চীনের অভ্যন্তরীণ মঙ্গোলিয়ার বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে কৃষকেরা আলু তুলছেন। তাঁদের নতুন প্রতিবেশী বিশাল আয়তাকার সব ভবন। এগুলো চীনের এআই প্ল্যাটফর্মগুলোর শক্তি জোগাবে। ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম বিবিসি উলানচাব শহর থেকে এই প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। বহু বছর ধরে শহরটি চীনের সরকারি “আলুর রাজধানী” নামে পরিচিত। এখন এর মাঠগুলো একের পর এক ডেটা সেন্টারের নির্মাণস্থল। হলুদ হেলমেট পরা শত শত শ্রমিক ভারী যন্ত্রপাতি বহন করছেন, মাথার ওপর দিয়ে বিশাল ক্রেন ঘুরছে। এক শ্রমিক হেসে বললেন, “এটাই চীনা গতি।” নিজের দেশকে তিনি বললেন “অবকাঠামোর পাগল”। এক বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী জানালেন, প্রতি বছর একটি করে ধাপ শেষ হয়। এটি দ্বিতীয় ধাপ, সামনে আরও অনেক ধাপ আসবে। চীনের এআই ডেটা সেন্টার এভাবেই তৃণভূমি বদলে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে এআই। আর সেই প্রতিযোগিতার চাবি এসব ভবনের ভেতরের কম্পিউটিং শক্তি। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কাছে এগুলো অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ৯০ শতাংশ শিল্প ও সমাজে এআই ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য আছে বেইজিংয়ের। চীন শুধু অবকাঠামো গড়ছে না, মেধাও গড়ছে। ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অব চায়নার গবেষক জ্যাক ঝাং বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া শিক্ষার্থী ও গবেষকের সংখ্যা কমছে। উল্টো সেখান থেকে ফেরার সংখ্যা বাড়ছে। তিনি নিজে ইয়েল ও কেমব্রিজে পড়ার পর একটি উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে ফিরেছেন। মার্কিন অভিবাসন নীতির কড়াকড়ি ও উত্তেজনা এতে ভূমিকা রাখছে।
চীনের এই অগ্রগতিই যুক্তরাষ্ট্রের গতি না কমানোর বড় যুক্তি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত সপ্তাহে বলেছেন, “যে এআইতে জিতবে, সে-ই জিতবে।” অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই চীনে উন্নত চিপ বিক্রির নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষে। তাঁর মতে, চীন এগিয়ে গেলে তা যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের জন্য গুরুতর বিপদ। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমস এসব উদ্বেগকে চীনকে আটকানোর “স্নায়ুযুদ্ধের কৌশল” বলছে। শি জিনপিং চীনা কোম্পানিগুলোকে সাশ্রয়ী ও উন্মুক্ত উৎসের মডেল তৈরিতে উৎসাহ দিচ্ছেন। এসব মডেল যে কেউ নিজের মতো বদলে নিতে পারে। প্রযুক্তি ভাগাভাগির এই পথে চীন উন্নত চিপের ঘাটতিও কিছুটা পুষিয়ে নিয়েছে। আর সেই মডেলগুলো চালানোর ভার বইছে চীনের এআই ডেটা সেন্টার।
বাংলাদেশের জন্য এখানে দুটি শিক্ষা আছে। প্রথমত, চীনের উন্মুক্ত উৎসের এআই মডেল ছোট দেশগুলোর জন্য সস্তা বিকল্প হয়ে উঠছে। বাংলা ভাষার এআই সেবা তৈরিতে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো এসব মডেল ব্যবহার করতে পারে। দ্বিতীয়ত, চীনের এআই ডেটা সেন্টার দেখাচ্ছে, এআই মানেই বিপুল বিদ্যুৎ ও জমির চাহিদা। বাংলাদেশে যখন বিদ্যুৎ ঘাটতি নিয়মিত সমস্যা, তখন দেশীয় ডেটা সেন্টারের স্বপ্ন দেখতে হলে আগে জ্বালানি পরিকল্পনা ঠিক করতে হবে। মেধা ধরে রাখার প্রশ্নও আছে। বিদেশে পড়া তরুণ গবেষকদের দেশে ফেরাতে চীনের মতো সুযোগ ও সুবিধা তৈরি না হলে প্রযুক্তির দৌড়ে পিছিয়ে থাকার ঝুঁকি থেকে যায়।
উলানচাবের কৃষকেরা এখনো আলু তোলেন আগের মতোই, হাতে আর ঝুড়িতে। তাঁদের মাঠের পাশেই উঠছে এমন ভবন, যার ভেতরের যন্ত্র একদিন হয়তো ঠিক করে দেবে কোন জমিতে কতটা আলু ফলবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















