এক মাসেরও বেশি সময়ের আপেক্ষিক সামরিক স্থবিরতার পর আবারও সরাসরি হামলা-পাল্টা হামলায় জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। সোমবার ভোরে শুরু হওয়া এই পাল্টাপাল্টি হামলা মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সামরিক উত্তেজনাকে নতুন করে ভয়াবহ সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে রোববার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের লারাক দ্বীপে দুটি রকেট উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ওই উৎক্ষেপণ ব্যবস্থাগুলো থেকে হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্র মাইন স্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।
হরমুজ প্রণালিই সংঘাতের কেন্দ্র
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেলবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি গত ছয় মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বেসামরিক জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে তারা এই জলপথে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে চায়। অন্যদিকে ইরান দীর্ঘদিন ধরে প্রণালিটির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাগত অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ডের মুখপাত্র টিম হকিন্স জানান, লারাক দ্বীপে ইরানি বাহিনীকে প্রণালিতে মাইন স্থাপনের প্রস্তুতি নিতে দেখা যাওয়ার পর দুটি রকেট উৎক্ষেপণ ব্যবস্থায় হামলা চালানো হয়।

মার্কিন সামরিক কমান্ড একে সীমিত ও নির্ভুল অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের ভাষ্য, হরমুজ প্রণালিতে তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করা ইরানি মাইন স্থাপনকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
মার্কিন হামলার পর ইরান পাল্টা আঘাত হানে। সোমবার সকালে ইরান দাবি করে, তারা জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও ধ্বংস করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো বেসামরিক মানুষ বা স্থাপনার জন্য হুমকি তৈরি করার আগেই নিষ্ক্রিয় করা হয় বলে জানিয়েছে দেশটি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের জলসীমার ওপর একটি চালকবিহীন আকাশযান শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এর আগে দাবি করা হয়েছিল, দেশটিতে মার্কিন সেনাদের অবস্থান করা একটি ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী।
তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ওই ঘাঁটিতে হামলার কথা অস্বীকার করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘটনাটিকে বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছে, নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানানোর পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে।
ইরানের কঠোর হুঁশিয়ারি
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তারা যুদ্ধ চায় না। তবে আগ্রাসনের মুখে ইরান নীরব থাকবে না এবং প্রয়োজন হলে নির্ণায়ক জবাব দেওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীও যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে কৌশলগত ও প্রাণঘাতী ভুল বলে অভিহিত করেছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনকে এর পরিণতির জন্য সতর্ক করে পাল্টা জবাবের অঙ্গীকার করেছে।
লারাক দ্বীপের বাসিন্দারা বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে হামলায় সামরিক সদস্য ও বেসামরিক মানুষের হতাহতের খবরও প্রকাশ করা হয়েছে।
এক সপ্তাহ আগেই মাইনমুক্ত করা হয়েছিল হরমুজ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের দাবি, গত সপ্তাহেই হরমুজ প্রণালির আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের পথ থেকে সমুদ্র মাইন সরানোর কাজ শেষ করেছে তারা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে সতর্ক করে বলেছিলেন, নতুন করে কোনো জাহাজ বা নৌযান থেকে মাইন স্থাপন করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে এবং ধারাবাহিকভাবে ধ্বংস করা হবে।
এর মাত্র কয়েক দিন পরই লারাক দ্বীপে হামলা চালানো হলো। ফলে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাত আবারও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কূটনৈতিক উদ্যোগও থমকে আছে
ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
:max_bytes(150000):strip_icc()/GettyImages-1163026796-ef8fdfa1a68a471d8bda5aeab73c98c0.jpg)
ইরান ও ওমান অবশ্য হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক যোগাযোগ পুনরায় স্বাভাবিক করার একটি সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। কাতারসহ আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরাও এই আলোচনাকে সমর্থন করছে।
ইরানি কর্মকর্তারা বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে ভবিষ্যতের জাহাজ চলাচল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর আলোচনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেছেন, যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়—এমন একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। তার মতে, সংকটের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুই দিক মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।
সামরিক হামলার পাশাপাশি বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছিল। ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি দেশটির সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা বিভিন্ন দেশের ওপরও চাপ বাড়ানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে প্রতি সপ্তাহেই নতুন করে পরোক্ষ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। শুরুতে ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্য করা হবে বলে তিনি জানান।
এর আগে মার্কিন প্রশাসন ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন না করা দেশগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল।
তেলের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট তেলের দাম ২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ৫৭ ডলারে পৌঁছায়।
যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দামও ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ দশমিক ৬৪ ডলারে ওঠে।
হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, জাহাজ চলাচল এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর আরও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















