ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আবারও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতার পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা, হরমুজ প্রণালি নিয়ে অচলাবস্থা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগ—সব মিলিয়ে অঞ্চলজুড়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
দক্ষিণ লেবাননে ব্যাপক বিস্ফোরণ
দক্ষিণ লেবাননের মারজেউন জেলার হুলা শহরে ইসরায়েলি বাহিনী বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। একই সময়ে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে।
হাদ্দাথা ও হারিসের মধ্যবর্তী এলাকায় ইসরায়েলি গোলাবর্ষণের পাশাপাশি নবতিয়েহ শহরের একটি ভবনে ইসরায়েলি চালকবিহীন বিমান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় ভবনের ওপরের তলার একটি দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
আল-মানসুরি ও জাওতার আল-গারবিয়েহ এলাকাতেও পরপর বিমান হামলার খবর এসেছে। নবতিয়েহ আল-ফাওকার উত্তরাঞ্চলেও ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের ঐক্যকে কৃতিত্ব দিলেন হিজবুল্লাহ প্রধান
হিজবুল্লাহর মহাসচিব শেখ নাইম কাসেম বলেছেন, ইরানের জনগণের ঐক্য ও দৃঢ়তার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
ঐক্য সপ্তাহ উপলক্ষে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ইরানের জনগণ যতক্ষণ নিজেদের অধিকার ও মাতৃভূমি রক্ষায় দৃঢ় থাকবে, ততক্ষণ শত্রুরা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবে না।
তিনি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একাধিক সামরিক অভিযানের কথা উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন, এসব সংঘাতেও ইরানের জনগণের প্রতিরোধ অব্যাহত ছিল।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে সমঝোতা
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি সমঝোতা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণ না করা পর্যন্ত সেই সমঝোতা বাস্তবায়ন করা হবে না।
তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে ইরানের কোনো তাড়া নেই। প্রণালিতে চলাচলকারী যেকোনো জাহাজকে ইরানের সঙ্গে সমন্বয় ও অনুমোদনের মাধ্যমে চলতে হবে।
তাঁর দাবি, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রণালির জাহাজ চলাচলের ওপর পূর্ণ নজরদারি রাখছে। কাতার ও পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের যোগাযোগও চলমান আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তাদের ভূমিকার সঙ্গে সম্পর্কিত।
চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র
ইরানি তেল কেনার কারণে চীনা ক্রেতাদের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা মার্ক ফাইফল।
তাঁর মতে, চীনের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কূটনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে। কারণ দুই দেশের অর্থনীতি গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
চীনের শোধনাগারগুলো নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি অপরিশোধিত তেল তুলনামূলক কম দামে কিনছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ধারণা, চীন ইরানকে নীরবে সহযোগিতা করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল অনুসরণ করছে।
মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যের আহ্বান
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এক লিখিত বার্তায় তিনি মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা, বন্ধুত্ব ও ঐক্যের ওপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্যে বলা হয়, বিভিন্ন জাতিগত, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে নিজেদের প্রকৃত শত্রুকে চিহ্নিত করে তার পরিকল্পনা বুঝে মোকাবিলা করার আহ্বানও জানিয়েছেন।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সেতু হতে চায় ইরাক
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী বিষয়ক নিরাপত্তা উপদেষ্টা কাসিম আল-আরাজি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যেমন ইরাকের ভালো সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক রয়েছে। তাই দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে ইরাক সেতুর ভূমিকা পালন করতে চায়।
তিনি বলেন, এমন একটি সমঝোতা প্রয়োজন, যা পুরো অঞ্চলের অধিকার ও স্বার্থ নিশ্চিত করতে পারে। ইরান ইরাক থেকে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো সরানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চুক্তি হলেও ইরানে হামলার হুমকি ইসরায়েলের
ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের কোনো চুক্তি হলেও তেহরান যদি আবার পারমাণবিক কর্মসূচি বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠনের চেষ্টা করে, তাহলে ইসরায়েল আবারও হামলা চালাবে।
কোহেনের দাবি, ইসরায়েল হামলা না চালালে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারত। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দুই থেকে চার বছর পিছিয়ে গেছে।
ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর ঘোষণা
ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাজিদ ইবনে রেজা জানিয়েছেন, দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার কাজ বন্ধ হবে না।
তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্যই ইরানের প্রতিরক্ষা শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কোনো শত্রু ইরানকে লক্ষ্য করলে তাকে ঐক্যবদ্ধ জনগণের মোকাবিলা করতে হবে।
হরমুজে ৮২ বাণিজ্যিক জাহাজ ঘুরিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, ইরানকে ঘিরে নৌ অবরোধের অংশ হিসেবে তাদের বাহিনী ৮২টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে। এ ছাড়া তিনটি জাহাজ অচল করা এবং দুটি জাহাজে উঠে তল্লাশি চালানোর কথাও জানানো হয়েছে।
এদিকে ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ হরমুজ প্রণালি দিয়ে কত পরিমাণ তেল বের হয়েছে এবং যুদ্ধের প্রকৃত আর্থিক ব্যয় কত—এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যকে মিথ্যা বলে অভিযোগ করেছেন।
ইরানের তেল আয় নিয়ে নতুন দাবি
ইরানের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, চলতি ইরানি বছরের প্রথম চার মাসে তেল বিক্রি থেকে পাওয়া প্রায় ৭৫০ কোটি ডলার দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকে স্থানান্তর করা হয়েছে।
ইরানের তেল মন্ত্রণালয়ের দাবি, জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় মেটাতে এই অর্থ যথেষ্ট হবে। একই সঙ্গে চলতি অর্থবছরের বাজেটে নির্ধারিত তেল আয়ের লক্ষ্যের প্রায় ৯৯ শতাংশ ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
ইরানে সন্ত্রাসী দলের বিরুদ্ধে অভিযানের দাবি
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী জানিয়েছে, সারাভান এলাকায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সন্ত্রাসী দলের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, অভিযানে একজন নিহত ও ছয়জন আটক হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে বিস্ফোরক, অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং যোগাযোগের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে ইরানকে কেন্দ্র করে সামরিক সংঘাত এখন শুধু ইরান-ইসরায়েল বা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। লেবানন, হরমুজ প্রণালি, ইরাক, ওমান, কাতার, পাকিস্তান এবং চীনের মতো দেশগুলোও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















