মিয়ানমারে বাধ্যতামূলক সামরিক আইন চালুর পর থেকে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮০ জন পুরুষকে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হয়েছে। জান্তাবিরোধী জাতীয় ঐক্য সরকার বা এনইউজি এই হিসাব দিয়েছে। মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডিভিবি জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি আইনটি কার্যকর হয়। এরপর ২৭ দফায় এই নিয়োগ হয়েছে। এনইউজি ১৮ সেপ্টেম্বর বলেছে, তরুণদের জোর করে নিয়োগ দেওয়াই এখন সামরিক একনায়কতন্ত্র টিকিয়ে রাখার প্রধান উপায়। আইন অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৫ বছরের পুরুষ ও ১৮ থেকে ২৭ বছরের নারীদের দুই বছর সেনাবাহিনীতে কাজ করতে হয়। সরকার একে বলে জনগণের সামরিক সেবা আইন। কিন্তু দেশটির তরুণদের কাছে মিয়ানমারের বাধ্যতামূলক সেনাভর্তি এখন জীবনের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।
এনইউজির দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত জান্তার ২০ হাজার ৩৮৩ সৈন্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৯ হাজার ৭৯২ জন। এর বড় অংশই নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। তবে নিহতদের মধ্যে কতজন নতুন সৈনিক, তার সঠিক সংখ্যা দেয়নি। একই সময়ে ৩ হাজার ৮৭৪ জন সৈন্য পক্ষ ত্যাগ করেছেন। পালিয়ে গেছেন আরও প্রায় ২০ হাজার। সামরিক সরকার নারীদের নিয়োগের কথা অস্বীকার করে আসছে। তবে গোপন সামরিক সূত্র বলছে, ইয়াঙ্গুনের মবি শহরতলির একটি কেন্দ্রে নারীদের দ্বিতীয় দলটি ১০ আগস্ট থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন, কারণ দেশটিতে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশ সীমিত। তবু নিয়োগ, মৃত্যু আর পালিয়ে যাওয়ার এই সংখ্যাগুলো একটি ক্লান্ত সেনাবাহিনীর ছবিই তুলে ধরে।
একই সপ্তাহে জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং আনুষ্ঠানিকভাবে সেনা-সমর্থিত দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছেন। দলটির মুখপাত্র হ্লা থেইন এ কথা জানিয়েছেন। তবে দলে তাঁর পদ কী, তা প্রকাশ করা হয়নি। দলের সভাপতি খিন ই পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। গুঞ্জন ছিল, মিন অং হ্লাইং তাঁকে সরিয়ে নিজে সভাপতি হতে চেয়েছিলেন। মুখপাত্র সেই গুঞ্জন নাকচ করেছেন। এদিকে ডিভিবি জানিয়েছে, দক্ষিণ চিন ও রাখাইনে পাল্টা অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে সেনাবাহিনীর একটি বড় বহর মাগওয়ে অঞ্চলে পৌঁছেছে। আইয়ারওয়াদি অঞ্চলে আরাকান আর্মির সঙ্গে লড়াইও চলছে। সেখানে বিমান হামলায় বেসামরিক মানুষ হতাহত হচ্ছেন।
বাংলাদেশের জন্য এই খবরের তাৎপর্য সীমান্তে। রাখাইনে নতুন করে বড় অভিযান হলে আবার শরণার্থীর ঢল নামতে পারে। মিয়ানমারের বাধ্যতামূলক সেনাভর্তি থেকে বাঁচতে রাখাইনের তরুণ রোহিঙ্গারাও পালানোর চেষ্টা করেন। এর আগেও সংঘাত বাড়লে নাফ নদী পেরিয়ে মানুষ কক্সবাজারে ঢুকেছে। মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড যখন শরণার্থী ফেরত পাঠাতে চাইছে, তখন মিয়ানমারের ভেতরের এই ছবি স্পষ্ট করে দেয়, দেশটি ফেরার মতো নিরাপদ নয়। প্রত্যাবাসন আলোচনায় ঢাকার যুক্তিও এতে জোরালো হয়। সীমান্তে নজরদারি ও মানবিক প্রস্তুতি দুটোই এখন জরুরি। মিয়ানমারের বাধ্যতামূলক সেনাভর্তি কেবল দেশটির ভেতরের বিষয় নয়, এর ঢেউ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশেও আসতে পারে।
বিদেশে পালিয়ে থাকা অনেক মিয়ানমার তরুণ একটাই কারণে ফিরতে চান না। বাধ্যতামূলক সেনাভর্তি। এনইউজির হিসাবে প্রতিটি দফায় গড়ে পাঁচ হাজার তরুণের নাম সেই তালিকায় উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















