চীনের উত্থানকে শুধু অর্থনৈতিক সাফল্য, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা পশ্চিমা শক্তির বিকল্প হিসেবে দেখলে এর গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য ধরা পড়ে না। গত কয়েক দশকে চীন যে পথ অতিক্রম করেছে, তা একই সঙ্গে রাষ্ট্র, আধুনিকতা, সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি ভিন্ন চিন্তার উত্থানও নির্দেশ করে। এই চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, উন্নয়ন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, সভ্যতার বৈচিত্র্য এবং আধুনিকায়নের একাধিক পথের স্বীকৃতি।
চীনের সরকারি বয়ানে দেশটির অভিজ্ঞতাকে অন্যদের জন্য অনুকরণীয় কোনো নির্দিষ্ট মডেল হিসেবে তুলে ধরা হয় না। বরং এর মাধ্যমে বলা হয়, আধুনিক হওয়া মানেই পশ্চিমা রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো গ্রহণ করা নয়। একটি সমাজ তার নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও জাতীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে আধুনিকতার নিজস্ব পথ তৈরি করতে পারে। এই ধারণাটিই চীনের বর্তমান রাজনৈতিক চিন্তাকে বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ।
সার্বভৌমত্ব থেকে জাতীয় পুনর্জাগরণ
চীনের বর্তমান রাষ্ট্রদর্শনের শিকড় খুঁজতে হলে তার দীর্ঘ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার দিকে তাকাতে হয়। ঐতিহ্যগত চীনা রাজনৈতিক কল্পনায় দেশটি নিজেকে শুধু অন্যান্য রাষ্ট্রের একটি রাষ্ট্র হিসেবে দেখত না; বরং বৃহত্তর এক সভ্যতাগত পরিসরের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করত। ‘তিয়ানশিয়া’ ধারণায় রাজনৈতিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক সামঞ্জস্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সার্বভৌম সমতার ধারণার সঙ্গে এক নয়।
পশ্চিমা শক্তির আগ্রাসন, অসম চুক্তি, ভূখণ্ড ও বন্দর নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ বিভাজন চীনের আত্মপরিচয়ে গভীর পরিবর্তন আনে। ‘অপমানের শতাব্দী’ চীনের রাজনৈতিক স্মৃতিতে এমন একটি সময়ের প্রতীক হয়ে ওঠে, যখন দেশটি নিজের ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষমতা হারিয়েছিল। ফলে জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব শুধু রাষ্ট্রীয় নীতি নয়, জাতীয় পুনর্গঠনের মৌলিক লক্ষ্যেও পরিণত হয়।
১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্র পুনর্গঠন, বিদেশি হস্তক্ষেপের অবসান এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা অগ্রাধিকার পায়। সে সময় চীন নিজেকে বিপ্লবী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে এবং মুক্তিকামী আন্দোলন ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে সংহতি গড়ে তোলে।
দেং শিয়াওপিংয়ের সময়ে চীনের কৌশলে বড় পরিবর্তন আসে। বিশ্ব বিপ্লবের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন হয়ে ওঠে প্রধান লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক শান্তি ও উন্মুক্ত পরিবেশকে জাতীয় পুনরুত্থানের প্রয়োজনীয় শর্ত হিসেবে দেখা হয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে একীভূত হওয়া ছিল প্রযুক্তি, জ্ঞান, পুঁজি ও বাজার পাওয়ার একটি উপায়; এর অর্থ পশ্চিমা রাজনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা নয়।
পরবর্তী সময়ে ‘শান্তিপূর্ণ উন্নয়ন’ ও ‘সুরেলা বিশ্ব’-এর ধারণার মাধ্যমে চীন বোঝাতে চেয়েছে যে তার উত্থান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি নয়; বরং তা পারস্পরিক লাভ ও সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সাফল্য যত বাড়তে থাকে, চীনের অবস্থানও বদলাতে থাকে। যে রাষ্ট্র একসময় নিজের উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক পরিবেশ চাইত, সেটিই ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নিয়ম ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে ভূমিকা রাখার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতে শুরু করে।
উন্নয়ন রাষ্ট্রের পরিধি ছাড়িয়ে সভ্যতাগত রাষ্ট্র
শি জিনপিংয়ের সময়ে এই পরিবর্তন আরও সুস্পষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক রূপ পায়। উন্নয়ন আর কেবল দরিদ্রতা কাটিয়ে উন্নত দেশের পর্যায়ে পৌঁছানোর কর্মসূচি থাকে না; এটি হয়ে ওঠে ‘চীনা জাতির মহান পুনর্জাগরণ’-এর অংশ। অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, রাষ্ট্রীয় ঐক্য, সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস এবং স্বাধীন রাজনৈতিক পথ বেছে নেওয়ার ক্ষমতাকে একই প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেখা হয়।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ ‘চীনা আধুনিকায়ন’ ধারণায়। এখানে শিল্পায়ন, বিজ্ঞান, উৎপাদনশীলতা ও জীবনমানের উন্নয়নকে আধুনিকতার অপরিহার্য উপাদান হিসেবে স্বীকার করা হলেও পশ্চিমা রাজনৈতিক মডেলকে তার অবিচ্ছেদ্য শর্ত হিসেবে মানা হয় না।
চীনা ব্যাখ্যায় আধুনিকায়নের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিপুল জনসংখ্যার একটি দেশকে আধুনিক করা, সাধারণ সমৃদ্ধির লক্ষ্য, বস্তুগত উন্নয়নের সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও নৈতিক অগ্রগতির সমন্বয়, প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য এবং শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের পথ। অর্থাৎ আধুনিকতা একটি অভিন্ন মানবিক লক্ষ্য হতে পারে, কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পথ সব সমাজের জন্য এক হতে হবে—এমন ধারণা প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে।
চীনের ‘সভ্যতাগত রাষ্ট্র’ ধারণা এই অবস্থানকে আরও বিস্তৃত করে। ঝাং ওয়েইওয়েইয়ের মতো চিন্তাবিদরা যুক্তি দেন, চীনকে শুধু বিশ শতকে গড়ে ওঠা একটি জাতিরাষ্ট্র কিংবা আধুনিকতার বাইরে থাকা একটি প্রাচীন সভ্যতা—কোনো একটিমাত্র পরিচয়ে বোঝা যায় না। বরং দীর্ঘস্থায়ী সভ্যতাগত ঐতিহ্য ও শক্তিশালী আধুনিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এখানে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে রাজনৈতিক ঐক্য প্রশাসনিক সুবিধার বিষয়মাত্র নয়। বিশাল ও বৈচিত্র্যময় একটি দেশের স্থিতিশীলতা এবং বিচ্ছিন্নতার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর জন্য এটি প্রয়োজনীয়। একই কারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নীতি পরীক্ষার সুযোগ এবং জাতীয় সম্পদকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে সংগঠিত করার সক্ষমতাকে রাষ্ট্রীয় শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হয়।
এখানেই চীনা রাজনৈতিক চিন্তায় বৈধতার প্রশ্নটিও ভিন্নভাবে আসে। নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে শাসনের বৈধতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে না দেখে জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, দক্ষ নেতৃত্ব, নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং ভুল হলে তা সংশোধনের ক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। রাজনৈতিক মেধাতন্ত্রের ধারণায় স্থানীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ, বিভিন্ন পর্যায়ে নীতি পরীক্ষার সুযোগ এবং উচ্চপর্যায়ে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। অবশ্য বাস্তবে এই আদর্শের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
এই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক কাঠামোয় কমিউনিস্ট পার্টি নিজেকে রাষ্ট্র পুনর্গঠন, উন্নয়ন, জাতীয় ঐক্য ও স্বাধীনতা রক্ষার প্রধান শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে। মার্কসবাদকেও চীনা বাস্তবতা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি ব্যাখ্যায় দাবি করা হয়। ফলে চীন একই সঙ্গে নিজেকে সমাজতান্ত্রিক, উন্নয়নমুখী এবং সভ্যতাগত রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরে।
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে বদলে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা
চীনের বর্তমান বিশ্বদর্শনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিতে। বেইজিং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার কথা বলছে না। বরং জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানিয়ে একই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং অ-পশ্চিমা দেশগুলোর বৃহত্তর অংশগ্রহণের দাবি করছে।
২০২৫ সালে শি জিনপিং প্রস্তাবিত ‘গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ’-এর পাঁচটি নীতিতে সার্বভৌম সমতা, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান, বহুপক্ষীয়তা, জনগণের স্বার্থ এবং বাস্তব ফলাফলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে চীনের অবস্থানটি স্পষ্ট হয়: লক্ষ্য শুধু বিদ্যমান ব্যবস্থায় নিজের জায়গা নিশ্চিত করা নয়, বরং সেই ব্যবস্থার নিয়ম ও ধারণাগুলোকে প্রভাবিত করাও।
সার্বভৌমত্ব এখানে কেন্দ্রীয় বিষয়। বিদেশি হস্তক্ষেপ ও বিভাজনের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে চীন রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং প্রতিটি দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক ও উন্নয়ন পথ বেছে নেওয়ার অধিকারকে গুরুত্ব দেয়। এই অবস্থান এশিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য গ্লোবাল সাউথের বহু দেশের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ।
তবে এখানেই একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তের অধিকারকে কীভাবে এমন বৈশ্বিক সহযোগিতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করা যায়, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক সংকট কোনো সীমান্তের মধ্যে আবদ্ধ থাকে না—চীনের ধারণাগুলোকে শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্নেরও উত্তর দিতে হবে।
উন্নয়নকে বৈশ্বিক ন্যায়ের প্রশ্নে পরিণত করা
চীনের আন্তর্জাতিক দর্শনে উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক নীতি নয়; এটি বৈশ্বিক ন্যায়ের প্রশ্নও। চীনের যুক্তি হলো, কাগজে-কলমে রাষ্ট্রগুলোর সমতা থাকলেও অবকাঠামো, অর্থায়ন ও প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার যদি অসম থাকে, তাহলে বাস্তব সমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
এই ভাবনা থেকেই ২০১৩ সালে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ সামনে আসে। এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপকে অবকাঠামো, বাণিজ্য, অর্থায়ন, নীতি সমন্বয় এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে আরও ঘনিষ্ঠ করার লক্ষ্য এতে রয়েছে। ২০২১ সালে ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’-এর মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাস, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন অর্থায়ন, শিল্পায়ন ও ডিজিটাল অর্থনীতির মতো ক্ষেত্রগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে এখানে বাস্তবতার পরীক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো উদ্যোগের মূল্যায়ন শুধু ঘোষিত উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে করা যায় না; প্রকল্পের শর্ত, ঋণের কাঠামো, স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব এবং চীন ও অংশীদার দেশের ক্ষমতার ভারসাম্যও বিবেচনায় নিতে হয়।
‘মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যৎসম্পন্ন সম্প্রদায়’ ধারণা সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক নির্ভরতার মধ্যে একটি সমন্বয় তৈরি করতে চায়। অর্থনীতি, জলবায়ু, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তির মতো সমস্যার সমাধান একক রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়—এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে পরামর্শ, যৌথ অবদান ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে সহযোগিতার কথা বলা হয়।
২০২২ সালে ঘোষিত ‘গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ’-এ নিরাপত্তাকে অভিন্ন, সমন্বিত, সহযোগিতামূলক ও টেকসই করার কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, জাতিসংঘ সনদের প্রতি সম্মান এবং সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ সমাধানের ওপর সেখানে গুরুত্ব রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ এখনো মূলত নীতিগত কাঠামো; এগুলো শক্তির প্রতিযোগিতা কিংবা নিরাপত্তা নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর ভিন্ন ব্যাখ্যা দূর করেনি।
সভ্যতার বৈচিত্র্য ও আধুনিকতার বহুপথ
২০২৩ সালে প্রস্তাবিত ‘গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ’ চীনের ধারণাটিকে আরও একটি মাত্রা দেয়। সভ্যতার বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান, অভিন্ন মানবিক মূল্যবোধের স্বীকৃতি, ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও নবায়নের সমন্বয় এবং সমাজগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর এতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এখানে চীনের অভ্যন্তরীণ যুক্তি আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রয়োগ করা হয়েছে। চীন যদি তার ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিকতার নিজস্ব পথ অনুসরণ করতে পারে, তাহলে অন্য সমাজগুলোরও একই অধিকার থাকা উচিত। ফলে ‘আধুনিকায়ন মানেই পশ্চিমায়ন’—এই ধারণার বিরুদ্ধে একটি বৈশ্বিক বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান তৈরি হয়।
কিন্তু এর সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও অনিবার্য: অভিন্ন মানবিক মূল্যবোধকে কীভাবে একাধিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব? বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি যেন বিচ্ছিন্নতাবাদে পরিণত না হয়, আবার অভিন্নতার নামে কোনো একক সভ্যতার মূল্যবোধ অন্যদের ওপর চাপিয়েও দেওয়া না হয়—ভবিষ্যতের বৈশ্বিক রাজনীতিতে এই ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গ্লোবাল সাউথের জন্য চীনের তাৎপর্য
চীনের অভিজ্ঞতার গুরুত্ব শুধু এই কারণে নয় যে দেশটি অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। এর বড় তাৎপর্য হলো, চীন এমন কিছু পুরোনো প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে, যেগুলো স্বাধীনতার পর থেকেই গ্লোবাল সাউথের বহু রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নের সম্পর্ক কী? আধুনিকায়নে রাষ্ট্রের ভূমিকা কতটা? প্রতিটি সমাজের কি নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থা বেছে নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত? ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখে কি আধুনিক হওয়া সম্ভব?
চীনের অভিজ্ঞতা এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেয় না, কিন্তু বিতর্কের পরিসর অবশ্যই বিস্তৃত করে। এখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে জাতীয় মর্যাদার সঙ্গে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে সমতার সঙ্গে এবং সভ্যতাগত বৈচিত্র্যকে উন্নয়নের নিজস্ব পথ বেছে নেওয়ার অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
মিসরের মতো দেশের জন্য এ আলোচনার আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। মিসরও একটি আধুনিক রাষ্ট্র, যার রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সঙ্গে প্রাচীন সভ্যতার স্মৃতি গভীরভাবে যুক্ত। বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিজ্ঞতা, স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম এবং রাষ্ট্রনির্ভর উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা—এসব ক্ষেত্রেও দুই দেশের অভিজ্ঞতার মধ্যে কিছু মিল রয়েছে। তবে তার অর্থ এই নয় যে মিসরকে চীনের মডেল অনুসরণ করতে হবে।
বরং মিলটি নিহিত সার্বভৌমত্বের গুরুত্ব, উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রের প্রয়োজন এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন না দিয়ে আধুনিকায়নের আকাঙ্ক্ষায়। ২০২৪ সালের মিসর-চীন যৌথ বিবৃতিতেও সার্বভৌমত্ব ও অনধিকার হস্তক্ষেপ না করা, শিল্পের স্থানীয়ীকরণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর, চীনের বিভিন্ন বৈশ্বিক উদ্যোগের প্রতি সমর্থন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করার প্রয়োজনীয়তা একই আলোচনায় এসেছে।
এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ শুধু বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। ব্রিকস, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, জাতিসংঘ এবং আরব ও আফ্রিকার সঙ্গে চীনের সহযোগিতার বিভিন্ন কাঠামোতে মিসরের ভূমিকা আরও সক্রিয় হতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, উন্নয়ন অর্থায়নের কাঠামো সংস্কার, প্রযুক্তি ও জ্ঞানে প্রবেশাধিকার বিস্তৃত করা এবং প্রতিটি দেশের নিজস্ব উন্নয়ন অগ্রাধিকার নির্ধারণের অধিকার জোরদার করার মতো বিষয়ে যৌথ অবস্থান গড়ে তোলা সম্ভব।
চীনের উত্থানের আসল পরীক্ষা
চীনের উত্থান বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে আরও বহুমাত্রিক করে তুলবে, নাকি নতুন ধরনের ক্ষমতার অসমতা তৈরি করবে—এর উত্তর শুধু চীনের ঘোষিত নীতিতে নেই। বাস্তব প্রকল্প, আন্তর্জাতিক আচরণ, অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারে তার ভূমিকার মধ্যেই সেই উত্তর খুঁজতে হবে।
তবে একটি বিষয় ইতোমধ্যে স্পষ্ট। চীনের উত্থান শুধু বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য বদলাচ্ছে না; আধুনিকতা, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক বৈধতা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করছে। বিশ্বব্যবস্থার নিয়ম ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে আলোচনায় অ-পশ্চিমা রাষ্ট্র ও সভ্যতাগুলোর কণ্ঠস্বর ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
গ্লোবাল সাউথের জন্য এর অর্থ চীনের মডেল গ্রহণ করা নয়। বরং নিজেদের ইতিহাস, প্রয়োজন ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে উন্নয়নের পথ নির্ধারণের সক্ষমতা অর্জন করা। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ম নির্ধারণে নিজেদের অংশগ্রহণ বাড়ানো।
চীনের উত্থানের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই চীন পশ্চিমকে প্রতিস্থাপন করবে কি না—এটি নয়। বরং আগামী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কতটা বহুস্বরিক হবে, সেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলো কতটা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পাবে এবং আধুনিকতার সংজ্ঞা নির্ধারণে একাধিক সভ্যতা ও সমাজ কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে—প্রকৃত প্রশ্নটি সেখানেই।
চীনের বর্তমান রাজনৈতিক চিন্তাকে তাই কেবল পররাষ্ট্রনীতির কর্মসূচি হিসেবে পড়া যথেষ্ট নয়। এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা, জাতীয় মর্যাদা, উন্নয়ন, সার্বভৌমত্ব এবং সভ্যতাগত বৈচিত্র্যকে এক সূত্রে বাঁধার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টা। এর সাফল্য নির্ভর করবে সেই ধারণাগুলো ঘোষণার বাইরে কতটা ন্যায়সংগত, অংশগ্রহণমূলক ও কার্যকর আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে তার ওপর।
দীনা শেহাতা 



















