পাকিস্তানে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে গুগল। করাচিতে প্রথম দেশীয় কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টটির এই আনুষ্ঠানিক প্রবেশকে দেশটির ৩০ বিলিয়ন ডলারের আইটি রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তার পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, এর পেছনে পাকিস্তানের দ্রুত বিকশিত ডিজিটাল বাজারে গুগলের ব্যবসা আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
গুগলের পাকিস্তান কার্যালয় উদ্বোধন
১৮ আগস্ট ইসলামাবাদে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকারি বাসভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে করাচিতে নতুন কার্যালয় উদ্বোধনের ঘোষণা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে গুগলের সিঙ্গাপুরভিত্তিক সরকারি বিষয়ক ও জননীতি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট উইলসন হোয়াইট বলেন, স্থানীয় জনশক্তি ও ব্যবসায় বিনিয়োগ, হার্ডওয়্যার রপ্তানির জন্য উৎপাদন ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে পাকিস্তানের ৩০ বিলিয়ন ডলারের আইটি রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করবে গুগল।
তবে বাস্তবতা হলো, গত জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরে পাকিস্তানের টেলিযোগাযোগ, কম্পিউটার ও তথ্যসেবা খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে রেকর্ড ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। ফলে ৩০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা থেকে দেশটি এখনও অনেক দূরে।
গুগলের দাবি ও স্থানীয় উদ্যোগ
গুগলের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে পাকিস্তানের স্থানীয় ব্যবসা ও পরিবারগুলোর জন্য প্রতিষ্ঠানটি ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রেখেছে এবং ৯ লাখ ৬০ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান তৈরিতে সহায়তা করেছে।
২১ আগস্ট পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়াতে একটি সমঝোতা স্মারকও সই করেছে গুগল। সরকারি কার্যক্রম, কৃষি, ডিজিটাল লেনদেন, অ্যাপ তৈরি এবং গেম উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই সহযোগিতা হবে।
আইটি রপ্তানিতে অবদানের বিষয়ে গুগল জানিয়েছে, পাকিস্তানের দুটি অংশীদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তারা ক্রোমবুক সংযোজনের একটি উৎপাদন লাইন নিয়ে কাজ করছে। এর বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৫ লাখ ইউনিট করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাড়ছে পাকিস্তানের ডিজিটাল বাজার
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানে গুগলের আনুষ্ঠানিক কার্যালয় স্থাপনের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটির ইন্টারনেট ব্যবহার, ডিজিটাল লেনদেন এবং অনলাইন ব্যবসা দ্রুত বাড়ছে।
পাকিস্তান ক্রেডিট রেটিং এজেন্সির হিসাবে, দেশটিতে গুগলের প্রধান ব্যবসা এতদিন ছিল ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন। গত জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরে পাকিস্তান থেকে গুগলের বিজ্ঞাপন আয় প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ ডলার হতে পারে বলে সংস্থাটি ধারণা করেছে। তবে গুগল দেশভিত্তিক আর্থিক হিসাব বা ভবিষ্যৎ আয়ের পূর্বাভাস প্রকাশ করেনি।
লাহোরের আইন ও কর পরামর্শক ইকরাম উল হক বলেন, গত চার বছরে পাকিস্তানে ব্রডব্যান্ড সংযোগ ১১ কোটি ৯০ লাখ থেকে বেড়ে ১৬ কোটি ১০ লাখ হয়েছে। একই সময়ে ডিজিটাল লেনদেনও ২০২২ অর্থবছরের ১ কোটি ৩৬ লাখ থেকে ২০২৫ অর্থবছরে বেড়ে ১১ কোটি ৮০ লাখে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, এই পরিবর্তন পাকিস্তানকে শুধু বিপুল জনসংখ্যার দেশ নয়, বরং বড় একটি ডিজিটাল বাজারে পরিণত করছে।
আঞ্চলিক ঘাঁটি হওয়ার সম্ভাবনা
ডেটা দারবারের সহপ্রতিষ্ঠাতা মুতাহের খান বলেন, পাকিস্তানের অনেক অ্যাপ ও গেম নির্মাতা গুগলের অ্যাপ স্টোর ব্যবহার করেন। এসব প্রতিষ্ঠান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুগলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও উন্নত সেবা পাওয়ার প্রয়োজন বাড়ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের শাসন ও উদ্ভাবনবিষয়ক পরামর্শক সাওলেহা কামাল বলেন, পাকিস্তানের ই-কমার্স বাজার এখনও ১০ বিলিয়ন ডলারের নিচে হলেও দ্রুত বাড়ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেটসের হিসাবে, দেশটির ব্যবসা-থেকে-ভোক্তা ই-কমার্স বাজারের আকার ১৪ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৯ সাল পর্যন্ত বার্ষিক ৯ দশমিক ৭ শতাংশ হারে বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বাইরে পাকিস্তানকে আঞ্চলিক বাজার হিসেবে দেখার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, আঞ্চলিক ঘাঁটি হিসেবে পাকিস্তানের সম্ভাবনা নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই।
ইকরাম উল হকের মতে, পাকিস্তান এখনও কম আয়ের এবং কম ব্যবহারকারী-প্রতি-রাজস্বের বাজার। বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ, অসম ইন্টারনেট সংযোগ, অনিশ্চিত করব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপের মতো চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তার ভাষায়, একটি কার্যালয় খোলা বড় তথ্যকেন্দ্র বা বিপুল মূলধনী বিনিয়োগের সমান নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















