০৯:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
চীনের পুনর্ব্যবহারযোগ্য ‘শেনলং’ মহাকাশযানের চতুর্থ মিশন কক্ষপথে মাগুরায় ট্রাকের ধাক্কায় পুলিশ সদস্য নিহত ঢাকা-১৪ ও ১৬ আসন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, জানিয়েছে সেনাবাহিনী তারেক রহমানকে ‘কাগুজে বাঘ’ বললেন নাসিরউদ্দিন, ছাত্রদল–যুবদলকে সন্ত্রাসী সংগঠন আখ্যা কৃষিভিত্তিক শিল্পই বদলাতে পারে কৃষকের জীবন: তারেক রহমান পতনের মুখ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে নেদারল্যান্ডসকে হারাল পাকিস্তান ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চাঁদাবাজি বন্ধের আহ্বান বিএনপি প্রার্থীর যাত্রাশিল্পের পথিকৃৎ মিলন কান্তি দে আর নেই বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গ, অনূর্ধ্ব উনিশ সাফে চ্যাম্পিয়ন ভারত বন্ধ ছয় চিনিকল চালুর দাবিতে ৩১ মার্চ শিল্প মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের ঘোষণা

আলমাটিতে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অভিজ্ঞতা

  • Sarakhon Report
  • ১০:০০:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৫
  • 135

সারাক্ষণ রিপোর্ট

কাজাখস্তানের সাংস্কৃতিক রাজধানী আলমাটি এক সময় দেশটির রাজধানী ছিল, ১৯৯৭ সালে রাজধানী স্থানান্তরের আগ পর্যন্ত। যদিও এখন রাজধানী আস্তানা, আলমাটিকে এখনও ‘কাজাখদের আত্মা’র প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তিয়ান শান পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত এই শহরের নামের অর্থ ‘বুনো আপেলের জন্মভূমি’। শহরটি একদিকে ইউরোপীয় রীতিনীতিতে গড়া, অন্যদিকে সোভিয়েত স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের নিদর্শন।

পানফিলোভ পার্ক ও ঐতিহাসিক স্থাপনা

আলমাটির প্রাণকেন্দ্র পানফিলোভ পার্ক। এখানে রয়েছে পুরো কাঠ দিয়ে তৈরি জেঙ্কোভ ক্যাথেড্রাল, যা ১৯০৭ সালে নির্মিত এবং কোনো পেরেক ছাড়া গড়া হয়। পাশাপাশি রয়েছে ১৯৪১ সালে মস্কোর উপকণ্ঠে নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে নিহত ২৮ জন কাজাখ সৈনিকের স্মরণে নির্মিত ‘হিরোজ অব পানফিলোভ’ স্মৃতিস্তম্ভ ও চিরজ্বলন্ত শিখা।

লোকজ সঙ্গীতের ঐতিহ্য ও বাজার সংস্কৃতি

পার্কেই রয়েছে কাজাখ লোকজ বাদ্যযন্ত্রের জাদুঘর, যেখানে দেখা যায় ডোমবরা, কাঠের হার্প, ঘোড়ার খুর ও লোম দিয়ে তৈরি বাদ্যযন্ত্র। এরই ধারাবাহিকতায় আলমাটির গ্রীন বাজার কাজাখ সংস্কৃতির আরেকটি বর্ণিল দিক তুলে ধরে। এখানে শুকনো ফল, বাদাম, ঘোড়ার মাংসের সসেজ, কুমিস (ফারমেন্টেড ঘোড়ির দুধ), এবং স্থানীয় চিজ ‘কুর্ট’ বিক্রি হয়। বাজারে রয়েছে কোরিয়ান খাবারের উপাদানও, যা এখানকার কোরিয়ান অভিবাসী জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।

স্থাপত্যশৈলী ও স্নানঘরের ঐতিহ্য

আলমাটির স্থাপত্যে মঙ্গোল, তুর্কি ও সোভিয়েত প্রভাব স্পষ্ট। কাজাখ সার্কাসের ভবন একটি ইউর্টের মতো, আর আর্মান সিনেমা ভবনের সামনে রয়েছে সোভিয়েত যুগের অলঙ্করণ। শহরের সাবওয়ে মার্বেলের ফ্লোর ও কাজাখ মোটিফে নির্মিত, এবং আরাসান স্নানঘর এখনো জনপ্রিয়। এখানে রয়েছে সনা, টার্কিশ হ্যামাম ও পাতার ঘর্ষণ দিয়ে রক্ত চলাচল বাড়ানোর পদ্ধতি।

ইসলামি ঐতিহ্য ও জাদুঘর

আলমাটি সেন্ট্রাল মসজিদে দেখা যায় কাজাখ ও আরবি স্থাপত্যের মিশ্রণ। এর উচ্চ মিনার ও প্রশস্ত নামাজঘর শহরের এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক নিদর্শন। শহরের সেন্ট্রাল স্টেট মিউজিয়ামে ব্রোঞ্জ যুগ থেকে শুরু করে যাযাবর জীবনযাপন পর্যন্ত কাজাখদের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

ক্যাফে কালচার ও ইউরোপীয় ছোঁয়া

জিবেক ঝলি স্ট্রিটে রয়েছে সজীব ক্যাফে সংস্কৃতি। এখানে ছায়াময় পথে মানুষ হেঁটে বেড়ায়, স্ট্রিট মিউজিশিয়ান অ্যাকর্ডিয়ন বাজায়, আর চারদিকে কফি, আইসক্রিম ও কেক খাওয়ার আয়োজন। নিকটেই সরকারি ভবনটি এখন কাজাখ-ব্রিটিশ টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

খাদ্য ও রন্ধনসংস্কৃতি

আলমাটি এখন একটি রন্ধনশিল্পের গন্তব্য। ঐতিহ্যবাহী খাবারের সঙ্গে রয়েছে উজবেক, কোরিয়ান ও রুশ প্রভাব। ‘বারসাওক’ নামক নরম পাউরুটি, ঘোড়ার মাংসের পদ, ও মাংসভাজা স্যুপ প্রচলিত খাবার। এছাড়াও রয়েছে কোরিয়ান বিবিমবাপ, উইঘুর লাগমান নুডলস ও উজবেক প্লভ।

সোভিয়েত আমলে ধ্বংস হওয়া ওয়াইনশিল্প আবার সক্রিয় হয়েছে। শহরের আরবা ওয়াইনারি রিসলিং, মেরলো ও মালবেকসহ বিভিন্ন ওয়াইন চেখে দেখার সুযোগ দেয়।

অপেরা হাউজ ও রূপকথার প্রতিচ্ছবি

আলমাটির অন্যতম স্থাপনা আবাই অপেরা হাউস, যা গ্রিক ও কাজাখ স্থাপত্যের সংমিশ্রণ। নিকটেই হোটেল আলমাটি, যার দেয়ালে রয়েছে মুরানো কাঁচে তৈরি দুটি দেয়ালচিত্র—একটি ১৯৬৫ সালের কাজাখ রূপকথা, অন্যটি সিল্ক রোডের যাত্রা চিত্রায়িত করে।

প্রকৃতি ও অ্যাডভেঞ্চার

শহরের দক্ষিণে অবস্থিত মেদেউ আউটডোর আইস স্কেটিং রিঙ্ক ও শিমবুলাক স্কি রিসোর্ট আধুনিক গন্ডোলা দিয়ে পর্যটকদের নিয়ে যায় ৩১৮০ মিটার উঁচু তালগার পাস পর্যন্ত। গ্রীষ্মকালেও এই পাহাড়ি অঞ্চলে হাইকিং ও সাইক্লিং জনপ্রিয়।

আশপাশের দর্শনীয় স্থান

দিবা ভ্রমণে চারিন ক্যানিয়নের লাল পাথুরে ভূমি ও বিগ আলমাটি হ্রদের ফিরোজা জলরাশি এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা দেয়। সুনকার বার্ড রিফিউজে সাকার বাজপাখিসহ নানা প্রজাতির পাখির সংরক্ষণ হয়। এই অঞ্চল কাজাখ যাযাবরদের বাজপাখি দিয়ে শিকার সংস্কৃতির অংশ।

হুন্স এথনো ভিলেজ: অতীতের জানালা

শহর থেকে ৪০ কিমি দূরে হুন্স এথনো ভিলেজ নামের সংস্কৃতিক কমপ্লেক্সে দেখানো হয় কাজাখ ঐতিহ্য—বুনন, ইউর্টবাস, ঘোড়সওয়ারি, লোকনৃত্য, পোশাক ও খাবার। এটি দর্শনার্থীদের ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ দেয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনের পুনর্ব্যবহারযোগ্য ‘শেনলং’ মহাকাশযানের চতুর্থ মিশন কক্ষপথে

আলমাটিতে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অভিজ্ঞতা

১০:০০:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৫

সারাক্ষণ রিপোর্ট

কাজাখস্তানের সাংস্কৃতিক রাজধানী আলমাটি এক সময় দেশটির রাজধানী ছিল, ১৯৯৭ সালে রাজধানী স্থানান্তরের আগ পর্যন্ত। যদিও এখন রাজধানী আস্তানা, আলমাটিকে এখনও ‘কাজাখদের আত্মা’র প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তিয়ান শান পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত এই শহরের নামের অর্থ ‘বুনো আপেলের জন্মভূমি’। শহরটি একদিকে ইউরোপীয় রীতিনীতিতে গড়া, অন্যদিকে সোভিয়েত স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের নিদর্শন।

পানফিলোভ পার্ক ও ঐতিহাসিক স্থাপনা

আলমাটির প্রাণকেন্দ্র পানফিলোভ পার্ক। এখানে রয়েছে পুরো কাঠ দিয়ে তৈরি জেঙ্কোভ ক্যাথেড্রাল, যা ১৯০৭ সালে নির্মিত এবং কোনো পেরেক ছাড়া গড়া হয়। পাশাপাশি রয়েছে ১৯৪১ সালে মস্কোর উপকণ্ঠে নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে নিহত ২৮ জন কাজাখ সৈনিকের স্মরণে নির্মিত ‘হিরোজ অব পানফিলোভ’ স্মৃতিস্তম্ভ ও চিরজ্বলন্ত শিখা।

লোকজ সঙ্গীতের ঐতিহ্য ও বাজার সংস্কৃতি

পার্কেই রয়েছে কাজাখ লোকজ বাদ্যযন্ত্রের জাদুঘর, যেখানে দেখা যায় ডোমবরা, কাঠের হার্প, ঘোড়ার খুর ও লোম দিয়ে তৈরি বাদ্যযন্ত্র। এরই ধারাবাহিকতায় আলমাটির গ্রীন বাজার কাজাখ সংস্কৃতির আরেকটি বর্ণিল দিক তুলে ধরে। এখানে শুকনো ফল, বাদাম, ঘোড়ার মাংসের সসেজ, কুমিস (ফারমেন্টেড ঘোড়ির দুধ), এবং স্থানীয় চিজ ‘কুর্ট’ বিক্রি হয়। বাজারে রয়েছে কোরিয়ান খাবারের উপাদানও, যা এখানকার কোরিয়ান অভিবাসী জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।

স্থাপত্যশৈলী ও স্নানঘরের ঐতিহ্য

আলমাটির স্থাপত্যে মঙ্গোল, তুর্কি ও সোভিয়েত প্রভাব স্পষ্ট। কাজাখ সার্কাসের ভবন একটি ইউর্টের মতো, আর আর্মান সিনেমা ভবনের সামনে রয়েছে সোভিয়েত যুগের অলঙ্করণ। শহরের সাবওয়ে মার্বেলের ফ্লোর ও কাজাখ মোটিফে নির্মিত, এবং আরাসান স্নানঘর এখনো জনপ্রিয়। এখানে রয়েছে সনা, টার্কিশ হ্যামাম ও পাতার ঘর্ষণ দিয়ে রক্ত চলাচল বাড়ানোর পদ্ধতি।

ইসলামি ঐতিহ্য ও জাদুঘর

আলমাটি সেন্ট্রাল মসজিদে দেখা যায় কাজাখ ও আরবি স্থাপত্যের মিশ্রণ। এর উচ্চ মিনার ও প্রশস্ত নামাজঘর শহরের এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক নিদর্শন। শহরের সেন্ট্রাল স্টেট মিউজিয়ামে ব্রোঞ্জ যুগ থেকে শুরু করে যাযাবর জীবনযাপন পর্যন্ত কাজাখদের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

ক্যাফে কালচার ও ইউরোপীয় ছোঁয়া

জিবেক ঝলি স্ট্রিটে রয়েছে সজীব ক্যাফে সংস্কৃতি। এখানে ছায়াময় পথে মানুষ হেঁটে বেড়ায়, স্ট্রিট মিউজিশিয়ান অ্যাকর্ডিয়ন বাজায়, আর চারদিকে কফি, আইসক্রিম ও কেক খাওয়ার আয়োজন। নিকটেই সরকারি ভবনটি এখন কাজাখ-ব্রিটিশ টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

খাদ্য ও রন্ধনসংস্কৃতি

আলমাটি এখন একটি রন্ধনশিল্পের গন্তব্য। ঐতিহ্যবাহী খাবারের সঙ্গে রয়েছে উজবেক, কোরিয়ান ও রুশ প্রভাব। ‘বারসাওক’ নামক নরম পাউরুটি, ঘোড়ার মাংসের পদ, ও মাংসভাজা স্যুপ প্রচলিত খাবার। এছাড়াও রয়েছে কোরিয়ান বিবিমবাপ, উইঘুর লাগমান নুডলস ও উজবেক প্লভ।

সোভিয়েত আমলে ধ্বংস হওয়া ওয়াইনশিল্প আবার সক্রিয় হয়েছে। শহরের আরবা ওয়াইনারি রিসলিং, মেরলো ও মালবেকসহ বিভিন্ন ওয়াইন চেখে দেখার সুযোগ দেয়।

অপেরা হাউজ ও রূপকথার প্রতিচ্ছবি

আলমাটির অন্যতম স্থাপনা আবাই অপেরা হাউস, যা গ্রিক ও কাজাখ স্থাপত্যের সংমিশ্রণ। নিকটেই হোটেল আলমাটি, যার দেয়ালে রয়েছে মুরানো কাঁচে তৈরি দুটি দেয়ালচিত্র—একটি ১৯৬৫ সালের কাজাখ রূপকথা, অন্যটি সিল্ক রোডের যাত্রা চিত্রায়িত করে।

প্রকৃতি ও অ্যাডভেঞ্চার

শহরের দক্ষিণে অবস্থিত মেদেউ আউটডোর আইস স্কেটিং রিঙ্ক ও শিমবুলাক স্কি রিসোর্ট আধুনিক গন্ডোলা দিয়ে পর্যটকদের নিয়ে যায় ৩১৮০ মিটার উঁচু তালগার পাস পর্যন্ত। গ্রীষ্মকালেও এই পাহাড়ি অঞ্চলে হাইকিং ও সাইক্লিং জনপ্রিয়।

আশপাশের দর্শনীয় স্থান

দিবা ভ্রমণে চারিন ক্যানিয়নের লাল পাথুরে ভূমি ও বিগ আলমাটি হ্রদের ফিরোজা জলরাশি এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা দেয়। সুনকার বার্ড রিফিউজে সাকার বাজপাখিসহ নানা প্রজাতির পাখির সংরক্ষণ হয়। এই অঞ্চল কাজাখ যাযাবরদের বাজপাখি দিয়ে শিকার সংস্কৃতির অংশ।

হুন্স এথনো ভিলেজ: অতীতের জানালা

শহর থেকে ৪০ কিমি দূরে হুন্স এথনো ভিলেজ নামের সংস্কৃতিক কমপ্লেক্সে দেখানো হয় কাজাখ ঐতিহ্য—বুনন, ইউর্টবাস, ঘোড়সওয়ারি, লোকনৃত্য, পোশাক ও খাবার। এটি দর্শনার্থীদের ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ দেয়।