এআই শিল্পের নেতারা মানবজাতির স্বার্থে বিশ্বজুড়ে এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু যে দুই পরাশক্তি এই প্রযুক্তির দৌড়ে সবার আগে, তারা থামার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দুই দেশই এআইয়ের গতি কমানোর আহ্বান নাকচ করেছে। অথচ গবেষকেরা বলছেন, বিপর্যয়কর এমনকি অস্তিত্বের ঝুঁকি এড়াতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জরুরি। ট্রাম্প ও শি জিনপিং এ বছর তৃতীয়বার বৈঠকে বসছেন। কিন্তু এআই নিরাপত্তায় সহযোগিতা নিয়ে প্রত্যাশা খুব সীমিত। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, বড়জোর কিছু পদক্ষেপ আসতে পারে। তবে সেগুলো বিশেষজ্ঞদের চাওয়া সমন্বিত গতি কমানোর ধারেকাছেও যাবে না।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালভিন ওয়াং গ্রেলিন বলেন, প্রায় সব অগ্রণী এআই গবেষণাগার এই দুই দেশে। মানুষ যে মডেলগুলো ডাউনলোড করে, তার বেশির ভাগও এদের। তাঁর মতে, এক পক্ষের মডেলের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা মানে সমস্যার অর্ধেক সমাধান। কিন্তু পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ঝুঁকি নিয়ে ভিন্ন ধারণা সহযোগিতার পথে বাধা। ট্রাম্প এআই নিয়ে ভয়কে “ষড়যন্ত্র” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। জাতিসংঘের ভাষণে তিনি বলেছেন, এআই নিয়ন্ত্রণের যেকোনো “বিশ্বায়নবাদী পরিকল্পনার” বিরোধিতা করবে ওয়াশিংটন। চীন নিজের দেশে এআই নিয়ন্ত্রণে বেশি সক্রিয়। এ মাসেই তারা নিরাপত্তা কাঠামোর তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছে। তবু বেইজিংও এআইয়ের গতি কমানোর আহ্বান নাকচ করে একে “ভয় ছড়ানো” বলছে।

বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সান চেংহাও বলেন, চীনও নিয়ন্ত্রণ হারানো, অপব্যবহার ও সাইবার ঝুঁকি স্বীকার করে। কিন্তু চীনের আশঙ্কা, “এআই নিরাপত্তা” হয়তো চিপ ও বাজারে চীনের প্রবেশ আটকানোর অজুহাত হয়ে উঠবে। অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এ মাসের এক প্রবন্ধে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের উচিত এআই উন্নয়নের গতি “উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত” করার চুক্তি নিয়ে আলোচনা করা। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, এমন চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম। মন্ট্রিয়ল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিড ক্রুগার আরও এক ধাপ এগিয়ে অবিলম্বে অনির্দিষ্টকালের জন্য অগ্রণী এআই উন্নয়ন স্থগিতের দাবি তুলেছেন। অন্যদিকে এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং ও মেটার মার্ক জাকারবার্গ বাইরের তদারকির প্রয়োজনীয়তাকে খাটো করে দেখছেন। এআইয়ের গতি কমানোর আহ্বান তাই শিল্পের ভেতরেও বিভক্ত।
বাংলাদেশের জন্য এই বিতর্কের দুটি দিক আছে। একদিকে এআই প্রযুক্তি সস্তা ও সহজলভ্য হচ্ছে, যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিতে নতুন সুযোগ আনতে পারে। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীন এআইয়ের ঝুঁকি, যেমন ভুয়া তথ্য, সাইবার অপরাধ ও চাকরি হারানো, দুর্বল নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দেশে বেশি আঘাত হানে। বড় শক্তিগুলো যখন নিজেদের প্রতিযোগিতাকে নিরাপত্তার ওপরে রাখছে, তখন ছোট দেশগুলোকে নিজেদের সুরক্ষার কথা নিজেদেরই ভাবতে হবে। বাংলাদেশের জাতীয় এআই নীতি কাঠামো তাই শুধু সুযোগ নয়, ঝুঁকিও মাথায় রেখে সাজানো দরকার। আন্তর্জাতিক ফোরামে এআইয়ের গতি কমানোর আহ্বান যদি জোর পায়, তাতে সমর্থন দেওয়ার সুযোগও ঢাকার আছে। প্রযুক্তির নিয়ম তৈরিতে উন্নয়নশীল দেশের কণ্ঠ যত জোরালো হবে, ঝুঁকির বোঝা তত ন্যায্যভাবে ভাগ হবে।
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক এক্সিসটেনশিয়াল রিস্ক অবজারভেটরির পরিচালক অটো বারটেন বলছেন, এআইকে কখনোই নিজেকে নিজে উন্নত করার মতো শক্তিশালী হতে দেওয়া যাবে না। ওয়াশিংটনের বৈঠকে সেই রেখা টানার কথা এখনো কেউ আলোচ্যসূচিতে তোলেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















