মস্কোতে সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফের সাম্প্রতিক সফর নিছক কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না—এমনটাই মনে করছেন পশ্চিমা নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। সামরিক বিমানে করে তাঁর প্রকাশ্য সফর, রাশিয়ার নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক এবং সফর ঘিরে ওয়াশিংটনের নানা বার্তা—সব মিলিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ক্রেমলিনকে একটি বিষয় বোঝাতে চাইছে: ইউক্রেন যুদ্ধের বিস্তার যেন ন্যাটোর ভূখণ্ডে না পৌঁছায়।
প্রশ্ন হলো, এই বার্তা কি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে থামানোর জন্য যথেষ্ট? আর রাশিয়া যদি ন্যাটোর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়, সেটি কি সরাসরি সামরিক হামলা হবে, নাকি আরও সূক্ষ্ম কোনো পদ্ধতিতে শুরু হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ২০২২ সালের ইউক্রেন আক্রমণের আগের পরিস্থিতির দিকে তাকানো জরুরি। কারণ, তখনও যুক্তরাষ্ট্র মস্কোকে সম্ভাব্য আগ্রাসনের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। কিন্তু সতর্কবার্তা সত্ত্বেও পুতিন শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ চালান।
র্যাটক্লিফের সফর তাই একই সঙ্গে সতর্কতা ও পরীক্ষার মুহূর্ত। ওয়াশিংটন জানতে চাইছে, আগের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা থেকে এবার মস্কো ভিন্নভাবে হিসাব করবে কি না।
ন্যাটোর বিরুদ্ধে সরাসরি হামলার সম্ভাবনা কতটা
বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়া বাল্টিক অঞ্চলের কোনো ন্যাটো সদস্যকে বড় আকারে আক্রমণ করতে যাচ্ছে—এমন স্পষ্ট সামরিক প্রস্তুতির লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে এস্তোনিয়া বা লাটভিয়ার মতো দেশকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার বড় সামরিক অভিযান চালানো সহজ হবে না, কারণ ইউক্রেনেই রুশ বাহিনীর বিপুল অংশ দীর্ঘদিন ধরে ব্যস্ত।
এ কারণে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হয়তো প্রচলিত অর্থে যুদ্ধ নয়।

বরং সীমিত সামরিক অনুপ্রবেশ, নাশকতা, সাইবার হামলা কিংবা ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়া পশ্চিমা দেশগুলোর অবকাঠামোর ওপর গোপন আক্রমণের মতো কর্মকাণ্ড পরিস্থিতিকে দ্রুত বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।
বাল্টিক দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব দেশের কিছু অঞ্চলে রুশভাষী জনগোষ্ঠী রয়েছে। সেই বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে কোনো সীমিত অভিযান চালানো হলে মস্কো হয়তো সেটিকে স্থানীয় বা সীমিত পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইবে। কিন্তু ন্যাটোর একটি সদস্য দেশের ভূখণ্ডে রুশ বাহিনীর প্রবেশ মানেই জোটের জন্য কঠিন সিদ্ধান্তের সূচনা।
কারণ ন্যাটোর প্রতিরক্ষা কাঠামোর মূল ভিত্তিই হলো—এক সদস্যের ওপর হামলা পুরো জোটের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে নাশকতার ঝুঁকি
রাশিয়ার সম্ভাব্য কৌশল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তাই গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকাণ্ডের বিষয়টি সামনে চলে আসে। ইউক্রেনে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর জন্য ইউরোপের যে সরবরাহব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, সেটিই রাশিয়ার জন্য একটি সম্ভাব্য লক্ষ্য।
বিমানবন্দর, রেলপথ, গুদাম, পরিবহনকেন্দ্র কিংবা অস্ত্র সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য অবকাঠামোয় নাশকতা ঘটানো হলে সেটি সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা না করেও পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ঘিরে ইউরোপে যে ধরনের সন্দেহজনক ঘটনা ঘটেছে, তা এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে। জার্মানির লাইপজিগ বিমানবন্দর-সংক্রান্ত একটি ঘটনায় বিস্ফোরক বহনকারী ড্রোন পাওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। মস্কো অবশ্য ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
তবু ঘটনাগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব কম নয়। কোনো নাশকতায় প্রাণহানি ঘটলে কিংবা বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষতি হলে পশ্চিমা সরকারগুলোর ওপর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ বাড়বে। তখন প্রশ্ন উঠবে—কোন পর্যায় পর্যন্ত প্রতিক্রিয়া জানালে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে থাকবে, আর কোন পর্যায় থেকে সেটি রাশিয়া-ন্যাটো সরাসরি সংঘর্ষে রূপ নেবে?
এটাই সম্ভবত বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক।
ভয় দেখানো নয়, বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ

র্যাটক্লিফের মস্কো সফরের তাৎপর্য এখানেই। তাঁর সফরকে যদি কেবল একটি গোপন গোয়েন্দা বৈঠক হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এর প্রকাশ্য চরিত্রটি ব্যাখ্যা করা কঠিন। সফরের আগে ও পরে যে বার্তা সামনে এসেছে, তাতে বোঝা যায়—যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে রুশ নেতৃত্ব যেন অন্তত সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে নতুন করে হিসাব করে।
প্রতিরোধের মূল উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো নয়; বরং তাকে বোঝানো যে আগ্রাসনের লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হবে।
এই জায়গায় পশ্চিমা নীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। রাশিয়া যদি মনে করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত, তাহলে সীমিত ঝুঁকি নেওয়ার ব্যাপারে ক্রেমলিন আরও সাহসী হতে পারে। বিপরীতে, ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া কতটা দৃঢ় হবে—এ নিয়ে মস্কোর মধ্যে যদি অনিশ্চয়তা তৈরি করা যায়, তাহলে সেটিই কার্যকর প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে প্রতিরোধের পথ নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যেও মতভেদ রয়েছে।
কেউ মনে করেন, গোপন পাল্টা অভিযান এবং গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়াতে হবে। অন্যরা মনে করেন, নাশকতার জবাবও এমনভাবে দিতে হবে যাতে মস্কো পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারে—প্রতিটি আক্রমণের মূল্য আছে।
আবার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের পক্ষেও শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে। নতুন নিষেধাজ্ঞা, রুশ নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং প্রকাশ্যে দায় নির্ধারণ—এসব পদক্ষেপ সামরিক সংঘাত ছাড়াই রাশিয়ার কর্মকাণ্ডের খরচ বাড়াতে পারে।
সবচেয়ে কার্যকর কৌশল সম্ভবত এই পথগুলোর সমন্বয়।
পুতিন কি আগের ভুল থেকে শিখেছেন?
২০২১ সালে তৎকালীন সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম বার্নস মস্কো সফর করে পুতিনকে সতর্ক করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র তখন রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত থাকার কথা জানায়। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা রুশ সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেনি।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি পুরোপুরি একই নয়।
ইউক্রেন যুদ্ধের কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা রাশিয়ার জন্যও ব্যয়বহুল হয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং ইউরোপের সামরিক পুনর্গঠন মস্কোকে দেখিয়েছে যে সামরিক পদক্ষেপের পরিণতি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
বিশেষ করে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন ইউরোপকে বিভক্ত করার বদলে অনেক ক্ষেত্রে উল্টো ফল দিয়েছে। সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের ন্যাটোতে যোগদানের সিদ্ধান্ত তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষতার অবস্থান বদলে দুই দেশই শেষ পর্যন্ত জোটে যোগ দিয়েছে।
এটি রাশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হওয়া উচিত।
মস্কো যদি ইউরোপীয় নিরাপত্তাব্যবস্থাকে দুর্বল করতে চায়, কিন্তু তার প্রতিটি পদক্ষেপ ইউরোপীয় দেশগুলোকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে ন্যাটোর ছাতার নিচে নিয়ে আসে, তাহলে কৌশলটির ফলাফল শেষ পর্যন্ত উল্টো হয়ে যায়।
পরমাণু ঝুঁকি কি আবার সামনে আসতে পারে?
ইউক্রেন যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ সম্ভাবনাগুলোর একটি ছিল পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা। ২০২২ সালে রুশ বাহিনীর সামরিক বিপর্যয়ের পর সেই উদ্বেগ বিশেষভাবে বেড়েছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সতর্কবার্তাও রাশিয়ার হিসাবকে প্রভাবিত করেছিল বলে মনে করা হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম বলে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে এখন যে ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সামরিক সুবিধা আগের তুলনায় কম।
তবে ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয় এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথ যত সংকীর্ণ হয়, ততই ভুল হিসাবের সম্ভাবনা বাড়ে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা ট্রাম্পের অনিশ্চয়তা?
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিও গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে যে ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তা ক্রেমলিনকে হয়তো নতুন করে হিসাব করার সুযোগ দিয়েছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যদি একই সময়ে ইউরোপীয় নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য বৈশ্বিক সংকটে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে রাশিয়া মনে করতে পারে—ন্যাটোর কোনো সদস্যকে সীমিতভাবে চ্যালেঞ্জ করলেও ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া হয়তো আগের মতো দ্রুত বা ঐক্যবদ্ধ হবে না।
র্যাটক্লিফের সফর সেই সংশয় দূর করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
এর বার্তা হতে পারে খুব সরল: ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করা এক বিষয়, কিন্তু ন্যাটোর সদস্যদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন সীমারেখা।

রাশিয়া-ন্যাটো সংঘাতের সবচেয়ে বড় বিপদ
এই যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এসে সবচেয়ে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—রাশিয়া ও ইউক্রেন, কোনো পক্ষই এখনো এমন একটি সমাপ্তির পথ তৈরি করতে পারেনি যা এত বিপুল প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিতে পারে।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে প্রতিটি পক্ষের মধ্যেই এমন ধারণা জন্মাতে পারে যে সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করা রাজনৈতিকভাবে লাভজনক।
ইউক্রেনের ক্ষেত্রে পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে যোগাযোগের পথ রয়েছে। কিন্তু রাশিয়ার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা। পুতিনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো অনেক বেশি কেন্দ্রীভূত, ফলে তাঁকে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে বোঝানোর কাজও কঠিন।
তাই র্যাটক্লিফের মস্কো সফরের সাফল্য মাপতে হলে কোনো প্রকাশ্য চুক্তি বা নাটকীয় ঘোষণা খোঁজার প্রয়োজন নেই। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই সফর কি ক্রেমলিনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামান্য হলেও সংশয় তৈরি করতে পেরেছে?
কারণ রাশিয়া যদি বুঝতে পারে যে ন্যাটোর বিরুদ্ধে একটি সীমিত পদক্ষেপও অনিয়ন্ত্রিত সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে, তাহলে সেই দ্বিধাই প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ফল হতে পারে।
এই মুহূর্তে রাশিয়ার ন্যাটো আক্রমণ অবশ্যম্ভাবী—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো প্রমাণ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে আত্মতুষ্টিরও সুযোগ নেই। সরাসরি যুদ্ধের বদলে সীমিত অনুপ্রবেশ, নাশকতা কিংবা গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে সংঘাত বাড়ানোর সম্ভাবনাই হয়তো বেশি বাস্তব।
আর সেই কারণেই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ‘রাশিয়া ন্যাটোকে আক্রমণ করবে কি না’ নয়। বরং প্রশ্ন হলো—মস্কো কতটা দূর পর্যন্ত যেতে পারবে বলে মনে করছে, এবং পশ্চিমা জোট কোন পর্যায়ে তাকে থামাতে প্রস্তুত?
এই সীমারেখা যত অস্পষ্ট থাকবে, ইউরোপের নিরাপত্তা তত বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।




















