বিশ্বে নতুন তেল ও গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের সংখ্যা ২০২৫ সালে ৪০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়া এই হিসাব প্রকাশ করেছে। শুধু সংখ্যা নয়, আবিষ্কৃত ক্ষেত্রগুলোতে মজুতের পরিমাণও ২০১৩ সালের সর্বোচ্চ অবস্থানের মাত্র এক-দশমাংশে নেমে এসেছে। প্রতিবেদনের মূল কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি কোম্পানিগুলো অনুসন্ধানে বিনিয়োগ কমিয়েছে। আজারবাইজানের সংবাদমাধ্যম আজারনিউজ একই হিসাব উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, গত বছর বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাত্র ১৯টি তেল-গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৯৮০ সালের পর এটিই সবচেয়ে কম। তেল-গ্যাস আবিষ্কারে ধস এমন সময়ে এল, যখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজার এমনিতেই টালমাটাল।
নিক্কেই এশিয়ার বিশ্লেষণে কয়েকটি চাপের কথা এসেছে। প্রথমত, কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক চাপে কোম্পানিগুলো নতুন অনুসন্ধানে টাকা ঢালতে দ্বিধায় আছে। দ্বিতীয়ত, সহজে পাওয়া যায় এমন বড় ক্ষেত্রগুলো আগেই খুঁজে পাওয়া হয়ে গেছে। এখন নতুন খনি মানে গভীর সমুদ্র বা দুর্গম অঞ্চলে কাজ। এতে খরচ ও প্রযুক্তিগত জটিলতা দুটোই বেশি। তাই কোম্পানিগুলো আগে অনাবিষ্কৃত অঞ্চলে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় জাপানি কোম্পানি ইনপেক্সের প্রাকৃতিক গ্যাস প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এমন প্রকল্প থেকে উৎপাদন আসতে বছরের পর বছর লাগে। অনুসন্ধানে বিনিয়োগ কমার এটিও একটি কারণ। দুর্গম অঞ্চলে কূপ খুঁড়ে শূন্য হাতে ফেরার ঝুঁকিও এখন আগের চেয়ে বেশি।
এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য দীর্ঘমেয়াদি এবং তা শুধু জ্বালানি কোম্পানির হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ নয়। আজ যে খনি আবিষ্কার হয়, তা থেকে উৎপাদন শুরু হতে সাধারণত এক দশক লাগে। ফলে আবিষ্কারে ধস মানে ভবিষ্যতে সরবরাহে ঘাটতির ঝুঁকি। বিশ্লেষকেরা অনেক দিন ধরেই সতর্ক করছেন, বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন প্রাকৃতিকভাবেই কমে আসে। নতুন ক্ষেত্র না এলে সেই ঘাটতি পূরণ হয় না। জ্বালানি রূপান্তর যত দ্রুত হওয়ার কথা, বাস্তবে তত দ্রুত হচ্ছে না। অথচ জীবাশ্ম জ্বালানির নতুন উৎস খোঁজাও থমকে আছে। এই দুইয়ের মাঝের ফাঁক দামের অস্থিরতা বাড়াতে পারে। ইরান যুদ্ধের সময় তেল-গ্যাস আবিষ্কারে ধস তাই বাজারের দুশ্চিন্তা আরও বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য খবরটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বছর বছর কমছে। ঘাটতি পূরণে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বৈশ্বিক সরবরাহ সংকুচিত হলে সেই আমদানির দাম আরও বাড়বে। এর ধাক্কা লাগবে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা ও পোশাকশিল্পে। বিশ্ব যখন নতুন উৎস খুঁজে পাচ্ছে না, তখন দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রে নিজস্ব অনুসন্ধান জোরদারের যুক্তিও শক্ত হয়। সাগরে বাংলাদেশের বিশাল জলসীমা থাকলেও সেখানে অনুসন্ধান এখনো খুব সীমিত। বিশ্বজুড়ে তেল-গ্যাস আবিষ্কারে ধস দেখা দিলে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে বঙ্গোপসাগরে আকৃষ্ট করাও কঠিন হবে। তাদের বিনিয়োগ যাবে যেখানে ঝুঁকি কম আর লাভ নিশ্চিত।
১৯৮০ সালে বিশ্বে কম্পিউটার ছিল হাতে গোনা, অথচ তেলের খনি খোঁজা হতো অনেক বেশি। চার দশক পরে এআই দিয়ে ভূগর্ভের মানচিত্র আঁকা যায়, কিন্তু খুঁজে পাওয়া খনির সংখ্যা সেই ১৯৮০ সালের নিচে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















