ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং পাল্টা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে একটি পণ্যবাহী জাহাজে অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেক্টাইলের আঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং দুজন হতাহত হয়েছেন। ব্রিটিশ নৌবাণিজ্য পরিচালনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটির সব ক্রুকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে এই হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিগুলোর একটি আবার সামনে এনেছে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে শুধু উপসাগরীয় দেশগুলো নয়, ইউরোপ ও এশিয়ার জ্বালানি বাজারেও তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
হরমুজে হামলা, জাহাজে আগুন
মেরিটাইম কর্তৃপক্ষের বরাতে জানা গেছে, একটি পণ্যবাহী জাহাজ অজ্ঞাত একটি প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আঘাতের পর জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং সেটি নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় ভাসতে থাকে। পরে জাহাজের সব ক্রুকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনায় দুজন হতাহত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। তবে হামলার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পক্ষকে দায়ী করা হয়নি।
এই ঘটনার পাশাপাশি ইয়েমেনকে ঘিরেও উত্তেজনা বাড়ছে। হুথি-সংশ্লিষ্ট একটি গণমাধ্যম দাবি করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনের তাইজ ও আল-জাওফ প্রদেশে সৌদি বিমান হামলায় ১০ জন নিহত ও ১৪ জন আহত হয়েছেন। তবে এটি হুথি-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি; স্বাধীনভাবে তা যাচাইয়ের তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
হুথিদের এক সামরিক উপদেষ্টা আবার সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করে অথবা বাব আল-মানদাব প্রণালি নিয়ন্ত্রণ বা খুলে দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থে হামলা চালানো হতে পারে।
জ্বালানি বাজারে দীর্ঘস্থায়ী চাপের আশঙ্কা
ইরান যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক গ্যাস বাজারে পড়েছে। আন্তর্জাতিক গ্যাস ইউনিয়নের মহাসচিব মেনেলাওস ইদ্রেয়োস বলেছেন, বাজারে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে গ্যাস সরবরাহের সংকট শুধু শীতকাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না; আগামী গ্রীষ্ম পর্যন্তও উচ্চমূল্য ও সরবরাহঝুঁকি বজায় থাকতে পারে।
ইউরোপীয় দেশগুলো শীতের আগে গ্যাসের মজুত পূরণ করতে এশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামছে। ফলে এশিয়ার বাজারেও সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইদ্রেয়োসের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটের চেয়েও আলাদা, কারণ এবার একই সময়ে বিশ্বের একাধিক অঞ্চলে এর প্রভাব পড়ছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এখনো কিছুটা স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে হওয়া বৈঠককে ‘খুব ভালো’ ও ফলপ্রসূ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, দুই পক্ষের আরও একটি বৈঠক খুব শিগগির হওয়ার কথা রয়েছে। এর পর তেলের দাম কিছুটা কমেছে এবং শেয়ারবাজারেও অস্থিরতা কিছুটা কমেছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে ছিল।
কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি
সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সৌদি বাদশাহ সালমানের কাছে পাঠানো এক বার্তায় তেহরান ও রিয়াদের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার ওপর জোর দিয়েছেন। দুই দেশের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মিলকে বন্ধুত্বের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার প্রত্যাশা জানিয়েছেন।
ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুয়াদ হুসেইনও জানিয়েছেন, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগ চলছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি আবার নৌ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা এবং উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চলছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতার জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল সংলাপ প্রয়োজন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাসও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠকে হরমুজ ও বাব আল-মানদাব প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচলের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। একই আলোচনায় তিনি ইরানের অভ্যন্তরে দমন-পীড়ন, মৃত্যুদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের রায় বৃদ্ধির বিষয়ও তুলেছেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁও হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল স্বাভাবিক করতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। তবে তিনি বলেছেন, কোনো দেশের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর ইচ্ছা ফ্রান্সের নেই। একই সঙ্গে তিনি সামরিক হামলার মাধ্যমে কোনো দেশে সরকার পরিবর্তনের কৌশল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
ইরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও পরিবহন খাতে চাপ বাড়িয়ে চলেছে। নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বন্ধ হয়েছে। বাগদাদ, মাসকাট, কাতার, জর্জিয়া ও আজারবাইজানের বিভিন্ন রুটে ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। তেহরানের একটি ট্রাভেল এজেন্ট পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত বলে বর্ণনা করেছেন।
তবে নিষেধাজ্ঞার হুমকির মধ্যেও তেহরান থেকে চীনের গুয়াংজুতে একটি মাহান এয়ারের বাণিজ্যিক ফ্লাইট পৌঁছেছে বলে ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্যের বরাতে জানানো হয়েছে। চীনের পক্ষ থেকেও ইরানি ফ্লাইট চলাচল অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করা হয়েছে।
ইরানের দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রেও ক্ষয়ক্ষতির পর উৎপাদন পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। ইরানের তেল মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার বরাতে জানানো হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে এবং শীতের আগেই নির্ধারিত পুনরুদ্ধারকাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে অর্থনীতিতেও
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যেও অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের ধাক্কা সামলানোর কিছু সক্ষমতা রয়েছে বলে মনে করছে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি)। সংস্থাটি ২০২৬ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়িয়ে ২ দশমিক ৯ শতাংশ করেছে। তবে একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।
শ্রীলঙ্কার মতো দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোতে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও এল নিনোর প্রভাবে দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ব্যাহত হতে পারে। যুদ্ধ শুরুর পর দেশটি এরই মধ্যে জ্বালানির দাম ৫০ শতাংশের বেশি বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ডিজেল রপ্তানি বন্ধের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত ডিজেল দেশের ভেতরেই রাখার উদ্যোগ নেওয়া হলে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজারে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে।
যুদ্ধের সঙ্গে বাড়ছে রাজনৈতিক সংঘাতও
জাতিসংঘে ট্রাম্পের ইরানবিষয়ক বক্তব্য নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সমালোচনা হয়েছে। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ট্রাম্পের ইরানকে ধ্বংস করার হুমকিকে কঠোরভাবে সমালোচনা করে এটিকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং কংগ্রেসকে যুদ্ধ বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ইরানের সামরিক বাহিনী ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘কৌশলগত হতাশার’ প্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং আরও হামলা হলে পাল্টা জবাব দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। ইরানের সামরিক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও অনিশ্চিত পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ এখন শুধু ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ ও বাব আল-মানদাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ, ইয়েমেন, লেবানন, সৌদি আরব এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার—সবগুলোই একই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে কূটনৈতিক যোগাযোগ চললেও নতুন করে কোনো নৌপথে হামলা বা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া পরিস্থিতিকে আরও বড় সংকটে ঠেলে দিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল কত দ্রুত স্বাভাবিক করা যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপ সামরিক সংঘাত কমানোর মতো বাস্তব কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কি না। কারণ যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তার প্রভাব তত বেশি ছড়িয়ে পড়বে জ্বালানি, বাণিজ্য, পরিবহন ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
Sarakhon Report 



















