মালয়েশিয়া প্রায় পাঁচ হাজার মিয়ানমার নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এদের বেশির ভাগই রোহিঙ্গা। প্রথম ধাপে ১ হাজার ৪৭৬ জনকে ২৯ সেপ্টেম্বর পাঠানোর কথা জানিয়েছে কুয়ালালামপুর। এরা সবাই দেশটির অভিবাসন আটক কেন্দ্রে বন্দি আছেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক অধিকার সংগঠন বার্মা ক্যাম্পেইন ইউকে এই রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডিভিবি এ খবর দিয়েছে। সংগঠনটি একে বলছে “শরণার্থী পিংপং”। তাদের মতে, এতে হাজারো মানুষকে সরাসরি সেই সামরিক সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, যারা রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যামূলক নিপীড়নের জন্য দায়ী। সংগঠনটি বিশ্বজুড়ে সমর্থকদের মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষকে সরাসরি বার্তা পাঠানোর আহ্বানও জানিয়েছে।
বার্মা ক্যাম্পেইন ইউকে বলছে, মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাব ও অনলাইন ঘৃণাভাষণ দ্রুত বাড়ছে। সরকার জনমতের সেই বিদ্বেষ ঠেকানোর বদলে তাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অধিকারকর্মীরা। বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোও বৈষম্যমূলক প্রচার চলতে দিচ্ছে বলে তাঁদের অভিযোগ। তাঁদের দাবি, ফেরত গেলে রোহিঙ্গারা জোরপূর্বক সেনাভর্তি, নির্বিচার আটক, হত্যা ও যৌন সহিংসতার মুখে পড়বেন। মিয়ানমারে তাঁদের চলাফেরার স্বাধীনতা নেই, নাগরিকত্বও নেই। আন্তর্জাতিক আইনের “নন-রিফাউলমেন্ট” নীতি অনুযায়ী বিপদের দেশে কাউকে জোর করে ফেরত পাঠানো যায় না। সংগঠনটির মতে, এই রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা সেই নীতির সরাসরি লঙ্ঘন।
মালয়েশিয়ার সরকার বলছে, নিরাপত্তা ও আর্থিক চাপ কমাতেই এই উদ্যোগ। প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম মিয়ানমারের সেনাশাসক মিন অং হ্লাইংকে সরকারি সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছেন। বিনিময়ে নেপিদো শরণার্থীদের ফেরত নেবে, এমনটাই প্রত্যাশা। তবে মিয়ানমারের সামরিক সরকার আগে মালয়েশিয়ার এ ধরনের ঘোষণাকে “ভুয়া খবর” বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। তারা রোহিঙ্গা পরিচয়ও স্বীকার করে না। ফলে চুক্তিটি আদৌ কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে। বার্মা ক্যাম্পেইন ইউকে ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, এই আমন্ত্রণ সামরিক সরকারকে এক ধরনের বৈধতা দিচ্ছে। তাদের মতে, সংকটের মূল কারণ যে সরকার, তাকে সমাধানের অংশীদার ভাবা ভুল। নিপীড়নের কাঠামো যতদিন বদলাচ্ছে না, ততদিন তাড়াহুড়ো করে ফেরত পাঠানো কেবল দুর্ভোগ ও আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়াবে বলে সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে।
বাংলাদেশের জন্য খবরটি গভীর উদ্বেগের। কক্সবাজারের শিবিরে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বছরের পর বছর আটকে আছেন। ঢাকা বরাবরই বলে আসছে, প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ। মালয়েশিয়া যদি জোর করে পাঠায়, তা অন্য আশ্রয়দাতা দেশগুলোর ওপরও একই পথে হাঁটার চাপ তৈরি করতে পারে। আবার রাখাইনে সংঘাত চলতে থাকায় ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গারা আবার সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার ঝুঁকিও থাকে। বঙ্গোপসাগর পাড়ি দেওয়া নৌকাযাত্রার পুরোনো পথও তাতে আবার সক্রিয় হতে পারে। তাই এই রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা ঢাকার কূটনৈতিক হিসাবেও নতুন প্রশ্ন তুলছে।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, কর্মসূচিটি স্বেচ্ছামূলক। কিন্তু যাঁদের পাঠানো হচ্ছে, তাঁরা সবাই আটক কেন্দ্রে বন্দি। অধিকার সংগঠনগুলো তাই একে জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন হিসেবেই দেখছে। প্রথম দলটিকে নেওয়া হবে মিয়ানমার নৌবাহিনীর দুটি যুদ্ধজাহাজ ও একটি হাসপাতাল জাহাজে। অনেকে একদিন যে বাহিনীর ভয়ে সাগর পাড়ি দিয়েছিলেন, সেই বাহিনীর ডেকেই তাঁদের ঘরে ফেরার কথা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















