ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের আসন্ন বৈঠক ঘিরে প্রত্যাশা যথেষ্ট বড়। বাণিজ্য, সরবরাহব্যবস্থা, বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইরান যুদ্ধ এবং তাইওয়ান—দুই পরাশক্তির সম্পর্কের প্রায় প্রতিটি স্পর্শকাতর বিষয়ই আলোচনায় আসতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল হয়তো কোনো ঐতিহাসিক চুক্তি নয়। বরং বড় কোনো ভুল সিদ্ধান্ত এড়িয়ে চলাই উভয় পক্ষের জন্য বেশি মূল্যবান হতে পারে।
ট্রাম্পের জন্য সময়টি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে, আর চীনের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্যিক সমঝোতার মেয়াদও শেষের দিকে। এমন সময়ে বেইজিংয়ের প্রতি বড় ধরনের ছাড় দিলে সেটি ঘরোয়া রাজনীতিতে নতুন সমালোচনার জন্ম দিতে পারে। বিপরীতে, অতিরিক্ত কঠোর অবস্থান আবার গত বছরের শুল্কযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে পারে।
বাণিজ্যে বড় সমঝোতার জায়গা সীমিত
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখন এক ধরনের ভঙ্গুর ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেমিকন্ডাক্টর ও বিরল খনিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দুই দেশই একে অন্যের ওপর নির্দিষ্ট মাত্রায় নির্ভরশীল। ফলে আগের তীব্র বাণিজ্য সংঘাত থেকে পিছিয়ে এসে তারা উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। কিন্তু মূল বিরোধগুলো এখনো সমাধান হয়নি।
![]()
দুই দেশের বর্তমান বাণিজ্যিক বিরতি ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা। তাই বৈঠকে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত হতে পারে এর মেয়াদ আরও কয়েক মাস বাড়ানো। কিছু নির্বাচিত পণ্যে শুল্ক কমানোর বিনিময়ে চীনের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কেনা বাড়ানোর মতো সীমিত সমঝোতাও হতে পারে।
এ ধরনের পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলক নিরাপদ। এতে ট্রাম্প প্রশাসন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নরম করার অভিযোগ এড়াতে পারে, আবার বেইজিংও বড় কোনো কৌশলগত সুবিধা ছাড়াই বাণিজ্য উত্তেজনা কমিয়ে রাখতে পারে।
চীনা গাড়ি নির্মাতাদের যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা স্থাপনের বিষয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ইতিবাচক মন্তব্য অবশ্য নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু মার্কিন গাড়ি শিল্প এবং রিপাবলিকান রাজনীতির একটি অংশ চীনা প্রতিযোগীদের প্রবেশ ঠেকাতে চাপ দিতে পারে। একই সময়ে চীনা কোম্পানিগুলোও বিনিয়োগের আগে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা চাইবে। ফলে এই ক্ষেত্রেও দ্রুত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সহযোগিতার সংকট
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে দুই দেশের সহযোগিতার সম্ভাবনাও সীমিত। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—দুই দেশই অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় রয়েছে। ফলে প্রযুক্তির বিকাশ নিয়ন্ত্রণে কোনো যৌথ বিধিনিষেধ গ্রহণ করলে প্রতিপক্ষ তা কৌশলগত সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করতে পারে—এই আশঙ্কা উভয় পক্ষেই প্রবল।
চীনের উদ্যোগে আগের বৈঠকের পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যে সরকারি সংলাপের কথা বলা হয়েছিল, তা খুব বেশি এগোয়নি। নতুন করে আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার বাস্তবতা বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পথ কঠিন করে রেখেছে।
তাইওয়ান ও ইরানেও সহজ সমাধান নেই
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও একই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে ওয়াশিংটনের আপত্তি রয়েছে। কিন্তু বেইজিংকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কাঠামো পুরোপুরি মেনে চলতে বাধ্য করার মতো চাপ প্রয়োগের সুযোগ ট্রাম্পের সীমিত।
তাইওয়ান প্রশ্ন আরও স্পর্শকাতর। শি জিনপিং চীনের সার্বভৌমত্বের দাবিকে আবারও জোর দিতে পারেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার বিনিময়ে কী বাস্তব কৌশলগত লাভ আসবে, সেটিও স্পষ্ট নয়। ফলে এই ক্ষেত্রেও বড় সমঝোতার পরিবর্তে বর্তমান অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করাই বেশি সম্ভাব্য।
বৈঠকের সাফল্য হয়তো সীমিত প্রত্যাশাতেই
বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও বড় কোনো অগ্রগতির প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। গোল্ডম্যান স্যাকসের সাম্প্রতিক এক জরিপে প্রায় ৭০ শতাংশ বিনিয়োগকারী শির সফরকে প্রতীকী বা কার্যত ফলহীন হওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়েছেন। বাকিদের বড় অংশ সীমিত অগ্রগতির প্রত্যাশা করেছেন।
এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের একটি নতুন বাস্তবতা কাজ করছে। ট্রাম্পের পছন্দের ঘন ঘন শীর্ষ বৈঠক প্রতিটি বৈঠকের ওপর চাপ কমিয়ে দেয়। একটি সম্মেলন তখন আর সম্পর্কের মোড় ঘোরানোর একমাত্র সুযোগ থাকে না; বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার মধ্যেও যোগাযোগ বজায় রাখার একটি উপায় হয়ে ওঠে।
এটি শির জন্যও সুবিধাজনক। নিয়মিত সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ধরে রাখতে পারেন। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের কঠোরপন্থী অংশ যাতে সম্পর্ককে অতিরিক্ত সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে না পারে, সেই সুযোগও তৈরি হয়।
বেইজিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে কার্যকর পরিস্থিতি হতে পারে এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী মধ্যবর্তী অবস্থা—যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাবে না। ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত নিয়মিত বৈঠক সেই ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।

রাশিয়াও সমীকরণের বাইরে নয়
এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সঙ্গে রাশিয়ার হিসাবও যুক্ত হচ্ছে। মস্কোর পক্ষ থেকে ট্রাম্প, শি ও ভ্লাদিমির পুতিনকে নিয়ে সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের ধারণা সামনে এসেছে। নভেম্বরে শেনঝেনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্মেলনে ট্রাম্প গেলে এমন বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এমন কোনো বৈঠক বাস্তবায়িত হলে তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প-শি বৈঠকের তাৎপর্য কোনো নাটকীয় ঘোষণায় নাও থাকতে পারে। বড় চুক্তির বদলে বাণিজ্যিক বিরতি বাড়ানো, সীমিত কিছু অর্থনৈতিক ছাড় এবং যোগাযোগের পথ খোলা রাখাই হয়তো বাস্তব ফল হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটিকে ছোট অর্জন হিসেবে দেখা ভুল হতে পারে। কারণ বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা যখন গভীর, তখন সম্পর্ককে সংঘাতের দিকে না ঠেলে নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে রাখা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। এই বৈঠকের মূল প্রশ্ন তাই কে বড় ছাড় পেল—তা নয়; বরং দুজন নেতা কতটা সতর্কতার সঙ্গে এমন একটি সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন, যেখানে বিরোধ থাকবে, কিন্তু তা নতুন সংকটে রূপ নেবে না।
হাডসন লকেট 



















