জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর সরকার ও সড়ক পরিবহন মালিকপক্ষ কিলোমিটারপ্রতি বাসভাড়া ১৭ পয়সা বাড়াতে একমত হয়েছে। তবে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। এর মধ্যেই রাজধানীর গাবতলীসহ বিভিন্ন টার্মিনালে দূরপাল্লার যাত্রীদের কাছ থেকে রুটভেদে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপের ভাড়াও বাড়তে শুরু করেছে।
জ্বালানির দাম বাড়ার পরই ভাড়ার চাপ
গত রোববার সরকার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায়। এতে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা হয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল থেকে গাবতলী বাস টার্মিনালে দেখা যায়, এসি ও নন-এসি উভয় ধরনের দূরপাল্লার বাসেই আগের তুলনায় বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। কুষ্টিয়ার যাত্রী মো. রমজান জানান, এক দিন আগে ঢাকায় আসতে ৫০০ টাকা ভাড়া দিলেও পরদিন একই যাত্রায় তাকে আরও ১০০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে।
বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান জি আর শহীদ বলেন, ভাড়া সমন্বয় না হলে পরিবহন মালিকদের লোকসান বাড়তে পারে। শিগগির সংশোধিত ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করা হবে বলেও জানান তিনি।
কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের কমিটি দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং নগর বাসে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। পরে মঙ্গলবার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সঙ্গে বৈঠকে সরকার ও পরিবহন মালিকপক্ষ কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়াতে একমত হয়।
তবে প্রজ্ঞাপন জারির আগেই বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়টি যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পরিবহন মালিকদের হিসাবে, ৪৫ আসনের একটি দূরপাল্লার বাস এক লিটার ডিজেলে প্রায় ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার চলতে পারে। ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থাকলে প্রতি কিলোমিটারে জ্বালানি ব্যয় ছিল প্রায় ৩২ দশমিক ৮৬ টাকা। দাম ১৩৫ টাকা হওয়ায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৫৭ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ৫ টাকা ৭১ পয়সা। ১০০ কিলোমিটারে এই বাড়তি ব্যয় প্রায় ৫৭১ টাকা।
পঞ্চগড় রুটে বাড়তি ব্যয় প্রায় ৫ হাজার টাকা
সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গাবতলী থেকে পঞ্চগড়ের দূরত্ব প্রায় ৪৩৮ কিলোমিটার। যাওয়া-আসার একটি ট্রিপে ২৫০ লিটারের বেশি ডিজেল প্রয়োজন হতে পারে। ২৫০ লিটার হিসাব ধরলেও প্রতি রাউন্ড ট্রিপে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় প্রায় ৫ হাজার টাকা। গড়ে ৫০ জন যাত্রী বহন করলে এই ব্যয় যাত্রীপ্রতি প্রায় ১০০ টাকার সমান।
বাসমালিক মো. কামরুল ইসলাম বাবুল বলেন, প্রতি ১০০ কিলোমিটারে জ্বালানি ব্যয় ৫৭১ টাকা বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া সমন্বয় ছাড়া পরিবহন মালিকদের সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই।
পণ্য পরিবহনেও বাড়ছে খরচ
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে পণ্য পরিবহনেও। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে কুষ্টিয়া থেকে এক ট্রাক পণ্য আনতে ভাড়া ৩২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪০ হাজার টাকা হয়েছে বলে জানান গুদাম ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম।
কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় ২৬৫ বস্তা চাল পরিবহনের ভাড়া ২০ হাজার থেকে বেড়ে ২২ হাজার টাকা হয়েছে। বেনাপোল থেকে কাঞ্চপুরে ১০ দশমিক ৫ টন পোশাক বহনকারী কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া ১৮-১৯ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২২ হাজার টাকা হয়েছে। বিভিন্ন রুটে ট্রাকভাড়া ২ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
ট্রাকচালক মোহাম্মদ নাজমুস জামান জানান, সাতক্ষীরা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়া-আসার এক ট্রিপে প্রায় ২৩০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। নতুন দামে এতে তার জ্বালানি ব্যয় প্রায় ৪ হাজার ৬০০ টাকা বাড়বে।
সেচ, শিল্প ও নিত্যপণ্যে প্রভাবের শঙ্কা
ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু পরিবহনেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের সংখ্যা ১৩ থেকে ১৫ লাখ। মোট ডিজেল চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ কৃষি ও সেচ খাতে ব্যবহৃত হয়। ফলে সেচ ব্যয় বাড়লে কৃষি উৎপাদন খরচও বাড়তে পারে।
শিল্পকারখানায় জেনারেটর ও ডিজেলচালিত যন্ত্রপাতির পরিচালন ব্যয়ও বাড়বে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাড়তি পরিবহন ব্যয় দীর্ঘদিন নিজেদের বহন করা সম্ভব নয়। ফলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত নিত্যপণ্যের বাজারেও পড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে পরিবহন, খাদ্য ও রান্নার ব্যয় বাড়লে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়বে। শহরের নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ, ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভরশীল কৃষক এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা এই পরিস্থিতিতে বেশি চাপে পড়তে পারেন।
জ্বালানি ব্যয় কমানোর বিকল্প নিয়েও আলোচনা
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে এক লিটার ডিজেল আমদানি করতে সরকারের প্রায় ২০৫ টাকা খরচ হচ্ছে। সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের পরও প্রতি লিটারে সরকারের প্রায় ৭০ টাকা লোকসান রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে সোমবার অপরিশোধিত তেলের দাম ২ দশমিক ১১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ ডলারে নেমেছে; ১৫ সেপ্টেম্বর তা ছিল ১০৯ ডলার।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ানোকে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়। সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থায় অপচয় এবং সিস্টেম লস কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা বা ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরপর পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছিল।
সিপিডির গবেষক গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারের সিদ্ধান্তের পেছনে চাপ রয়েছে। তবে ভাড়া বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ন্যায্য সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। তেলের দাম বাড়ার পর অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রবণতা বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বেন।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বাস ও পণ্য পরিবহনে বাড়তি ব্যয়ের চাপ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। প্রজ্ঞাপন জারির আগেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ সেই চাপকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাসভাড়া, ট্রাকভাড়া ও পণ্য পরিবহনের খরচ ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। প্রজ্ঞাপনের আগেই দূরপাল্লার যাত্রীদের কাছ থেকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা অতিরিক্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















