০৮:২৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
দুর্নীতি শুধু ঘুষ নয়: নীরবতা, গাফিলতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তৃত বাস্তবতা ইরানের শর্তে ৬০ দিনের আলোচনা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তি সম্পন্নের ঘোষণা নতুন ইতিহাসের সাক্ষী কুরাসাও: ৭-১ গোলে হারলেও বিশ্বকাপ অভিষেকে গর্বে ভাসছে ছোট্ট দ্বীপদেশ আমাদ দিয়ালোর শেষ মুহূর্তের গোলে জয়, বিশ্বকাপ শুরুতেই দারুণ সূচনা আইভরি কোস্টের ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এক বিশ্ব: বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা ও টেকসই লড়াইয়ের আহ্বান সীমান্ত হত্যা ও ‘পুশ-ইন’ বন্ধের দাবিতে ঢাকায় ১১ দলের সমাবেশ আজ ইসলামী ব্যাংকের পুরো পর্ষদ বিলুপ্ত, প্রশাসকের হাতে সব ক্ষমতা জিসানকে ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো, স্বাস্থ্য পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি ওবায়দুল কাদেরকে জেনারেল সেক্রেটারি করাই ছিলো আওয়ামী লীগের অন্যতম বড় ভুল শাকের পাতায় লুকিয়ে থাকা প্রোটিন, খাদ্য জগতে নতুন সম্ভাবনার নাম রুবিসকো

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-৩৮)

  • Sarakhon Report
  • ১১:০৩:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৪
  • 108

রাঙাছুটুর বাপের বাড়ি

ধড়মড় করিয়া উঠিয়া যাই। ও-কোণের বারান্দা হইতে বাঁশের বড় কোটাটি লই। তারপর প্রথমে যাই নাভিওয়ালা আমগাছতলায়। সেখানে কত আম পড়িয়া আছে-একটা, দুইটা, তিনটা আরও-আরও আরও। কুড়াইয়া কুড়াইয়া সাজি ভরি। তারপর বর্ণচোরা আমের গাছতলায়। গাছে আম পাকিয়া আছে। কিন্তু চিনিবার জো নাই। পাকিয়া লালও হয় না, তলায়ও পড়ে না। গাছে উঠিয়া টিপিয়া টিপিয়া পাড়িতে হয়। গেদা ভালো গাছে উঠিতে পারে। আমি তলায় ঘুরিয়া ঘুরিয়া আম কুড়াই। তারপর চিনিচম্পা গাছের আম। একেবারে চিনির মতো মিষ্টি। আর এমন রং। সেখান হইতে ছুটিয়া যাই সিঁদুরে-আম গাছের তলায়। এত উপরে উঠিয়াছে গাছটি যেন আকাশ ছুঁইবে। চারিধার হইতে বেতের কাঁটাতলায় জঙ্গল হইয়া আছে এর তলা।
বেতের গাছ সরাইয়া সরাইয়া গাছের নিচে যাই। পাখিতে আধেক-খাওয়া দুই-তিনটা আম কুড়াইয়া পাই। কিন্তু গাছে উঠিবে কে? আগডালে সুন্দর সুন্দর সিঁদুরে-আম ঝুলিতেছে। গেদা এত বড় গাছেও উঠিতে পারে, কিন্তু গাছ ভরিয়া বাসা করিয়া আছে লাল পিঁপড়া। কে যাইবে এই গাছে। আমাদের হাতের ঢিল অতদূরে যায় না। নানির লম্বা বাঁশের হস্কাটা লইয়া আসি। হস্কার আগায় কোটা বাঁধিয়া দুইজনে গাছের উপরের ডালে আটকাইয়া ঝাঁকি দেই। রাশি রাশি আম আসিয়া তলায় পড়ে-দুই-একটা গাছে আসিয়াও লাগে। কিন্তু কে তখন তাহা লক্ষ করে। ওই একটা-ওই একটা, কুড়াইয়া কুড়াইয়া সাধ মেটে না। ধামা ভরিয়া আম কুড়াইয়া বাড়ি ফিরি। নানি বলেন, “আমার ভাই আসিয়াছে বলিয়াই তো এত আম পাইলাম।”
কিন্তু এত আম কে খাইবে? সকলের বাড়িতেই গাছ-ভরা আম। হাটে-বাজারে কেউ বড় আম কিনিতে আসে না। ফরিদপুরের হাট সেই কত দূরে। যাইতে এক দুপুর লাগে। দিন যাইয়া দিন ফিরিয়া আসা যায়। সেখানে বেশি দামে আম বিক্রি হয়। কিন্তু ভালো রাস্তাঘাট নাই বলিয়া কে লইয়া যাইবে মাথায় করিয়া অত দূরের পথে।
নানিকে আমরা বড়-বু বলিয়া ডাকিতাম। আমার ভাইদের মধ্যে কে তাঁহাকে বড়-বু বলিয়া প্রথম ডাকিয়াছিল জানি না। আমার বোনদের ছেলেমেয়ে হইলে মা তাহাদের শিখাইয়া দিতেন, আমাকে বড়-বু বলিয়া ডাকিস। কিন্তু তাহারা মাকে নানি বলিয়াই ডাকিত। মা হয়তো তাঁর মায়ের প্রতি আমাদের বড়-বু ডাকটির অধিকারিণী হইতে চাহিয়াছিলেন।
বড়-বু আমাদের কুড়ানো সমস্ত আমের গোলা করিয়া কুলার উপর, ডালার উপর শুখাইতে দিতেন। সমস্ত উঠানটা নকশায় নকশায় ভরিয়া যাইত, বং-বেরঙের আমসত্ত্বে। সেই আমসত্ত্ব নানি আমাদের তো দিতেনই, বাকিটা যত্ন করিয়া হাঁড়িতে ভরিয়া রাখিতেন। আমরা আমাদের বাড়ি গোবিন্দপুরে আসিলে নানা আমাদিগকে দেখিতে আসিবার সময় সেই আমসত্ত্ব সঙ্গে লইয়া আসিতেন। আমরা যখন তাহা কাড়াকাড়ি করিয়া খাইতাম তখন তৃপ্তির খুশিতে বৃদ্ধের মুখখানি ভরিয়া উঠিত। বাড়ি ফিরিয়া হয়তো তিনি আরও জৌলুস করিয়া এইসব কথা নানিকে বলিতেন।

চলবে…

জনপ্রিয় সংবাদ

দুর্নীতি শুধু ঘুষ নয়: নীরবতা, গাফিলতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তৃত বাস্তবতা

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-৩৮)

১১:০৩:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৪

রাঙাছুটুর বাপের বাড়ি

ধড়মড় করিয়া উঠিয়া যাই। ও-কোণের বারান্দা হইতে বাঁশের বড় কোটাটি লই। তারপর প্রথমে যাই নাভিওয়ালা আমগাছতলায়। সেখানে কত আম পড়িয়া আছে-একটা, দুইটা, তিনটা আরও-আরও আরও। কুড়াইয়া কুড়াইয়া সাজি ভরি। তারপর বর্ণচোরা আমের গাছতলায়। গাছে আম পাকিয়া আছে। কিন্তু চিনিবার জো নাই। পাকিয়া লালও হয় না, তলায়ও পড়ে না। গাছে উঠিয়া টিপিয়া টিপিয়া পাড়িতে হয়। গেদা ভালো গাছে উঠিতে পারে। আমি তলায় ঘুরিয়া ঘুরিয়া আম কুড়াই। তারপর চিনিচম্পা গাছের আম। একেবারে চিনির মতো মিষ্টি। আর এমন রং। সেখান হইতে ছুটিয়া যাই সিঁদুরে-আম গাছের তলায়। এত উপরে উঠিয়াছে গাছটি যেন আকাশ ছুঁইবে। চারিধার হইতে বেতের কাঁটাতলায় জঙ্গল হইয়া আছে এর তলা।
বেতের গাছ সরাইয়া সরাইয়া গাছের নিচে যাই। পাখিতে আধেক-খাওয়া দুই-তিনটা আম কুড়াইয়া পাই। কিন্তু গাছে উঠিবে কে? আগডালে সুন্দর সুন্দর সিঁদুরে-আম ঝুলিতেছে। গেদা এত বড় গাছেও উঠিতে পারে, কিন্তু গাছ ভরিয়া বাসা করিয়া আছে লাল পিঁপড়া। কে যাইবে এই গাছে। আমাদের হাতের ঢিল অতদূরে যায় না। নানির লম্বা বাঁশের হস্কাটা লইয়া আসি। হস্কার আগায় কোটা বাঁধিয়া দুইজনে গাছের উপরের ডালে আটকাইয়া ঝাঁকি দেই। রাশি রাশি আম আসিয়া তলায় পড়ে-দুই-একটা গাছে আসিয়াও লাগে। কিন্তু কে তখন তাহা লক্ষ করে। ওই একটা-ওই একটা, কুড়াইয়া কুড়াইয়া সাধ মেটে না। ধামা ভরিয়া আম কুড়াইয়া বাড়ি ফিরি। নানি বলেন, “আমার ভাই আসিয়াছে বলিয়াই তো এত আম পাইলাম।”
কিন্তু এত আম কে খাইবে? সকলের বাড়িতেই গাছ-ভরা আম। হাটে-বাজারে কেউ বড় আম কিনিতে আসে না। ফরিদপুরের হাট সেই কত দূরে। যাইতে এক দুপুর লাগে। দিন যাইয়া দিন ফিরিয়া আসা যায়। সেখানে বেশি দামে আম বিক্রি হয়। কিন্তু ভালো রাস্তাঘাট নাই বলিয়া কে লইয়া যাইবে মাথায় করিয়া অত দূরের পথে।
নানিকে আমরা বড়-বু বলিয়া ডাকিতাম। আমার ভাইদের মধ্যে কে তাঁহাকে বড়-বু বলিয়া প্রথম ডাকিয়াছিল জানি না। আমার বোনদের ছেলেমেয়ে হইলে মা তাহাদের শিখাইয়া দিতেন, আমাকে বড়-বু বলিয়া ডাকিস। কিন্তু তাহারা মাকে নানি বলিয়াই ডাকিত। মা হয়তো তাঁর মায়ের প্রতি আমাদের বড়-বু ডাকটির অধিকারিণী হইতে চাহিয়াছিলেন।
বড়-বু আমাদের কুড়ানো সমস্ত আমের গোলা করিয়া কুলার উপর, ডালার উপর শুখাইতে দিতেন। সমস্ত উঠানটা নকশায় নকশায় ভরিয়া যাইত, বং-বেরঙের আমসত্ত্বে। সেই আমসত্ত্ব নানি আমাদের তো দিতেনই, বাকিটা যত্ন করিয়া হাঁড়িতে ভরিয়া রাখিতেন। আমরা আমাদের বাড়ি গোবিন্দপুরে আসিলে নানা আমাদিগকে দেখিতে আসিবার সময় সেই আমসত্ত্ব সঙ্গে লইয়া আসিতেন। আমরা যখন তাহা কাড়াকাড়ি করিয়া খাইতাম তখন তৃপ্তির খুশিতে বৃদ্ধের মুখখানি ভরিয়া উঠিত। বাড়ি ফিরিয়া হয়তো তিনি আরও জৌলুস করিয়া এইসব কথা নানিকে বলিতেন।

চলবে…