মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক হামলা শুরু হওয়ায় আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং ইরানের পাল্টা হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে হামলার প্রভাব
সোমবার সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেড়ে ৯১ দশমিক ২৫ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৬ দশমিক ৩৬ ডলারে দাঁড়ায়।
রোববার হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত ইরানের লারাক দ্বীপে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। জুলাইয়ের শেষ দিকের পর ইরানের ভূখণ্ডে এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম জানা হামলা।
এরপর ইরানের বিপ্লবী গার্ডের বরাত দিয়ে দেশটির গণমাধ্যম জানায়, ইরান জর্ডানে থাকা দুটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।
সরবরাহ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তেলের দামে।
বিশেষজ্ঞরা এখন পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় কি না, নাকি দ্রুত উত্তেজনা কমে আসে—সেদিকেই নজর রাখছেন। কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হতো।
সংঘাতের কারণে ওই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৃশ্যমান পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা কমে প্রতিদিন মাত্র পাঁচটিতে নেমে আসে। হামলার আশঙ্কায় জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে।
ট্যাংকারে হামলার খবর
ব্রিটিশ সামুদ্রিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানিয়েছে, শনিবার হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের সময় একটি তেলবাহী জাহাজে নিক্ষিপ্ত একটি বস্তু আঘাত হানে।
এ ধরনের ঘটনায় ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
খার্গ দ্বীপ নিয়ে বিতর্ক
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। তবে দ্বীপটি হামলার শিকার হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্পের ওই পোস্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি ভিডিওও ছিল। ইরান খার্গ দ্বীপে হামলার ঘটনা অস্বীকার করেছে এবং জানিয়েছে, সেখানে তেলসংক্রান্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
আলোচনায় অচলাবস্থা
সংঘাত বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগ এখনো কার্যকর কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। মধ্যস্থতাকারীরা হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিকভাবে চালু করার চেষ্টা করলেও আলোচনায় অগ্রগতি খুবই সীমিত।
এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে প্রতি সপ্তাহেই নতুন করে পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে সোমবার তেলের দাম বাড়লেও আগস্ট মাসের হিসাবে ব্রেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম এখনো সামান্য কমার পথেই রয়েছে। এর আগে গত সপ্তাহে উভয় ধরনের তেলের দাম ৪ শতাংশের বেশি কমেছিল, যা তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রথম সাপ্তাহিক পতন।
যুক্তরাষ্ট্রের মজুতেও নজর
এদিকে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সম্প্রতি হওয়া একটি চুক্তির মাধ্যমে পাওয়া তেল যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত পুনরায় পূরণে ব্যবহার করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত বর্তমানে প্রায় ৪৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মজুত এবং বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতিও তেলের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও তেল সরবরাহ কতটা ব্যাহত হয়, তার ওপরই আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















