ইংলিশ চ্যানেলে ছোট নৌকায় করে ফ্রান্স থেকে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পথে ৩৩ ঘণ্টার বেশি সময় সাগরে কাটানোর পর ৫১ জন অভিবাসী যুক্তরাজ্যের ডোভারে পৌঁছেছেন। বুধবার স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাদের ডোভারে নামানো হয়।
নৌকাটি সোমবার সকালে ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। ফরাসি কোস্টগার্ড নৌকাটিকে অনুসরণ করছিল। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নৌকাটিতে থাকা অভিবাসীরা ‘ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে’ ছিলেন। তাদের উদ্ধারে সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তারা তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং যুক্তরাজ্যে পৌঁছাতে ‘সব ধরনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত’ ছিলেন।
পরে ব্রিটিশ উদ্ধারকারী নৌযান পাঠিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়। এরপর অভিবাসীদের সীমান্ত নিরাপত্তা কমান্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ফরাসি কোস্টগার্ড জানিয়েছে, ছোট নৌকাটিতে থাকা ব্যক্তিরা ৩৩ ঘণ্টারও বেশি সময় সমুদ্রে ছিলেন।
ব্রিটিশ রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউশন (আরএনএলআই) জানিয়েছে, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতির আশঙ্কায় কোস্টগার্ড তাদের সহায়তার জন্য আরএনএলআইকে দায়িত্ব দেয়।
ডোভারে পৌঁছানোর পর অভিবাসীদের কমলা রঙের লাইফ জ্যাকেট পরা অবস্থায় এবং নিজেদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র হাতে নিয়ে নৌকা থেকে নামতে দেখা যায়।

গোসপোর্টে বিক্ষোভ
প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, অভিবাসীদের দক্ষিণ ইংল্যান্ডের হ্যাম্পশায়ারের গোসপোর্ট এলাকায় নামানো হতে পারে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গোসপোর্টের মেরিনার কাছে শত শত অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভকারী জড়ো হন।
বিক্ষোভকারীদের ঘিরে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তাদের কয়েকজনকে কালো পোশাকে এবং মুখ ঢাকা অবস্থায় দেখা যায়। বিক্ষোভের সামনের সারিতে থাকা কয়েকজন ‘তাদের ফেরত পাঠাও’ স্লোগান দেন।
পরে হ্যাম্পশায়ার ও আইল অব ওয়াইট কনস্ট্যাবুলারি জানায়, বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ আচরণ করলে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা তখনও হেফাজতে ছিলেন এবং ঘটনাগুলোর বিষয়ে তদন্ত চলছিল।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ডেম ক্যারোলিন ডিনেনেজ এর আগে জানিয়েছিলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছিলেন যে অভিবাসীদের পোর্টসমাউথ এলাকায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। সেই খবরের ভিত্তিতেই গোসপোর্টে বিক্ষোভ শুরু হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নজরদারিতে ছিল ফরাসি কোস্টগার্ড
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নৌকাটি ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকূলের ভিয়েরভিল-সুর-মের গ্রামের কাছাকাছি এলাকা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। ইংলিশ চ্যানেল পারাপারের ছোট নৌকাগুলো সাধারণত এত পশ্চিম দিক থেকে যাত্রা করে না। ফলে এই যাত্রাপথটি তুলনামূলকভাবে অস্বাভাবিক।

সোমবার চ্যানেলে নৌকাটির যাত্রার দৃশ্য ইউটিউব লাইভস্ট্রিমে প্রচার করেন ড্যানিয়েল থমাস, যিনি ‘ড্যানি টমো’ নামে পরিচিত। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসীদের যুক্তরাজ্যে প্রবেশের বিরোধিতা করে আসছেন এবং পোর্টসমাউথ ও ডোভারে সাম্প্রতিক কয়েকটি বিক্ষোভ আয়োজন করেছেন।
এর আগে চলতি মাসেই আরও পশ্চিমে, শেরবুর্গের কাছাকাছি এলাকা থেকে যাত্রা করা একটি ছোট নৌকা হ্যাম্পশায়ারে পৌঁছেছিল। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করেও পোর্টসমাউথে বিক্ষোভ হয়েছিল।
সীমান্তে চলমান ছোট নৌকার সংকট
যুক্তরাজ্য সরকারের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, সীমান্ত নিরাপত্তা কমান্ড ‘চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করে সীমান্ত সুরক্ষায়’ এবং ছোট নৌকায় করে আসা প্রত্যেক ব্যক্তিকে আটক, যাচাই ও প্রক্রিয়াজাত করার কাজ অব্যাহত রাখবে।
যুক্তরাজ্য সরকারের হিসাব অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত চলতি বছরে প্রায় ১৭ হাজার ৪৮০ জন অভিবাসী ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন। একই সময়ের গত বছরের তুলনায় এই সংখ্যা ৪৬ শতাংশ কম।
তবে ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আশ্রয়প্রার্থীদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। নতুন এই ঘটনাতেও একদিকে সমুদ্রপথে যাত্রাকারীদের নিরাপত্তা, অন্যদিকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় এলাকায় বিক্ষোভ—দুই বিষয়ই সামনে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















