কাজাখস্তানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনকে শুধু গণতন্ত্র এগোল কি পিছোল—এই সরল মাপকাঠিতে বিচার করলে দেশটির সামনে থাকা বাস্তব ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের বড় অংশই আড়ালে থেকে যায়। ২৩ আগস্টের নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ নাগরিকদের উদ্দেশে যে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেছেন, তার মধ্যে আসলে দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত রয়েছে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, আজ নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তের প্রকৃত মূল্যায়ন হয়তো বহু বছর পরেই সম্ভব হবে।
এই অবস্থানকে কাজাখস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক কৌশলের একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা হিসেবেও দেখা যায়। দেশটি এমন এক সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করছে, যখন তার চারপাশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে এবং চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা মধ্য এশিয়াকে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।
২৩ আগস্টের নির্বাচন তাই কেবল একটি নির্বাচন ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের পথকে নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি প্রচেষ্টা।
নির্বাচনের ফল ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন
নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল ছিল প্রত্যাশিতই। প্রেসিডেন্টপন্থী আদিলেত পার্টি ৭১ দশমিক ১৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে। ব্যালটে থাকা সাতটি দলই সরকারপন্থী ছিল। বিরোধী দলগুলো নির্বাচনী প্রতিযোগিতার বাইরে ছিল এবং সমালোচনামূলক সাংবাদিকদের ওপর চাপও বেড়েছিল। ফলে সমালোচকদের কাছে এটি গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা সম্প্রসারণের পরিবর্তে ক্ষমতার আরও কেন্দ্রীভবনের উদাহরণ।
এই সমালোচনা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কিন্তু কাজাখস্তানের রাজনৈতিক গতিপথ বোঝার জন্য শুধু নির্বাচনী ব্যবস্থার দিকে তাকানোও যথেষ্ট নয়। কারণ দেশটির নেতৃত্ব একই সঙ্গে এমন একটি রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, যাকে একাধিক পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়।
রাশিয়ার সঙ্গে কাজাখস্তানের সীমান্ত প্রায় ৭ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। চীনের সঙ্গে সীমান্ত প্রায় ১ হাজার ৭৮০ কিলোমিটার। এর বাইরে ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান ও পারস্য উপসাগর ঘিরে সংঘাত এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোননির্ভর যুদ্ধের বিস্তার মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশকেও অনিশ্চিত করে তুলছে।
এই পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কাজাখস্তানের জন্য নিছক প্রশাসনিক সুবিধা নয়। এটি তার বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান শর্ত।
২০২২ সালের অভিজ্ঞতা
২০২২ সালের জানুয়ারির সরকারবিরোধী দাঙ্গা কাজাখস্তানের নেতৃত্বের কাছে এই বাস্তবতাকে অত্যন্ত কঠিনভাবে স্পষ্ট করেছিল। অর্থনৈতিক অসন্তোষের সঙ্গে ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও জড়িয়ে পড়েছিল। সেই সংকট দ্রুত বড় আকার নেওয়ায় তোকায়েভকে রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি সংস্থার সহায়তা চাইতে হয়।
সামরিক সহায়তা ছিল সাময়িক। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে রাশিয়ার হাতে কাজাখস্তানের ওপর উল্লেখযোগ্য সামরিক প্রভাব তৈরির সুযোগ হয়েছিল। একটি দেশের বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি কতটা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, এই ঘটনা তারই উদাহরণ।
তোকায়েভ শেষ পর্যন্ত সংকট থেকে শক্তিশালী অবস্থানে বেরিয়ে আসেন। এরপর থেকেই তাঁর নেতৃত্বে কাজাখস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়েছে।
নতুন সংবিধান ও ক্ষমতা হস্তান্তরের হিসাব
১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া সাংবিধানিক সংস্কার সেই পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের বদলে ১৪৫ সদস্যের কুরুলতাই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মধ্য এশিয়ার তুর্কি ও মঙ্গোল জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক সমাবেশের নাম থেকে এই প্রতিষ্ঠানের নাম নেওয়া হয়েছে—যেসব সমাবেশে বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং শাসক নির্বাচনের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো।
আরও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ পুনঃপ্রবর্তন। নতুন কুরুলতাই বসার পর তোকায়েভ একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট মনোনয়ন দেবেন এবং আইনসভার অনুমোদন চাইবেন।
এই পদটি যে সরাসরি তোকায়েভের উত্তরসূরি নির্ধারণ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু প্রেসিডেন্ট মারা গেলে, দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে কিংবা পদ ছেড়ে দিলে তাঁর ক্ষমতা তাৎক্ষণিকভাবে ভাইস প্রেসিডেন্টের হাতে যাবে। তোকায়েভ ভবিষ্যতে জাতিসংঘের মহাসচিব হওয়ার মতো কোনো আন্তর্জাতিক দায়িত্বের জন্য পদ ছাড়তে পারেন—এমন জল্পনাও রয়েছে।
এই ব্যবস্থার গুরুত্ব বোঝা যায় ২০১৯ সালের ক্ষমতা পরিবর্তনের ইতিহাস থেকে। তোকায়েভকে দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট নুরসুলতান নজরবায়েভের উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেওয়া হলেও নজরবায়েভ ও তাঁর পরিবারের প্রভাব দীর্ঘদিন অটুট ছিল। ২০২২ সালের সংকটের পেছনে এই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ছিল বলে ধারণা করা হয়। পরে তোকায়েভ নিজেই ঘটনাটিকে অভ্যুত্থানের চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেন।
এখনকার সংস্কারগুলো তাই শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়। এগুলোর মধ্যে ভবিষ্যৎ ক্ষমতা হস্তান্তরকে আগেই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা স্পষ্ট।
২০২৯-এর প্রশ্ন
তোকায়েভের বর্তমান মেয়াদ ২০২৯ সালে শেষ হওয়ার কথা। নির্বাচনের অল্প আগে সাংবিধানিক আদালত রায় দিয়েছে, নতুন সংবিধানের কারণে তাঁর প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদের হিসাব নতুন করে শুরু হয়েছে। এর অর্থ তাত্ত্বিকভাবে তিনি ২০২৯ সালের পর আবার নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন।
তবে এই সিদ্ধান্তকে তোকায়েভ ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা হিসেবে দেখার বিরুদ্ধে সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র সতর্ক করেছে। সূত্রটির মতে, এর উদ্দেশ্য ২০২৯ সালের পরও ক্ষমতায় থাকার নিশ্চয়তা তৈরি করা নয়; বরং তোকায়েভকে এমন অবস্থায় পড়া থেকে রক্ষা করা, যেখানে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তিনি কার্যত দুর্বল বা অকার্যকর প্রেসিডেন্টে পরিণত হন।
এই অনিশ্চয়তাই হয়তো পরিকল্পিত। কুরুলতাই, ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ এবং ২০২৯ নিয়ে অস্পষ্টতা—সব মিলিয়ে লক্ষ্য হতে পারে একটি নিয়ন্ত্রিত ও সংঘাতহীন রাজনৈতিক রূপান্তরের পরিবেশ তৈরি করা।
বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতিই আসল পরীক্ষা
কাজাখস্তানের জন্য রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে দেশটির পররাষ্ট্রনীতি। রাষ্ট্রটি চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, কিন্তু কোনো একটির ওপর নির্ভরশীল হতে চায় না।
কাজাখস্তানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আরমান ইসেতভ বিদেশি সাংবাদিক ও বিশ্লেষকদের বলেছেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এখন আরও জটিল ও অনির্দেশ্য হয়ে উঠছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও পরিবহন অবকাঠামো নিয়ে প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। এই বাস্তবতায় স্থিতিশীলতা দেশটির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
মধ্য এশিয়ার রাজনীতি নিয়ে গবেষক আন্দ্রেই কাজানৎসেভের পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, রাজনৈতিক উন্মুক্ততা এবং কার্যকর অর্থনীতি গড়ে তোলার মধ্যে ভারসাম্য রাখা অত্যন্ত কঠিন। চীন অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলকভাবে বন্ধ ব্যবস্থা বজায় রেখেছে। বিপরীতে রাশিয়া ও কিরগিজস্তানে দ্রুত রাজনৈতিক উন্মুক্ততার সঙ্গে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা গেছে। তাঁর মতে, সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কাজাখস্তানই এমন একটি দেশ, যা সমাজের জন্য কিছুটা উন্মুক্ততা তৈরি করেও বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পশ্চাদপসরণ এড়াতে পেরেছে।
তবে এই ভারসাম্য সামনে আরও কঠিন হবে।
মধ্য এশিয়ায় বড় শক্তির প্রতিযোগিতা
চীনের জন্য কাজাখস্তান শুধু একটি প্রতিবেশী দেশ নয়। ইউরেশিয়ার ভেতর দিয়ে রেলপথ, সড়ক ও পাইপলাইন চীনের জন্য সমুদ্রপথের বিকল্প যোগাযোগ তৈরি করে। ভবিষ্যতে সামুদ্রিক প্রবেশপথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে এসব স্থলপথের গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে। কাজাখস্তানের বিশাল ও মূলত সমতল ভূখণ্ড তাকে পূর্ব-পশ্চিম বাণিজ্যপথের স্বাভাবিক করিডরে পরিণত করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্য এশিয়ার বিপুল খনিজ সম্পদকে চীনা সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর সম্ভাব্য উৎস হিসেবে দেখছে। আর রাশিয়া এখনও অঞ্চলটির ঐতিহাসিক ও সামরিক শক্তিকেন্দ্র।
এই প্রতিযোগিতা কাজাখস্তানের সীমান্তের কাছেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কিরগিজস্তানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফর এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপস্থিতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরও একই সময়ে সেখানে থাকবেন। কিরগিজস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে তাঁর সফরে তোকায়েভ, উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়োয়েভ এবং কিরগিজ প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারভের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে কাজাখস্তানের কূটনীতির কাজ অত্যন্ত সূক্ষ্ম। চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন পক্ষকেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়ার অনুভূতি দিতে হবে, কিন্তু কোনো শিবিরের দিকে এতটা ঝুঁকে পড়া যাবে না যাতে অন্য সম্পর্কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্থিতিশীলতার ওপর বাজি
এই প্রেক্ষাপটেই ২৩ আগস্টের নির্বাচনের রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও পরিষ্কার হয়। কাজাখস্তানের নেতৃত্ব আশঙ্কা করছে, অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা যদি বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার সময় দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে দেশের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব যেমন বাড়তে পারে, তেমনি বাইরের শক্তির প্রভাবও দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে।
তোকায়েভের কৌশল তাই এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তিনি চান রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে, কিন্তু সমাজকে পুরোপুরি বন্ধ করতে চান না; ভবিষ্যৎ ক্ষমতা হস্তান্তরের কাঠামো তৈরি করতে চান, কিন্তু নতুন উত্তরাধিকার সংকট তৈরি করতে চান না; একই সঙ্গে চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে যেতে চান, যাতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যেদিকেই মোড় নিক, কাজাখস্তান নিজের কৌশলগত জায়গা ধরে রাখতে পারে।
এই পরিকল্পনা সফল হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। বরং তোকায়েভের নিজের বক্তব্যের মধ্যেই এর উত্তর নিহিত—কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রকৃত মূল্যায়ন হয়তো কয়েক বছর পরেই সম্ভব হবে।
কাজাখস্তান এখন যে পথে হাঁটছে, সেটি গণতন্ত্র বনাম কর্তৃত্ববাদের সরল দ্বন্দ্বের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। এটি মূলত এমন এক রাষ্ট্রের টিকে থাকার কৌশল, যে রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং তিন পরাশক্তির প্রতিযোগিতা সামলাতে হচ্ছে। এই বাজিতে তোকায়েভের সবচেয়ে বড় ভরসা আপাতত একটি বিষয়—স্থিতিশীলতা।
কেন মরিয়াস 



















