দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়েস্টার্ন কেপ প্রদেশে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা টানা তৃতীয় প্রান্তিকে কমেছে। তবে এই পতন এখনো প্রদেশটির দীর্ঘদিনের ভয়াবহ সহিংসতার চিত্র বদলাতে পারেনি। জাতীয়ভাবে হত্যাকাণ্ড কমলেও ওয়েস্টার্ন কেপ এখনো সেই প্রবণতার ব্যতিক্রম হয়ে রয়েছে।
হত্যাকাণ্ড কমলেও হার জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক বেশি
এ বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ওয়েস্টার্ন কেপে ১ হাজার ৭১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১৪৮। অর্থাৎ হত্যাকাণ্ড কমেছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। কিন্তু প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে হত্যার হার দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৯, যেখানে জাতীয় হার ৮ দশমিক ৫।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সর্বশেষ তিন মাসের পরিসংখ্যান আশাব্যঞ্জক হলেও এটিকে এখনই স্থায়ী উন্নতির লক্ষণ বলা ঠিক হবে না।
দীর্ঘ সময়ের হিসাবেও ওয়েস্টার্ন কেপ জাতীয় প্রবণতার তুলনায় অনেক বেশি অস্থির। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রদেশটিতে হত্যাকাণ্ড ছিল ৪ হাজার ১৫০টি। পরের বছর তা বেড়ে ৪ হাজার ৫৪৪-এ দাঁড়ায়। ২০২৪-২৫ সালে কিছুটা কমে ৪ হাজার ৩৬৯ হলেও ২০২৫-২৬ সালে আবার বেড়ে ৪ হাজার ৪৪৮ হয়েছে।
অন্যদিকে একই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকাজুড়ে হত্যাকাণ্ড ২৭ হাজার ৪৯৪ থেকে কমে ২৩ হাজার ৯৬-এ নেমেছে, অর্থাৎ ১৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কোয়াজুলু-নাটালে কমেছে ৩২ শতাংশ, লিম্পোপোতে ২৪ শতাংশ এবং ইস্টার্ন কেপে ১৫ শতাংশ।
উন্নতির ইঙ্গিত মিললেও সতর্ক বিশেষজ্ঞরা
অপরাধ গবেষক ডেভিড ব্রুসের মতে, সর্বশেষ হ্রাসকে এখনই বড় পরিবর্তনের সূচনা বলা সম্ভব নয়। তবে এটি পরিস্থিতির মোড় ঘোরার সম্ভাব্য ইঙ্গিত হতে পারে।
নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ গবেষক আনিনে ক্রিগলার অবশ্য মনে করেন, সর্বশেষ পরিসংখ্যানকে আর কেবল একটি ভালো প্রান্তিক হিসাব বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। গত ১২ মাসের ধারাবাহিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনে ওয়েস্টার্ন কেপে বার্ষিক হত্যাকাণ্ড প্রায় ৪ হাজার ৭১৫-এ পৌঁছেছিল। বর্তমানে তা প্রায় ৪ হাজার ৩৭০-এ নেমেছে, যা প্রায় ৭ শতাংশ কম।
তবে এই পতন ধারাবাহিক ছিল না। ফলে এটিকে স্থায়ী পরিবর্তনের বদলে এখনো উদীয়মান প্রবণতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
লক্ষ্যভিত্তিক পুলিশি তৎপরতার প্রভাব
প্রাদেশিক সরকার সাম্প্রতিক উন্নতির পেছনে লক্ষ্যভিত্তিক পুলিশি অভিযান ও সহিংসতা প্রতিরোধ কর্মসূচির ভূমিকার কথা বলছে।
আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রাদেশিক মন্ত্রী আনরু মারাইস জানান, আইন প্রয়োগ জোরদারের জন্য নির্ধারিত ছয়টি অগ্রাধিকার এলাকায় হত্যাকাণ্ড ১৭ শতাংশ কমেছে। এসব এলাকায় হত্যাকাণ্ড ৩২৯ থেকে ২৭৩-এ নেমেছে, যেখানে পুরো প্রদেশে কমেছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
ছয়টি এলাকার প্রতিটিতেই হত্যাকাণ্ড কমেছে। গুগুলেথুতে কমেছে ৩৩ শতাংশ এবং ডেলফটে ২৪ শতাংশ।
তবে কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, কেবল একটি কর্মসূচির কারণেই এই উন্নতি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো নেই। একই সময়ে পুলিশি অভিযান, বিশেষ বাহিনীর মোতায়েন, সহিংসতা প্রতিরোধ কার্যক্রম এবং জাতীয় পর্যায়ে হত্যাকাণ্ড কমার মতো একাধিক বিষয় কাজ করছে।
অল্প কয়েকটি এলাকাতেই অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড
ওয়েস্টার্ন কেপের সহিংসতার সবচেয়ে উদ্বেগজনক বৈশিষ্ট্য হলো এর ভৌগোলিক কেন্দ্রীভবন। সর্বশেষ তিন মাসে প্রদেশের মোট হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৪৪ শতাংশ ঘটেছে মাত্র ১০টি পুলিশ এলাকায়।
মফুলেনি, নিয়াঙ্গা, ডেলফট, ফিলিপি ইস্ট এবং হারারে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মফুলেনিতে ৭৩টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।
অপরাধ গবেষকদের মতে, ওয়েস্টার্ন কেপের সমস্যা মূলত কেপটাউন মহানগরকেন্দ্রিক। দেশের অন্যান্য প্রদেশে শহর ও গ্রামাঞ্চলে তুলনামূলকভাবে বিস্তৃতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটলেও এখানে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সহিংসতা অত্যন্ত বেশি।
গ্যাং সংঘাত ও মাদক ব্যবসার বড় ভূমিকা
কেপটাউনের অপরাধ পরিস্থিতিতে গ্যাং প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অবৈধ মাদক ব্যবসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মাদক ব্যবসা অপরাধীদের জন্য বিপুল অর্থের সুযোগ তৈরি করে এবং সেই অর্থ ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত সহিংসতায় রূপ নেয়।
সাম্প্রতিক পুলিশি তথ্যেও গ্যাং সহিংসতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। যেসব ৭৬০টি হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে পুলিশ সম্ভাব্য পরিস্থিতি শনাক্ত করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য পেয়েছে, তার মধ্যে ২১৭টি বা ২৯ শতাংশ গ্যাং-সম্পর্কিত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিশোধ, পাল্টা প্রতিশোধ বা শাস্তিমূলক হত্যাকাণ্ড হিসেবে জাতীয়ভাবে চিহ্নিত ৩০৭টি ঘটনার মধ্যে ১৩৯টিই ওয়েস্টার্ন কেপে ঘটেছে।
অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বড় উদ্বেগ
প্রদেশটির প্রাণঘাতী সহিংসতার আরেকটি বড় কারণ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। পুলিশ যে ৯৯১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বিশ্লেষণ করেছে, তার মধ্যে ৬৬৩টিতে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৬৬ দশমিক ৯ শতাংশ হত্যাকাণ্ডেই আগ্নেয়াস্ত্র ছিল।
প্রাদেশিক নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, অবৈধ অস্ত্রের অবাধ বিস্তার ওয়েস্টার্ন কেপের সহিংসতার ভয়াবহতা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা কমেছে বলেই অবৈধ অস্ত্রের মজুত বা ব্যবহার কমেছে—এমন ধারণা করাও বিপজ্জনক।
সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
ওয়েস্টার্ন কেপে হত্যাকাণ্ড কমার সাম্প্রতিক প্রবণতা কিছুটা আশার আলো দেখালেও বিশেষজ্ঞদের মূল প্রশ্ন এখন একটাই—এই পতন কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে।
বিশেষ করে কেপটাউনের যে অল্প কয়েকটি এলাকায় হত্যাকাণ্ডের বড় অংশ সংঘটিত হচ্ছে, সেসব এলাকায় পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে সামগ্রিক উন্নতি খুব বেশি অর্থবহ হবে না।
জাতীয় পর্যায়ে হত্যাকাণ্ড কমলেও ওয়েস্টার্ন কেপ এখনো সেই সাফল্যের সঙ্গে পুরোপুরি তাল মেলাতে পারেনি। সংখ্যাগুলো কিছুটা ইতিবাচক দিকে এগোলেও সহিংসতার মূল কেন্দ্রগুলো এবং গ্যাং ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের প্রভাব এখনো প্রায় অপরিবর্তিত।
ওয়েস্টার্ন কেপের জন্য তাই সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান আশার বার্তা হলেও স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার পথ এখনো অনেক দূর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















