১২:৪৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬
চীনের টেলিকম খাতে বিনিয়োগ কমছে, চাপে জেডটিই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে শ্রীলঙ্কায় বিদ্যুতের দাম প্রায় ৪০% বৃদ্ধি, আরও বাড়ার আশঙ্কা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম ৪ ডলার ছাড়াল, চাপে ভোক্তা অর্থনীতি ইউরোপের ‘গানস বনাম বাটার’ সংকট তীব্রতর, ইরান যুদ্ধ নতুন চাপ তৈরি করেছে জ্বালানি সংকটে আবারও ‘কমিউনিটি প্যান্ট্রি’ আন্দোলন বাংলার ভোটার তালিকা থেকে মীর জাফরের ৩৪৬ বংশধর বাদ, নির্বাচনে অংশগ্রহণ অনিশ্চিত ফের ঊর্ধ্বমুখী সোনার বাজার: ভরিতে বাড়ল ৩,২৬৬ টাকা, ২২ ক্যারেট এখন ২,৪৪,৭১১ টাকা জ্বালানি সংকটে স্কুলে হাইব্রিড ক্লাস চালুর পরিকল্পনা, ষষ্ঠ দিনও বিবেচনায়: শিক্ষামন্ত্রী আজ মধ্যরাতেই শেষ হচ্ছে অনলাইন আয়কর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ ইস্টার সানডেতে সরকারি ছুটির দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-৫১)

  • Sarakhon Report
  • ১১:০০:০৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৪
  • 107

রাঙাছুটুর বাপের বাড়ি

নানা বলিলেন, “মা! তোমার ঘর-সংসারের কাজ তাড়াতাড়ি সারিয়া আমার কাছে আসিয়া বস! আমার যেন কেমন ভয় ভয় করিতেছে।”

মা সমস্ত কাজ ফেলিয়া নানার কাছে আসিয়া বসিয়া রহিলেন। সন্ধ্যা হয়-হয়, নানা বলিলেন, “মা! তুমি ভয় করিও না। আমার যেন চিৎকার করিয়া ডাক ছাড়িতে ইচ্ছা হইতেছে।” মা নানাকে জড়াইয়া ধরিলেন। নানা বলিলেন, “মারে। বাপের বাড়ির সমস্ত মায়া মহব্বৎ সঙ্গে লইয়া আমি চলিয়া যাইতেছি। সেদেশে যাইয়া যে কিছুদিন বুক জুড়াইবি তার কোনো ব্যবস্থাই আমি করিয়া যাইতে পারিলাম না।” আমার পিতা সামনে বসা ছিলেন। কাছে ডাকিয়া বলিলেন, “আমি মরিয়া গেলে আমার রাঙাছুটুর খবর লইতে আর কেহ তাম্বুলখানা হইতে আসিবে না। আমার বিষয়-সম্পত্তি সবই তোমরা পাইবে। তাই দিয়া আমার রাঙাছুটুকে যত্নে রাখিও। ও আমাদের বড় আদরের মেয়ে।”

আরও যেন কি বলিতে চাহিয়াছিলেন। কিন্তু আর বলিতে পারিলেন না। কেমন একটা মুখভঙ্গি করিয়া নানা চির-নীরব হইলেন। আমার মায়ের বুকফাটা কান্নায় আকাশ-বাতাস ধ্বনিত মথিত হইয়া উঠিল। “আর তো বাজান রাঙায়ুটুর খবর লইতে সেই তাম্বুলখানা হইতে গোবিন্দপুর আসিবেন না। আর তো চাদরের খোটে তিলের-পাটালি লইয়া আমার আদরের বাগ রাঙায়ুটুর খোঁজ লইবেন না। ও বাজান। বলিয়া যান, একধামা ধান বেশি দিয়া কার খবর লইতে আবার আমি ভিখারিকে তাম্বুলখানা পাঠাইব।”

আমাদের কুলগাছতলায় যেখানে আমার বড়বোন বস্তুকে কবর দেওয়া হইয়াছিল তারই একপাশে নানাকে কবর দেওয়া হইল। বড়ুকে নানা বড়ই ভালোবাসিতেন। মরিয়া তাঁর আদরের নাতনিকে তিনি ফিরিয়া পাইবেন কি না কে জানে।

প্রতিদিন শেষরাত্রে উঠিয়া মা কাঁদিতে বসিতেন। মায়ের কান্নায় আমাদের ঘুম ভাঙিয়া যাইত। আমার যেন কেমন অসোয়াস্তি বোধ হইত। বাজান মাকে বকিতেন। মা কিন্তু তা গ্রাহ্য করিতেন না।

সকল দুঃখেরই শেষ হয়। কিন্তু তাহার দাগ অন্তর হইতে মোছে না। সেই দাগ বুকে আঁকিয়া মাকে আবার ঘর-সংসারের কাজ দেখিতে হইল। পরবর্তীকালে মা তাঁর কোনো অন্তরঙ্গ লোক পাইলে নানার মৃত্যুকাহিনী অতি করুণ করিয়া বিনাইয়া বিনাইয়া বলিতেন। মায়ের বলার সে কি ভঙ্গি। মা যেন কথা বলিতে বলিতে ছবি আঁকিয়া যাইতেন। তারই কিছুটা এখানে লিখিয়া রাখিলাম।

চলবে…

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনের টেলিকম খাতে বিনিয়োগ কমছে, চাপে জেডটিই

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-৫১)

১১:০০:০৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৪

রাঙাছুটুর বাপের বাড়ি

নানা বলিলেন, “মা! তোমার ঘর-সংসারের কাজ তাড়াতাড়ি সারিয়া আমার কাছে আসিয়া বস! আমার যেন কেমন ভয় ভয় করিতেছে।”

মা সমস্ত কাজ ফেলিয়া নানার কাছে আসিয়া বসিয়া রহিলেন। সন্ধ্যা হয়-হয়, নানা বলিলেন, “মা! তুমি ভয় করিও না। আমার যেন চিৎকার করিয়া ডাক ছাড়িতে ইচ্ছা হইতেছে।” মা নানাকে জড়াইয়া ধরিলেন। নানা বলিলেন, “মারে। বাপের বাড়ির সমস্ত মায়া মহব্বৎ সঙ্গে লইয়া আমি চলিয়া যাইতেছি। সেদেশে যাইয়া যে কিছুদিন বুক জুড়াইবি তার কোনো ব্যবস্থাই আমি করিয়া যাইতে পারিলাম না।” আমার পিতা সামনে বসা ছিলেন। কাছে ডাকিয়া বলিলেন, “আমি মরিয়া গেলে আমার রাঙাছুটুর খবর লইতে আর কেহ তাম্বুলখানা হইতে আসিবে না। আমার বিষয়-সম্পত্তি সবই তোমরা পাইবে। তাই দিয়া আমার রাঙাছুটুকে যত্নে রাখিও। ও আমাদের বড় আদরের মেয়ে।”

আরও যেন কি বলিতে চাহিয়াছিলেন। কিন্তু আর বলিতে পারিলেন না। কেমন একটা মুখভঙ্গি করিয়া নানা চির-নীরব হইলেন। আমার মায়ের বুকফাটা কান্নায় আকাশ-বাতাস ধ্বনিত মথিত হইয়া উঠিল। “আর তো বাজান রাঙায়ুটুর খবর লইতে সেই তাম্বুলখানা হইতে গোবিন্দপুর আসিবেন না। আর তো চাদরের খোটে তিলের-পাটালি লইয়া আমার আদরের বাগ রাঙায়ুটুর খোঁজ লইবেন না। ও বাজান। বলিয়া যান, একধামা ধান বেশি দিয়া কার খবর লইতে আবার আমি ভিখারিকে তাম্বুলখানা পাঠাইব।”

আমাদের কুলগাছতলায় যেখানে আমার বড়বোন বস্তুকে কবর দেওয়া হইয়াছিল তারই একপাশে নানাকে কবর দেওয়া হইল। বড়ুকে নানা বড়ই ভালোবাসিতেন। মরিয়া তাঁর আদরের নাতনিকে তিনি ফিরিয়া পাইবেন কি না কে জানে।

প্রতিদিন শেষরাত্রে উঠিয়া মা কাঁদিতে বসিতেন। মায়ের কান্নায় আমাদের ঘুম ভাঙিয়া যাইত। আমার যেন কেমন অসোয়াস্তি বোধ হইত। বাজান মাকে বকিতেন। মা কিন্তু তা গ্রাহ্য করিতেন না।

সকল দুঃখেরই শেষ হয়। কিন্তু তাহার দাগ অন্তর হইতে মোছে না। সেই দাগ বুকে আঁকিয়া মাকে আবার ঘর-সংসারের কাজ দেখিতে হইল। পরবর্তীকালে মা তাঁর কোনো অন্তরঙ্গ লোক পাইলে নানার মৃত্যুকাহিনী অতি করুণ করিয়া বিনাইয়া বিনাইয়া বলিতেন। মায়ের বলার সে কি ভঙ্গি। মা যেন কথা বলিতে বলিতে ছবি আঁকিয়া যাইতেন। তারই কিছুটা এখানে লিখিয়া রাখিলাম।

চলবে…