শ্রীলঙ্কার হাইকোর্ট ২০১৯ সালের ইস্টার সানডে বোমা হামলার পরিকল্পনার দায়ে ১৫ জনকে দীর্ঘ কারাদণ্ড দিয়েছে। প্রত্যেকের সাজা ২০০ থেকে ২৬০ বছর। সেই হামলায় ২৭০ জন নিহত ও পাঁচ শতাধিক আহত হয়েছিলেন। বিবিসি জানিয়েছে, দণ্ডিতদের মধ্যে আছেন নওফার মৌলভি। কৌঁসুলিদের দাবি, তিনিই আত্মঘাতী হামলার মূল পরিকল্পনাকারী। নয়জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত ২৫ জনের একজন হেফাজতে মারা যান। আদালত দণ্ডিতদের সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ২৩ হাজারের বেশি অপরাধের অভিযোগ ছিল। জোড়ায় জোড়ায় হাতকড়া পরিয়ে দুটি কারাগারের বাসে তাঁদের আদালতে আনা হয়। ইস্টার হামলার রায় তাই শ্রীলঙ্কার বিচার ইতিহাসে বড় ঘটনা।
তিনটি গির্জা ও তিনটি বিলাসবহুল হোটেলে সমন্বিত বিস্ফোরণ ছিল ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেশটির সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। নিহতদের বেশির ভাগই শ্রীলঙ্কান, তাঁদের অনেকে শিশু। ৪৫ জন বিদেশিও নিহত হন। এর মধ্যে ১১ জন ভারতীয়, আটজন ব্রিটিশ ও পাঁচজন মার্কিন নাগরিক ছিলেন। বাংলাদেশ, চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশের নাগরিকও প্রাণ হারান। হামলাকারীরা সবাই বিস্ফোরণে মারা যায়। তদন্তকারীরা হামলার জন্য উগ্রপন্থী ইসলামপন্থীদের দায়ী করেছিলেন। অভিযুক্তরা সবাই শ্রীলঙ্কার মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। হামলার পর শ্রীলঙ্কায় মুসলিমবিরোধী সহিংসতাও দেখা দিয়েছিল।
হামলার পর কর্তৃপক্ষ “বড় গোয়েন্দা ব্যর্থতার” কথা স্বীকার করে। সংসদে জানানো হয়, ভারত থেকে পাওয়া আগাম সতর্কবার্তা যথাযথভাবে কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়নি। ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট সাবেক প্রেসিডেন্ট মৈত্রীপালা সিরিসেনাকে ভুক্তভোগীদের কোটি কোটি রুপি ক্ষতিপূরণ দিতে বলে। গত মাসে দুই সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে অবহেলার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এখন সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান সুরেশ সাল্লের বিরুদ্ধে আলাদা তদন্ত চলছে। অভিযোগ, তিনি উগ্রপন্থীদের সঙ্গে মিলে হামলার ছক কষেছিলেন। দাবি উঠেছে, রাজাপাকসে পরিবারের জনপ্রিয়তা বাড়াতে হামলা ঘটতে দেওয়া হয়েছিল। সাল্লে ও সাবেক প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে দুজনেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ইস্টার হামলার রায় তাই শেষ অধ্যায় নয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আছে, তিনি সম্ভাব্য গ্রেপ্তার ঠেকাতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
বাংলাদেশের জন্য এই রায়ের দুটি দিক আছে। প্রথমত, নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকও ছিলেন, তাই বিচারপ্রক্রিয়া ঢাকার জন্যও আবেগের বিষয়। দ্বিতীয়ত, হলি আর্টিজান হামলার অভিজ্ঞতা থাকা বাংলাদেশ জানে, গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির ব্যর্থতা কত ভয়াবহ হতে পারে। শ্রীলঙ্কার ঘটনায় প্রতিবেশী দেশের সতর্কবার্তা উপেক্ষিত হয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় আরও কার্যকর করার প্রয়োজন এই রায়ে আবার সামনে এসেছে। একই সঙ্গে হামলার পর সংখ্যালঘুদের ওপর প্রতিশোধমূলক সহিংসতা ঠেকানোর শিক্ষাও আছে। ইস্টার হামলার রায় দেখাচ্ছে, বিচার দেরিতে হলেও তা সম্ভব, যদি ভুক্তভোগীদের দাবি জীবিত থাকে। হলি আর্টিজান মামলার বিচারও দেশে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে।
শ্রীলঙ্কার মানুষ সাত বছর ধরে নিয়মিত বিক্ষোভ করে বিচার চেয়েছেন। মঙ্গলবার যে রায় এল, তাতে দণ্ডিতদের কারাদণ্ডের যোগফল কয়েক হাজার বছর, অথচ হামলার পেছনে কারা ছিল সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো আদালতের বাইরে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















