কা সীমিত রাখা সম্ভব হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ডুমডুমায় ব্যবসায়ীদের কাছে উলফা-আইয়ের চাঁদাবাজির চিঠি, জাল বলে দাবি সংগঠনের

হিলি স্থলবন্দর বন্ধ:  নিত্যপণ্যের বাজারে কতটা চাপ পড়বে?

১১:০৪:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬

দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের পণ্য আমদানি-রপ্তানি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের ঘোষণা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন দেশের নিত্যপণ্যের বাজার আগে থেকেই মূল্যচাপ, সরবরাহ সংকট ও পরিবহন ব্যয়ের চাপে অস্থির। ভারতের হিলি এক্সপোর্টার্স অ্যান্ড কাস্টমস ক্লিয়ারিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের অন্য স্থলবন্দরগুলোর তুলনায় হিলি বাণিজ্যিক সুবিধা ও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ৩০ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে পণ্য পাঠানো এবং বাংলাদেশ থেকে পণ্য নেওয়া—দুই কার্যক্রমই বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে ভারতীয় ব্যবসায়ী সংগঠনটি।

বন্দরটি বন্ধ হওয়া শুধু সীমান্তের দুই পাড়ের ব্যবসায়ীদের জন্য বাণিজ্যিক সমস্যা নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বড় বাজারগুলোর সরবরাহ ব্যবস্থায়। বিশেষ করে চাল, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচসহ যেসব কৃষিপণ্য প্রয়োজনের সময় ভারত থেকে আমদানি করে বাজারে সরবরাহ বাড়ানো হয়, সেসব পণ্যে হিলি হয়ে আমদানি বন্ধ থাকলে বিকল্প রুটের ওপর চাপ বাড়বে। তবে এর অর্থ এই নয় যে হিলি বন্ধ হলেই সারাদেশে সব নিত্যপণ্যের দাম এক লাফে বেড়ে যাবে। প্রভাব নির্ভর করবে কত দিন বন্দরটি বন্ধ থাকে, বিকল্প বন্দর দিয়ে কত দ্রুত পণ্য আনা যায় এবং স্থানীয় বাজারে মজুত ও উৎপাদনের পরিস্থিতি কেমন—এই তিন বিষয়ের ওপর।

হিলি দিয়ে আসলে কত পণ্য আসে?

হিলি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর হলেও এটি মূলত আমদানিনির্ভর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে হিলি দিয়ে ভারত থেকে ৯ হাজার ৩৮৪টি ট্রাকে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৪৯৩ মেট্রিক টন পণ্য বাংলাদেশে এসেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে গেছে ৪২৯টি ট্রাকে ১০ হাজার ৭৬২ মেট্রিক টন পণ্য। অর্থাৎ ওই পাঁচ মাসে ওজনের হিসাবে ভারত থেকে হিলি দিয়ে বাংলাদেশে আসা পণ্য বাংলাদেশের ভারতমুখী রপ্তানির চেয়ে প্রায় ৩১ গুণ বেশি।

ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্তে হিলি বন্দর দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য  আমদানি-রপ্তানি বন্ধ

এই পরিসংখ্যান হিলির বাণিজ্যিক চরিত্রটিই স্পষ্ট করে—বন্দরটি এখনো বাংলাদেশের জন্য মূলত ভারতীয় পণ্য প্রবেশের একটি বড় দরজা। জুলাই-নভেম্বর সময়ে দৈনিক গড়ে প্রায় ২ হাজার ১৮৬ টন পণ্য ভারত থেকে এসেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে ভারতে গেছে গড়ে প্রায় ৭০ টন পণ্য।

অবশ্য এই হিসাবকে পুরো বছরের চিত্র হিসেবে দেখা যাবে না। এটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসের তথ্য। পরবর্তী মাসগুলোতে পণ্যভেদে আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ বদলেছে। তবে হিলির আমদানিপ্রধান চরিত্রে বড় পরিবর্তন হয়নি। ২০২৫ সালের আগস্টে বন্দর-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন, হিলি দিয়ে চলাচল করা মোট পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশই আমদানি; একই সময়ে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানিও নতুন করে গতি পাচ্ছিল।

বাংলাদেশের রপ্তানিও বেড়েছিল

হিলিকে শুধু ভারতের পণ্য ঢোকার পথ হিসেবে দেখলে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। দীর্ঘদিন প্রায় একমুখী বাণিজ্যের পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।

জুলাই থেকে নভেম্বর—এই পাঁচ মাসে ৪২৯টি ট্রাকে ১০ হাজার ৭৬২ টন পণ্য ভারতে পাঠানো হয়। এসব পণ্যের মধ্যে ছিল দেশীয় কোম্পানির বিস্কুট, আসবাবপত্র, প্লাস্টিক পাইপসহ বিভিন্ন পণ্য।

এর আগে ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্টের ২০ তারিখ পর্যন্ত হিলি দিয়ে ২ হাজার ৯১ টন বাংলাদেশি পণ্য ভারতে রপ্তানি হয়েছিল। রপ্তানি হওয়া পণ্যের মধ্যে ছিল রাইস ব্র্যান অয়েল, টোস্ট বিস্কুট, আমের জুস, ঝুট কাপড়, নুডলস ও বিভিন্ন বেকারি পণ্য।

অর্থাৎ, হিলি বন্ধের অর্থ শুধু ভারতীয় পণ্য না আসা নয়; বাংলাদেশি উৎপাদকদের জন্য একটি স্থলবাজারের দরজাও আপাতত বন্ধ হয়ে যাওয়া।

নিত্যপণ্যে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোথায়?

হিলির সবচেয়ে বড় গুরুত্ব তৈরি হয় যখন কোনো পণ্যের স্থানীয় সরবরাহ কমে যায় এবং সরকার দ্রুত আমদানির মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে চায়। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাই এর সরাসরি প্রমাণ।

হিলিতে বেড়েছে ভারতীয় চালের আমদানি, একদিনেই এলো ৭৬...

২০২৫ সালের আগস্টে চালের বাজারে অস্থিরতার সময় হিলি দিয়ে ভারতীয় চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। আগস্টের ১২ তারিখ থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি মাত্র ৩৫ দিনে হিলি দিয়ে ১ লাখ ৪ হাজার ৮৫৯ টন চাল আমদানি হয়েছিল। ওই সময়ে চালের খুচরা দামে কেজিপ্রতি ৪ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত কমার তথ্যও পাওয়া যায়।

আরও পরে ডিসেম্বরের শুরুতে চার মাসে হিলি দিয়ে ২ লাখ ৩৪ হাজার ২৭০ টন চাল আমদানির তথ্য জানায় কাস্টমস। চাল আমদানির ফলে হিলির বাজারে দাম কেজিপ্রতি ৫-৬ টাকা কমে গিয়েছিল।

এখানে মূল শিক্ষা হলো—হিলি শুধু একটি বাণিজ্যিক রুট নয়, প্রয়োজনে এটি দ্রুত বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর একটি মূল্য-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও।

পেঁয়াজেও একই চিত্র

পেঁয়াজের বাজারে হিলির প্রভাব আরও সরাসরি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে ভারতীয় পেঁয়াজের আমদানি পুনরায় চালু হওয়ার পর হিলির বাজারে স্থানীয় পেঁয়াজের দাম কয়েক দিনের মধ্যে কেজিতে প্রায় ১০-১৫ টাকা কমে যায়। অন্য একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভারতীয় পেঁয়াজ আসার পর হিলির বাজারে দাম এক পর্যায়ে ১২০ টাকা থেকে প্রায় ৭০ টাকায় নেমে আসে।

অর্থাৎ ভারতীয় পেঁয়াজের সরবরাহ কেবল আমদানিকৃত পেঁয়াজের দামই কমায়নি; এটি স্থানীয় পেঁয়াজের দামেও চাপ সৃষ্টি করেছে।

এ কারণেই হিলি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে পেঁয়াজের মতো দ্রুত দামের ওঠানামা করা পণ্যে বাজারের প্রত্যাশা বদলে যেতে পারে। আমদানিকারকরা যদি মনে করেন ভারতীয় পণ্য দ্রুত আসছে না, তাহলে পাইকারি বাজারে সরবরাহের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। সেই অনিশ্চয়তা খুচরা দামে আগাম প্রভাব ফেলতে পারে।

কাঁচামরিচে ঝুঁকিটা এখন সবচেয়ে স্পষ্ট

বর্তমান পরিস্থিতিতে কাঁচামরিচ হিলির গুরুত্ব বোঝার সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ।

দেশে সরবরাহ সংকট ও বন্যা-বৃষ্টির কারণে কাঁচামরিচের দাম জুলাইয়ের শেষ দিকে ঢাকার বাজারে কেজিতে ২৪০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়। এরপর সরকার আমদানির সুযোগ দেয় এবং আগস্টের শুরুতে হিলি দিয়ে ভারতীয় কাঁচামরিচ ঢুকতে শুরু করে।

৩ আগস্ট হিলি দিয়ে প্রথম চালানে প্রায় ২৯.৪৪ টন কাঁচামরিচ আসে। মোট ৬৯টি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২৯ হাজার ৭১০ টন কাঁচামরিচ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। প্রথম চালান আসার দিনই হিলির পাইকারি বাজারে কাঁচামরিচের দাম কেজিতে ২৮০ টাকা থেকে ২৫০ টাকায় নেমে যায়।

ঢাকার বাজারেও আমদানির প্রভাব দেখা যায়। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে কাঁচামরিচের দাম ৪০০ টাকা থেকে নেমে ২৮০-৩২০ টাকায় আসে।

পেঁয়াজের বাজারে ফের অস্থিরতা

এখানেই হিলি বন্ধের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি সবচেয়ে পরিষ্কার। যে সময়ে সরকার বাজারে সরবরাহ বাড়াতে ভারত থেকে কাঁচামরিচ আনছে, সেই সময়েই হিলি দিয়ে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেলে আমদানির বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে সরবরাহের গতি আবার কমে যেতে পারে।

তবে কি হিলি বন্ধ হলেই দাম বাড়বে?

এখানে সতর্ক থাকা জরুরি। হিলি বন্ধ = সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাবে—এমন সরল সমীকরণ অর্থনীতিতে কাজ করে না।

কারণ ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশে আসার আরও কয়েকটি স্থলবন্দর রয়েছে। পণ্যভেদে বেনাপোল, সোনামসজিদ, ভোমরাসহ অন্যান্য রুট ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সমস্যা হলো, হিলির একটি অংশের পণ্য অন্য বন্দরে সরিয়ে নিলে শুধু বিকল্প রুট পাওয়া যথেষ্ট নয়; সেখানে অতিরিক্ত ট্রাক, দ্রুত কাস্টমস ছাড়পত্র, পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং আমদানিকারকদের জন্য কার্যকর খরচ নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যথায় রুট পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যয় বাড়বে। সেই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পাইকারি ও খুচরা দামে যুক্ত হতে পারে।

আর হিলির ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বন্দরটি উত্তরাঞ্চলের বাজারের খুব কাছে। একই পণ্য অন্য রুটে এনে উত্তরাঞ্চলে পাঠাতে হলে অতিরিক্ত দূরত্বের পরিবহন ব্যয় যুক্ত হতে পারে।

বাজারে ‘সরবরাহ সংকটের ভয়’ও দাম বাড়াতে পারে

নিত্যপণ্যের বাজারে প্রকৃত ঘাটতির পাশাপাশি প্রত্যাশাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো আমদানিনির্ভর পণ্যের সরবরাহ বন্ধ হতে পারে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে পাইকার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে সতর্ক হয়ে মজুত বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন।

ফলে বাজারে প্রকৃত ঘাটতি তৈরি হওয়ার আগেই দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

হিলির সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এই বিষয়টি বোঝায়। চাল আমদানির সময় বাজারে সরবরাহ বাড়ায় দাম কমেছিল। পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রেও ভারতীয় পণ্য প্রবেশের খবরের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় বাজারে দাম কমেছে। কাঁচামরিচের ক্ষেত্রেও আমদানি শুরু হওয়ার পর এক সপ্তাহের মধ্যে বড় ধরনের মূল্যপতন হয়েছে।

অর্থাৎ আমদানি শুধু পণ্য সরবরাহ করে না, বাজারের দাম সম্পর্কে প্রত্যাশাও নিয়ন্ত্রণ করে। সেই প্রত্যাশার বিপরীত বার্তা—দীর্ঘমেয়াদি বন্দর বন্ধ—বাজারে উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

মূল্যস্ফীতির সময়ে ঝুঁকিটা কেন বেশি?

হিলি বন্ধের সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশের ভোক্তারা ইতোমধ্যেই উচ্চ খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দামের চাপ অনুভব করছেন। আগস্টের শেষ দিকে বাজারে কাঁচামরিচ, পেঁয়াজসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম নিয়ে চাপ ছিল। জুলাইয়ের শেষ দিকে ঢাকার খুচরা বাজারে কাঁচামরিচ ৪০০ টাকা কেজি পর্যন্ত উঠেছিল এবং স্থানীয় পেঁয়াজও ৫৫-৬৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছিল।

কাঁচা মরিচ ও টমেটো আমদানিতে শুল্ক-কর অব্যাহতির প্রস্তাব অনুমোদন

সরকার পরে কাঁচামরিচ ও টমেটোর আমদানি শুল্ক কমিয়ে প্রথম মাসে সম্মিলিত করভার ৬১ শতাংশ থেকে ২০.৫ শতাংশে নামিয়েছে, যাতে আমদানি বাড়ে এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়।

এই প্রেক্ষাপটে হিলি বন্ধ হওয়া নীতিগতভাবেও একটি অসুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করছে। একদিকে সরকার আমদানি সহজ করে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আমদানি রুট ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্তে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: বন্ধ কত দিন থাকবে?

এক-দুই দিনের বন্ধে বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। কারণ পাইকারি বাজারে সাধারণত কিছু মজুত থাকে এবং অন্য রুট দিয়েও সীমিত আকারে পণ্য আসতে পারে।

কিন্তু এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় বন্ধ থাকলে পরিস্থিতি আলাদা হতে পারে।

প্রথম ধাপ: বন্দরে আটকে থাকা আমদানি কার্যক্রমের কারণে নতুন সরবরাহ কমবে।

দ্বিতীয় ধাপ: আমদানিকারকদের বিকল্প বন্দরে যেতে হবে, ফলে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বাড়তে পারে।

তৃতীয় ধাপ: দ্রুত নষ্ট হয় এমন পণ্য—কাঁচামরিচ, পেঁয়াজসহ কিছু কৃষিপণ্যে সরবরাহের ঘাটতি দ্রুত দৃশ্যমান হতে পারে।

চতুর্থ ধাপ: পাইকারি বাজারে ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে মজুতদারির প্রবণতা বাড়তে পারে।

পঞ্চম ধাপ: দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব খাদ্য মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়তে পারে—বিশেষ করে যেসব পণ্যে স্থানীয় উৎপাদন ও আমদানি উভয়ই বাজারের ভারসাম্য রক্ষা করে।

তবে অন্য স্থলবন্দরগুলো যদি দ্রুত অতিরিক্ত পণ্য গ্রহণ করতে পারে, তাহলে এই প্রভাব অনেকটাই সীমিত রাখা সম্ভব।

রাজস্বেও চাপ পড়বে

হিলি বন্ধের আরেকটি প্রভাব সরকারের রাজস্বে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে বন্দর দিয়ে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৪৯৩ টন পণ্য আমদানির বিপরীতে কাস্টমস রাজস্ব আদায় হয়েছিল ২২৩ কোটি ৭ লাখ টাকা।

অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে হিলি কাস্টমস থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের তথ্য পাওয়া যায়।

অতএব দীর্ঘ সময় বন্দর অচল থাকলে শুধু ব্যবসায়ীদের লেনদেন নয়, সরকারের আমদানি শুল্ক ও কর আদায়ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্যও ধাক্কা

হিলি স্থলবন্দর দিয়ে বাড়ছে রপ্তানি বাণিজ্য

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, হিলি দিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি সাম্প্রতিক সময়ে বাড়ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ১০ হাজার ৭৬২ টন পণ্য ভারতে পাঠানো হয়েছিল। বিস্কুট, আসবাব, প্লাস্টিক পাইপসহ দেশীয় পণ্যের নতুন বাজার তৈরি হচ্ছিল।

সুতরাং দীর্ঘমেয়াদি বন্ধ বাংলাদেশের ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য ও দ্রুত বাজারজাতযোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে বিকল্প রুটের খরচ ও সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

হিলির সংকট আসলে বড় একটি বাণিজ্যিক প্রশ্ন সামনে আনছে

ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এবার বন্দরটির অবকাঠামো, বাণিজ্যিক সুবিধা ও অন্য পশ্চিমবঙ্গের স্থলবন্দরের সঙ্গে প্রতিযোগিতার সক্ষমতার প্রশ্ন তুলেছেন। এর আগে হিলির ব্যবসায়ীরাও কাস্টমস জটিলতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, একসময় দৈনিক ১৫০-২০০ ট্রাক পণ্য এলেও তা কমে ২০-২৫ ট্রাকে নেমেছিল।

অর্থাৎ এবারের বন্ধের ঘটনা হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। এর পেছনে দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত ও বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার প্রশ্নও রয়েছে।

এ কারণে শুধু ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় সাময়িকভাবে বন্দর খুলে দেওয়া যথেষ্ট হবে না। হিলিকে প্রতিযোগিতামূলক করতে কাস্টমস প্রক্রিয়া, পণ্য খালাসের সময়, ট্রাক ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো, সংরক্ষণ সুবিধা ও ব্যবসায়িক খরচ—সবগুলো বিষয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন।

ভারতের স্বাধীনতা দিবসে হিলি স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ

 হিলি বন্ধের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বাজার ব্যবস্থাপনায়

হিলি দিয়ে পাঁচ মাসে ৩ লাখ ৩৪ হাজার টনের বেশি পণ্য বাংলাদেশে ঢোকার বিপরীতে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৭৬২ টন। এই বিশাল পার্থক্য দেখায়, হিলি বাংলাদেশের জন্য কতটা আমদানিনির্ভর একটি বাণিজ্যপথ। তবে হিলির গুরুত্ব শুধু মোট আমদানির পরিমাণে নয়। কোন সময়ে কোন পণ্য আমদানি হচ্ছে—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চালের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে হিলি দিয়ে এক লাখ টনের বেশি চাল এসেছে; পেঁয়াজের দাম বাড়লে ভারতীয় পেঁয়াজ ঢুকে বাজারদর কমেছে; কাঁচামরিচের দাম ৪০০ টাকা ছুঁলে হিলি দিয়ে আমদানি শুরু হওয়ার পর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে নেমেছে।

তাই হিলি যদি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সরাসরি ‘সব পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া’ নয়; বরং সরবরাহ ব্যবস্থার নমনীয়তা কমে যাওয়া। একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট বন্ধ হলে বাজারকে তখন বিকল্প পথ, অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় ও বেশি সময়ের ওপর নির্ভর করতে হয়।

বর্তমান মূল্যস্ফীতির সময়ে সেটিই উদ্বেগের জায়গা। সরকারকে তাই দ্রুত বিকল্প স্থলবন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, নিত্যপণ্যের আমদানি নির্বিঘ্ন রাখা, সীমান্তে পণ্য খালাসের সময় কমানো এবং বাজারে মজুতদারি বা কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ বন্ধ করতে হবে।

হিলি যত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, তত ভালো। কিন্তু এই ঘটনা আরও একটি শিক্ষা দিচ্ছে—নিত্যপণ্যের বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে কোনো একটি সীমান্ত বা বন্দরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকা নিরাপদ নয়। বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন একাধিক কার্যকর আমদানি রুট, দ্রুত কাস্টমস ব্যবস্থা এবং প্রতিযোগিতামূলক স্থলবন্দর নেটওয়ার্ক। তাহলেই কোনো একটি বন্দর বন্ধ হলেও বাজারে তার ধাক্কা সীমিত রাখা সম্ভব হবে।