একসময় লন্ডন ছিল এমন এক শহর, যার নাম উচ্চারিত হলেই বিশ্বের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, কূটনীতি ও রাজনীতির কেন্দ্রীয় শক্তির কথা মনে পড়ত। যুদ্ধ, সন্ত্রাস, অর্থনৈতিক সংকট—কোনো কিছুই শহরটির প্রাণশক্তিকে দীর্ঘদিন থামিয়ে রাখতে পারেনি। কিন্তু আজ লন্ডনের সংকটের ধরন বদলে গেছে। এবার কোনো বিদেশি শক্তি শহরটিকে আক্রমণ করছে না; বরং করনীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্বল পরিবহনব্যবস্থা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা ধীরে ধীরে তার সক্ষমতাকে ক্ষয় করছে।
লন্ডনের কঠিন অতীত এবং বর্তমান
১৯৭০-এর দশকে লন্ডনে পড়াশোনা করার সময় আমি শহরটির আরেক কঠিন সময় দেখেছি। আইআরএ-এর বোমা হামলার আশঙ্কা ছিল নিয়মিত। বোমা হামলার হুমকির কারণে লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ডে বিঘ্ন ঘটত, তবু প্রতিদিন হাঁটতে হাঁটতে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে যেতাম। এর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বোমাবর্ষণও এই শহরকে বিপর্যস্ত করেছিল।
কিন্তু প্রতিটি সংকটের পর লন্ডন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কারণ তখন বিপদটি ছিল দৃশ্যমান, আর তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তাও ছিল স্পষ্ট।
আজকের সমস্যা অনেক বেশি জটিল। শহরটি এমন এক সংকটে আটকে আছে, যার কোনো একক শত্রু নেই। বরং একের পর এক নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা মিলেই পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলছে।
পুঁজি ধরে রাখতে ব্যর্থতার মূল্য
লন্ডনের ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অভিযোগ নয়। শহরের করব্যবস্থা, যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়া, উচ্চ ভ্যাট এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ী নেতাদের বিকল্প গন্তব্য খুঁজতে উৎসাহিত করছে।
মোনাকো, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং ইতালির মতো জায়গাগুলো এখন অনেক আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও সম্পদশালীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। কোনো শহরের জন্য এর চেয়ে বড় সতর্কবার্তা খুব কমই হতে পারে। কারণ অর্থ ও মেধা একবার অন্যত্র চলে গেলে শুধু করহার কমিয়ে তাদের ফিরিয়ে আনা সহজ নয়।
সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি উত্তরাধিকার কর। দীর্ঘ কর্মজীবনে নিয়মিত কর পরিশোধ করা একজন ব্রিটিশ নাগরিকের মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীদের সম্পদের ওপর ৪০ শতাংশ পর্যন্ত করের মুখোমুখি হতে হয়। এর ফলে অনেক পরিবারকে কর পরিশোধের জন্য সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয়।
আরও অস্বস্তিকর প্রশ্ন ওঠে যখন যুক্তরাজ্যে কোনো আয় নেই, এমন ব্যক্তির লন্ডনের বন্ডেড ওয়্যারহাউসে রাখা সম্পদও উত্তরাধিকার করের আওতায় পড়তে পারে। এমন নীতির অর্থনৈতিক যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
পর্যটনেও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত
লন্ডনের মতো পর্যটননির্ভর শহরের জন্য বিদেশি পর্যটকদের কেনাকাটায় ভ্যাট ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই সুবিধা বাতিল হওয়ার ফলে বিদেশি ক্রেতাদের একটি অংশ এখন প্যারিস বা রোমের মতো ইউরোপীয় শহরে কেনাকাটা করতে বেশি আগ্রহী হচ্ছে।
এর প্রভাব লন্ডনের প্রধান বাণিজ্যিক সড়কগুলোতে চোখে পড়ছে। রিজেন্ট স্ট্রিট, অক্সফোর্ড স্ট্রিট কিংবা জার্মিন স্ট্রিটের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একের পর এক দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ‘ভাড়ার জন্য’ সাইন ঝুলতে থাকা কেবল খুচরা বাজারের সমস্যা নয়। এটি শহরের অর্থনৈতিক আকর্ষণ কমে যাওয়ারও একটি দৃশ্যমান লক্ষণ।
যে শহর পর্যটকদের ব্যয়কে নিজের অর্থনীতিতে ধরে রাখতে পারছে না, সে শহর ধীরে ধীরে নিজের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল করছে।
‘কোনিং’ যখন প্রশাসনের প্রতীক
লন্ডনের অব্যবস্থাপনার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক সম্ভবত রাস্তার সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা ট্রাফিক কোন।
রাস্তা মেরামত বা অবকাঠামোগত কাজ প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু এমন কাজ যদি নির্ধারিত সময়ের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ হয়, রাস্তা সংকুচিত করে যানজট তৈরি করে এবং কোথাও কাজ না চললেও দিনের পর দিন কোন রেখে দেওয়া হয়, তখন সেটি কেবল নির্মাণকাজের সমস্যা থাকে না। এটি প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
হিথরো, গ্যাটউইক, লুটন কিংবা স্ট্যানস্টেড বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে যানজটের কারণে যাত্রীদের ফ্লাইট মিস করার ঘটনা এই সমস্যার বাস্তব মূল্য দেখায়। একটি বৈশ্বিক শহরের পরিবহনব্যবস্থা মানুষের সময়কে এতটা অনিশ্চিত করে তুললে তার অর্থনৈতিক ক্ষতি শুধু রাস্তার ওপর থেমে থাকে না।
পরিবহনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাও সংকটে
লন্ডনের রেলব্যবস্থার দিকে তাকালেও একই প্রশ্ন দেখা যায়। জাপানের মতো দেশে কয়েক মিনিটের ট্রেন বিলম্বও যেখানে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়, সেখানে লন্ডনের যাত্রীরা অনেক সময় ২০ থেকে ৩০ মিনিট অতিরিক্ত সময় হাতে রাখেন, কারণ নির্ধারিত সময়ে ট্রেন পৌঁছাবে কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত থাকা কঠিন।
‘সিগন্যাল সমস্যার’ মতো ব্যাখ্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে সেটি আর যাত্রীদের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা থাকে না; বরং ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকেত হয়ে দাঁড়ায়।
একই সমস্যা বিমান যোগাযোগেও দেখা যাচ্ছে। হিথরো বা গ্যাটউইক থেকে যাত্রা করার ক্ষেত্রে বিলম্বের আশঙ্কা এতটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ ফ্লাইট থাকলে একই দিনে লন্ডনের মাধ্যমে ভ্রমণ না করার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। একটি আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহনকেন্দ্রের জন্য এর চেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় আর কী হতে পারে?

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষয়
লন্ডনের বর্তমান সমস্যাকে শুধু রাস্তা, ট্রেন কিংবা কর দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এর পেছনে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার সংকটও রয়েছে।
মার্গারেট থ্যাচার, জন মেজর ও টনি ব্লেয়ারের সময়ে যুক্তরাজ্যের সরকারগুলো দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিল। তাদের প্রত্যেকের সিদ্ধান্তের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল।
পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতে নেতৃত্বের দ্রুত পরিবর্তন সেই ধারাবাহিকতাকে দুর্বল করেছে। নীতির পরিবর্তন, ব্রেক্সিট-পরবর্তী অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বারবার দিক বদল ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীল পরিবেশকে আরও কঠিন করেছে।
লন্ডনের সমস্যা তাই কেবল অর্থনীতির সমস্যা নয়। এটি আস্থার সংকট।
শহরটির শক্তি এখনো শেষ হয়ে যায়নি
তবু লন্ডনকে মৃত শহর বলা ভুল হবে। এই শহরের হাতে এখনো রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিপুল মেধাবী জনশক্তি, ঐতিহাসিক মর্যাদা, বিশ্ববিদ্যালয়, সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের শক্তিশালী ভিত্তি।
সমস্যা হলো, এসব সম্পদকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন যে দৃষ্টিভঙ্গি, দক্ষতা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা—সেখানেই ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
লন্ডন একসময় বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার অভ্যাস তৈরি করেছিল। এখন তার সামনে প্রশ্ন হলো, সে কি আবার সেই সক্ষমতা ফিরে পেতে চায়?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লন্ডনের শত্রু ছিল স্পষ্ট। আইআরএ-এর সময়ও বিপদকে চিহ্নিত করা যেত। মানুষ জানত কীসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে এবং কেন লড়াই করতে হবে।
আজকের বিপদ অনেক বেশি নীরব। এখানে কোনো সাইরেন বাজে না। কোনো যুদ্ধবিমান আকাশে দেখা যায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে বিনিয়োগ সরে যাচ্ছে, দোকান বন্ধ হচ্ছে, পর্যটকরা অন্য শহরে কেনাকাটা করছে, যাত্রীরা পরিবহনব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাচ্ছে এবং ব্যবসায়ীরা বিকল্প কেন্দ্র খুঁজছে।
লন্ডনের পুনরুত্থানের জন্য তাই নতুন কোনো শত্রুর প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন নিজের দুর্বলতাগুলোকে স্বীকার করার সাহস।
একটি শহরকে বাইরের আক্রমণ যতটা ক্ষতি করতে পারে, ভুল নীতি ও দীর্ঘস্থায়ী অদক্ষতাও ততটাই ক্ষয় করতে পারে। লন্ডন হিটলার ও আইআরএর সময় টিকে ছিল কারণ সংকটের মুখে শহরটি নিজেকে সংগঠিত করতে পেরেছিল।
আজ তাকে একই দৃঢ়তা দেখাতে হবে—করনীতিতে, পরিবহনে, ব্যবসাবান্ধব নীতিতে, প্রশাসনে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বে।
লন্ডন অতীতে পতনের মুখ দেখেছে। পার্থক্য হলো, তখন সবাই জানত শত্রু কোথায়।
আজকের সবচেয়ে বড় বিপদ সম্ভবত সেটিই—শহরটি দুর্বল হয়ে পড়ছে, অথচ দায় কার এবং পরিবর্তন কোথা থেকে শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ঐকমত্য নেই।
এম. শফিক গ্যাবর 



















