যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা যখন গাড়ি, ব্যাটারি, প্রযুক্তিপণ্যসহ কৌশলগত শিল্পে তীব্র প্রতিযোগিতার রূপ নিয়েছে, তখন তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত ভিন্ন এক চিত্র দেখাচ্ছে। চীনে তৈরি চুল, পরচুলা, চুলের বাড়তি অংশ এবং কৃত্রিম নখের মতো সৌন্দর্যপণ্যের যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি দ্রুত বাড়ছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, চীনের উৎপাদন সক্ষমতা শুধু উচ্চপ্রযুক্তি বা বড় শিল্পপণ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কম দামের ভোক্তা পণ্যেও দেশটির সরবরাহব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী।
চীনের শুল্ক ও বাণিজ্যসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের চুলজাত পণ্য রপ্তানি করেছে। এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় এই রপ্তানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৪ শতাংশ। এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি বছরের মোট রপ্তানি ২০২৫ সালের ২৩০ কোটি ডলারের বার্ষিক রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
চীনের অন্যান্য প্রচলিত রপ্তানি পণ্য—যেমন কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, স্কুটার ও প্লাস্টিকপণ্য—যেভাবে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে, চুল ও সৌন্দর্যপণ্যও এখন দ্রুত বাড়তে থাকা রপ্তানি খাতে পরিণত হয়েছে।
কৃত্রিম নখের জন্য আলাদা শুল্ক বা কাস্টমস তথ্য পাওয়া যায় না, কারণ এগুলো সাধারণত প্লাস্টিকপণ্য হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কারখানার মালিকদের বক্তব্য বলছে, এই বাজারেও ব্যবসা দ্রুত বাড়ছে।
চীনের পূর্বাঞ্চলীয় জিয়াংসু প্রদেশের লিয়ানইউনগাংয়ের দোংহাই কাউন্টির একটি কৃত্রিম নখ কারখানার মালিক ঝাং দা জানান, চলতি বছরে তার মোট আয়ের ৭০ শতাংশ এসেছে রপ্তানি থেকে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে এই হার ছিল মাত্র ২০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার তার রপ্তানির বড় অংশ দখল করে আছে।
চীনের ‘উৎপাদনভিত্তিক শক্তি’ আবারও স্পষ্ট
চীনের এই সৌন্দর্যপণ্য রপ্তানি শুধু একটি নির্দিষ্ট ব্যবসার সাফল্য নয়; এটি দেশটির বৃহত্তর শিল্পব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের চীনবিষয়ক পরিচালক ড্যান ওয়াংয়ের মতে, উৎপাদনের বিপুল পরিসর এবং পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য বাড়ানোর সক্ষমতার কারণে চীন বিশ্ববাজারে একটি বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছে। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চীন এখন কেবল একটি বা দুটি দেশের নির্দিষ্ট শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে না; বরং বিশ্বের প্রায় সব ধরনের শিল্পপণ্যের বাজারেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
এই অবস্থান দ্রুত বদলে যাবে না বলেও মনে করেন তিনি। কারণ চীনের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো বিশাল উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে কাঁচামাল, শ্রম, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও রপ্তানির মতো বিভিন্ন ধাপের সরবরাহব্যবস্থাকে একই শিল্পভূমির মধ্যে যুক্ত করতে পারা।
একটি শহরেই লাখো মানুষ চুলের ব্যবসায়
চীনের চুলপণ্য শিল্পের শক্তির একটি বড় উদাহরণ শুচাং শহর। শহরটি চীনের ‘পরচুলার রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত। সরকারি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৪ লাখ জনসংখ্যার এই শহরে প্রায় ৩ লাখ মানুষ চুলশিল্পের সঙ্গে যুক্ত।
এখানে শুধু বড় কারখানা নয়, ছোট ব্যবসা, কাঁচামাল সরবরাহকারী, চুল প্রক্রিয়াজাতকারী, শ্রমিক, প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠান এবং রপ্তানিকারকদের নিয়ে একটি বিশাল শিল্পব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
চীনের এই ঘনবসতিপূর্ণ উৎপাদনকেন্দ্রগুলো বিদেশি প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কারণ একই ধরনের শিল্পব্যবস্থা অন্য দেশে তৈরি করতে দীর্ঘ সময়, বিপুল বিনিয়োগ এবং দক্ষ শ্রমশক্তি প্রয়োজন।
শুচাংয়ের এক রপ্তানিকারক জো উ জানান, বড় পরিসরে উৎপাদনের কারণে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় কম খরচে পণ্য তৈরি করতে পারে। পরচুলার জন্য প্রয়োজনীয় চুলের কিছু অংশ চীনের গ্রামীণ অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয়। আবার শ্রমঘন কিছু কাজ, যেমন চুলের প্রতিটি অংশ লেসের সঙ্গে যুক্ত করা, উত্তর কোরিয়ায় করানো হয়।
এর ফলে চীন শুধু নিজের দেশের শ্রমশক্তি ব্যবহার করেই নয়, আঞ্চলিক পর্যায়ের একটি বিস্তৃত উৎপাদন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেও বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বদলে দিয়েছে সৌন্দর্যপণ্যের বাজার
চীনের এই রপ্তানি বৃদ্ধির পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। টিকটক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে জনপ্রিয় তারকা, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কনটেন্ট নির্মাতারা নিয়মিত চুলের ধরন, পরচুলা ও নখের নকশা পরিবর্তন করছেন। এতে একই ক্রেতার কাছেও নতুন নতুন পণ্যের চাহিদা তৈরি হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের টিকটক বিক্রির তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ফাস্ট মসের হিসাবে, আগস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্যাশন-সামগ্রী বিক্রির শীর্ষ ২০ পণ্যের মধ্যে ১৭টিই ছিল চুলজাত পণ্য।
শীর্ষে ছিল আঠা ছাড়াই ব্যবহার করা যায় এমন, আগে থেকেই ব্লিচ করা সোজা চুলের পরচুলা। তালিকার অন্যান্য পণ্যের মধ্যে ছিল বাইবেলের বাণী লেখা পুরুষদের ব্রেসলেট, হাতের আকারের সেলাইয়ের যন্ত্র এবং সানগ্লাস।
অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু পণ্যের প্রচার করছে না; এটি সরাসরি চীনের কারখানা ও যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তার মধ্যে একটি নতুন বাণিজ্যিক সংযোগও তৈরি করছে।
ব্যক্তিগত পছন্দকে পণ্যে পরিণত করছে চীনা ব্যবসা
শুচাংয়ের আরেক চুলপণ্য বিক্রেতা তিয়ান জানান, গত বছরের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে তার বিক্রি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে। তার মতে, মার্কিন ক্রেতারা পণ্যে ব্যক্তিগত পছন্দ ও পরিবর্তনের সুযোগকে বিশেষ গুরুত্ব দেন।
এই চাহিদা চীনা ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি মুনাফার সুযোগ তৈরি করছে। কারণ একজন ক্রেতার নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি করা গেলে কম পরিমাণ পণ্য বিক্রি করেও তুলনামূলক বেশি দাম নেওয়া সম্ভব।
দোংহাইয়ের একটি নখের দোকানের এক টিকটক সরাসরি সম্প্রচারকারীও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের কাছ থেকে তার মাসে প্রায় ১০ হাজার ডলারের বিক্রি হচ্ছে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি এই তথ্য দেন।
শুল্ক কি চীনের এই বাজারকে থামাতে পারবে?
যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য বিরোধের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, নতুন শুল্ক বা বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ এই ব্যবসায় কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্ট চীনা রপ্তানিকারকেরা এখনো খুব একটা উদ্বিগ্ন নন। তাদের যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রে চাহিদা শক্তিশালী এবং চীনের বাইরে দ্রুত একই মাত্রার উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা সহজ নয়।
রপ্তানিকারক জো উর ভাষায়, শুল্কের প্রভাব রয়েছে, কিন্তু সেটিই ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক নয়।
এর পেছনে রয়েছে চীনের দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা সরবরাহব্যবস্থা। একটি পরচুলা বা কৃত্রিম নখ দেখতে ছোট ও সাধারণ পণ্য হলেও এর পেছনে রয়েছে কাঁচামাল সংগ্রহ, শ্রম, নকশা, উৎপাদন, প্যাকেজিং, পরিবহন এবং অনলাইন বিক্রির সমন্বিত ব্যবস্থা। এই পুরো কাঠামো একসঙ্গে কাজ করায় শুধু শুল্ক বাড়িয়ে চীনের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পুরোপুরি দূর করা কঠিন হতে পারে।
বড় শিল্প থেকে ছোট পণ্য—সবখানেই চীনের উপস্থিতি
চীনের সৌন্দর্যপণ্য রপ্তানির এই উত্থান একটি বড় অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও সামনে আনছে। বিশ্বের অনেক দেশ যেখানে নির্দিষ্ট কিছু শিল্পে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে, সেখানে চীন একই সময়ে গাড়ি, ব্যাটারি ও প্রযুক্তিপণ্যের মতো বড় শিল্প থেকে শুরু করে পরচুলা, নখ ও অন্যান্য ফ্যাশন-সামগ্রী পর্যন্ত বিস্তৃত বাজারে নিজের অবস্থান শক্ত করছে।
এই প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চীন থেকে আমদানি কমাতে হলে শুধু বড় শিল্পপণ্যের বিকল্প তৈরি করলেই হবে না; বিপুলসংখ্যক ছোট ও মাঝারি ভোক্তা পণ্যের জন্যও বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
আর এখানেই চীনের বড় সুবিধা—বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা বিশাল উৎপাদন অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমশক্তি, সরবরাহকারীদের ঘন নেটওয়ার্ক এবং বিপুল উৎপাদনের ফলে কম খরচে পণ্য তৈরির সক্ষমতা।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য বিরোধ যতই তীব্র হোক, চীনের রপ্তানি শক্তির পুরো চিত্র বুঝতে শুধু গাড়ি, ব্যাটারি বা প্রযুক্তিপণ্যের দিকে তাকালে হবে না। পরচুলা, কৃত্রিম নখের মতো ছোট সৌন্দর্যপণ্যও দেখাচ্ছে—বিশ্ববাজারে চীনের শিল্পভিত্তিক প্রভাব কতটা গভীর এবং কত বিস্তৃত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















