০৬:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
৭ কোটি বছরের পুরোনো ‘হাঙরের কবরস্থান’ আবিষ্কার মিশরের পশ্চিম মরুভূমিতে উত্তর সাইপ্রাসে ফেরি দুর্ঘটনা: মায়ের হাত ফসকে হারিয়ে গেল ১২ বছরের মেয়ে, নিখোঁজ আরও এক সন্তান খার্গ দ্বীপ ধ্বংসের ট্রাম্পের দাবি উড়িয়ে দিল ইরান, ছড়িয়ে পড়ল এআই-তৈরি ভিডিও ইউরোপকে বাঁচাতে শুধু বিশেষজ্ঞের টেবিল নয়, দরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ভয়াবহ বন্যায় নেপালে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকা শত শত শ্রমিক, চলছে প্রাণপণ উদ্ধার অভিযান লন্ডনের পতন: শত্রুর হাতে নয়, নিজের অব্যবস্থাপনায় ভয়াবহ বন্যার পর চীনের কাছে আরও আগাম সতর্কতা ও তথ্য চায় নেপাল চীনের উত্থান: উন্নয়ন রাষ্ট্র থেকে সভ্যতাভিত্তিক বিশ্বদর্শনের পথে ইরানি চালকবিহীন বিমান ভূপাতিতের দাবি সংযুক্ত আরব আমিরাতের, বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা তেলের বাজারে ফের অস্থিরতা—যুক্তরাষ্ট্র-ইরান হামলা শুরু হতেই দাম বাড়ল সাড়ে ৩ শতাংশ

হরমুজ ঘিরে ফের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে উত্তেজনা

কয়েক সপ্তাহের বিরতির পর আবারও সরাসরি সামরিক হামলা-পাল্টা হামলায় জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। রোববার ইরানের দক্ষিণ উপকূলের লারাক দ্বীপে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব ব্যবস্থা দিয়ে হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্র মাইন পাতা হচ্ছিল। এর জবাবে ইরান জর্ডানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। জর্ডান জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র আটকে দিয়েছে।

এই হামলা গত জুলাইয়ের শেষের পর ইরানের কোনো স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পরিচিত সামরিক অভিযান। একই সময়ে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতিও নিচ্ছে ওয়াশিংটন।

লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে মাইন পেতে থাকা ইরানি বাহিনীকে লক্ষ্য করেই লারাক দ্বীপে সীমিত ও নির্ভুল হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব মাইন আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করছিল।

ইরানের পক্ষ থেকে এই হামলাকে আগ্রাসন হিসেবে দেখা হয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, লারাক দ্বীপে ইরানি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় তারা পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র

ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী জানিয়েছে, লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার জবাবে জর্ডানে থাকা দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।

ইরানের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিং হুসেইন ও আল-আজরাক বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান ব্যবহার করা হয়। ইরানি কর্তৃপক্ষ পরে হামলার ভিডিও প্রকাশ করেছে। তবে ভিডিওতে কখন এবং কোথায় এসব অস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করা হয়নি।

জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতেও ইরানি হামলার অভিযোগ

ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, সোমবার ভোরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল মিনহাদ বিমানঘাঁটিতে চালকবিহীন আকাশযান দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। ওই ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও হেলিকপ্টার অবস্থান করছিল বলে দাবি করেছে ইরান।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশটির জলসীমার ওপর একটি ইরানি চালকবিহীন আকাশযান শনাক্ত ও প্রতিহত করেছে। আবুধাবি এই ঘটনাকে বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং নিজেদের সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকারও সংযুক্ত আরব আমিরাত সংরক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে।

খার্গ দ্বীপ নিয়ে ট্রাম্পের দাবি

লারাক দ্বীপে হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপও ব্যাপক হামলার শিকার হচ্ছে। তিনি দ্বীপটির স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন।

তবে ইরানের পক্ষ থেকে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। জাতীয় ইরানি তেল কোম্পানির প্রধান হামিদ বোভার্দ বলেছেন, খার্গ দ্বীপের পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক রয়েছে এবং তেল উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।

তিনি ট্রাম্পের বক্তব্যকে হাস্যকর বলে মন্তব্য করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখে দ্বীপটির তেলকর্মীরা কার্যক্রম বন্ধ হতে দেননি।

ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপের মাধ্যমে হয়ে থাকে। বর্তমানে সেখানে তেল সংরক্ষণাগার ও জেটি পুনর্নির্মাণ এবং আধুনিকায়নের কাজও চলছে।Iran closes Strait of Hormuz again and downplays talks with US that will  begin in Switzerland | Fortune

হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন সংকট

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে হরমুজ প্রণালিতে। বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হতো।

গত কয়েক মাস ধরে প্রণালিটি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ব্যাপকভাবে কমেছে। বিভিন্ন জাহাজ হামলার আশঙ্কায় এই জলপথ এড়িয়ে চলছে।

ইরান দাবি করছে, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত বলে যে বক্তব্য দিচ্ছে তা মিথ্যা। দেশটির বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর নৌবাহিনী জানিয়েছে, ইরানের অনুমতি ছাড়া জাহাজ চলাচল করতে পারবে না।

অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, প্রণালিতে আগে পাতা সব মাইন সরিয়ে ফেলা অথবা বিস্ফোরিত করা হয়েছে। নতুন করে কোনো জাহাজ বা নৌযান মাইন পেতে গেলে তা ধ্বংস করা হবে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।

তেলের দামে বড় প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। পরে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট তেলের দাম প্রায় ৯০ ডলারে উঠে যায়।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সপ্তাহান্তে দৃশ্যমান পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা কমে প্রতিদিন মাত্র পাঁচটিতে নেমে আসে। তবে কিছু জাহাজ হামলার আশঙ্কায় নিজেদের অবস্থান শনাক্তকারী ব্যবস্থা বন্ধ রাখায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আরও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে একটি বিশাল তেলবাহী জাহাজ দুটি সমুদ্র মাইনে আঘাত পেয়ে আগুন ধরে যাওয়ার পর থেমে যায়। জাহাজটির নাম বা ক্রুদের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় পরিবর্তন

হরমুজ সংকট শুধু সামরিক উত্তেজনাই বাড়াচ্ছে না, উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তেল পরিবহনের বিকল্প পথ তৈরি করতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

সৌদি আরব লোহিত সাগরের পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত তেল পাইপলাইনের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ এলাকায় নতুন তেল পাইপলাইন ও পণ্যবাহী জাহাজের টার্মিনাল তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

কুয়েতও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে পাইপলাইন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করছে, যাতে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প পথে তেল পরিবহন করা যায়।

ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

সামরিক হামলার পাশাপাশি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের অর্থ সরবরাহে সহায়তা করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

তিনি জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে প্রতি সপ্তাহে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে ইরানি অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক অভিযানের লক্ষ্য হলো ইরানের ওপর চাপ বাড়িয়ে দেশটিকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা।

তবে নতুন করে সামরিক হামলা, পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা এবং তেলের মূল্যবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আবারও বড় ধরনের আঞ্চলিক সংকটের দিকে এগোচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

৭ কোটি বছরের পুরোনো ‘হাঙরের কবরস্থান’ আবিষ্কার মিশরের পশ্চিম মরুভূমিতে

হরমুজ ঘিরে ফের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে উত্তেজনা

০৪:৫৮:১৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

কয়েক সপ্তাহের বিরতির পর আবারও সরাসরি সামরিক হামলা-পাল্টা হামলায় জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। রোববার ইরানের দক্ষিণ উপকূলের লারাক দ্বীপে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব ব্যবস্থা দিয়ে হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্র মাইন পাতা হচ্ছিল। এর জবাবে ইরান জর্ডানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। জর্ডান জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র আটকে দিয়েছে।

এই হামলা গত জুলাইয়ের শেষের পর ইরানের কোনো স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পরিচিত সামরিক অভিযান। একই সময়ে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতিও নিচ্ছে ওয়াশিংটন।

লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে মাইন পেতে থাকা ইরানি বাহিনীকে লক্ষ্য করেই লারাক দ্বীপে সীমিত ও নির্ভুল হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব মাইন আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করছিল।

ইরানের পক্ষ থেকে এই হামলাকে আগ্রাসন হিসেবে দেখা হয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, লারাক দ্বীপে ইরানি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় তারা পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র

ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী জানিয়েছে, লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার জবাবে জর্ডানে থাকা দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।

ইরানের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিং হুসেইন ও আল-আজরাক বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান ব্যবহার করা হয়। ইরানি কর্তৃপক্ষ পরে হামলার ভিডিও প্রকাশ করেছে। তবে ভিডিওতে কখন এবং কোথায় এসব অস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করা হয়নি।

জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতেও ইরানি হামলার অভিযোগ

ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, সোমবার ভোরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল মিনহাদ বিমানঘাঁটিতে চালকবিহীন আকাশযান দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। ওই ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও হেলিকপ্টার অবস্থান করছিল বলে দাবি করেছে ইরান।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশটির জলসীমার ওপর একটি ইরানি চালকবিহীন আকাশযান শনাক্ত ও প্রতিহত করেছে। আবুধাবি এই ঘটনাকে বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং নিজেদের সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকারও সংযুক্ত আরব আমিরাত সংরক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে।

খার্গ দ্বীপ নিয়ে ট্রাম্পের দাবি

লারাক দ্বীপে হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপও ব্যাপক হামলার শিকার হচ্ছে। তিনি দ্বীপটির স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন।

তবে ইরানের পক্ষ থেকে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। জাতীয় ইরানি তেল কোম্পানির প্রধান হামিদ বোভার্দ বলেছেন, খার্গ দ্বীপের পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক রয়েছে এবং তেল উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।

তিনি ট্রাম্পের বক্তব্যকে হাস্যকর বলে মন্তব্য করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখে দ্বীপটির তেলকর্মীরা কার্যক্রম বন্ধ হতে দেননি।

ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপের মাধ্যমে হয়ে থাকে। বর্তমানে সেখানে তেল সংরক্ষণাগার ও জেটি পুনর্নির্মাণ এবং আধুনিকায়নের কাজও চলছে।Iran closes Strait of Hormuz again and downplays talks with US that will  begin in Switzerland | Fortune

হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন সংকট

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে হরমুজ প্রণালিতে। বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হতো।

গত কয়েক মাস ধরে প্রণালিটি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ব্যাপকভাবে কমেছে। বিভিন্ন জাহাজ হামলার আশঙ্কায় এই জলপথ এড়িয়ে চলছে।

ইরান দাবি করছে, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত বলে যে বক্তব্য দিচ্ছে তা মিথ্যা। দেশটির বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর নৌবাহিনী জানিয়েছে, ইরানের অনুমতি ছাড়া জাহাজ চলাচল করতে পারবে না।

অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, প্রণালিতে আগে পাতা সব মাইন সরিয়ে ফেলা অথবা বিস্ফোরিত করা হয়েছে। নতুন করে কোনো জাহাজ বা নৌযান মাইন পেতে গেলে তা ধ্বংস করা হবে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।

তেলের দামে বড় প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। পরে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট তেলের দাম প্রায় ৯০ ডলারে উঠে যায়।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সপ্তাহান্তে দৃশ্যমান পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা কমে প্রতিদিন মাত্র পাঁচটিতে নেমে আসে। তবে কিছু জাহাজ হামলার আশঙ্কায় নিজেদের অবস্থান শনাক্তকারী ব্যবস্থা বন্ধ রাখায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আরও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে একটি বিশাল তেলবাহী জাহাজ দুটি সমুদ্র মাইনে আঘাত পেয়ে আগুন ধরে যাওয়ার পর থেমে যায়। জাহাজটির নাম বা ক্রুদের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় পরিবর্তন

হরমুজ সংকট শুধু সামরিক উত্তেজনাই বাড়াচ্ছে না, উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তেল পরিবহনের বিকল্প পথ তৈরি করতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

সৌদি আরব লোহিত সাগরের পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত তেল পাইপলাইনের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ এলাকায় নতুন তেল পাইপলাইন ও পণ্যবাহী জাহাজের টার্মিনাল তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

কুয়েতও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে পাইপলাইন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করছে, যাতে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প পথে তেল পরিবহন করা যায়।

ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

সামরিক হামলার পাশাপাশি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের অর্থ সরবরাহে সহায়তা করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

তিনি জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে প্রতি সপ্তাহে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে ইরানি অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক অভিযানের লক্ষ্য হলো ইরানের ওপর চাপ বাড়িয়ে দেশটিকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা।

তবে নতুন করে সামরিক হামলা, পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা এবং তেলের মূল্যবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আবারও বড় ধরনের আঞ্চলিক সংকটের দিকে এগোচ্ছে।