০৭:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
ট্রাম্প-মাস্কের ভাঙা সম্পর্ক আবার জোড়া লাগল, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য ১০ কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা গ্যাসের সংকটে রূপগঞ্জে থমকে শিল্পের চাকা, বাড়ছে লোকসান ও কর্মসংস্থান নিয়ে শঙ্কা পাম্পে ত্রুটি, বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের এক ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু: এক মাস আগেই নিরাপত্তা লঙ্ঘনে আইনি ব্যবস্থা হয়েছিল জাহাজভাঙা ইয়ার্ডের বিরুদ্ধে ২৫০ দিনেরও বেশি সমুদ্রে মার্কিন রণতরী, খাবার-পানি ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ মীর রাজা আলী হত্যাকাণ্ডে নতুন মোড়, স্মার্টঘড়ির ফরেনসিক নিয়ে পরিবারের আপত্তি পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন, ফিলিস্তিনি বাড়ি ঘিরে সহিংসতা তীব্র ব্রড পিকে নিখোঁজ পাকিস্তানি পর্বতারোহী সোহাইল সাখির মরদেহ উদ্ধার ইরানের ওপর অনির্দিষ্টকাল নৌ অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছর: পড়াশোনা, বন্ধুত্ব আর আনন্দের ভারসাম্য কীভাবে রাখবেন

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-২১৯)

  • Sarakhon Report
  • ১১:০০:০৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৫
  • 254

দীনেশচন্দ্র

দীনেশবাবু বলিলেন, “সবুর কর। আমি পুস্তকের উপর যে বিস্তৃত সমালোচনা লিখব তা পড়ে অনেকেই এই পুস্তকের আদর করবে।” ইহার পর দীনেশবাবু নক্সীকাঁথার মাঠের উপর ৮/৯ পৃষ্ঠাব্যাপী এক বিস্তৃত সমালোচনা প্রকাশ করিলেন। এই সমালোচনা প্রকাশের পর বই বিক্রয় হইতে লাগিল। কোনো কোনো দিন চল্লিশ-পঞ্চাশখানা বই-এরও অর্ডার আসিতে লাগিল।

‘নক্সীকাঁথার মাঠ’ প্রকাশে আরও অনেক সহৃদয় ব্যক্তি আমাকে নানা দিক দিয়া সাহায্য করিয়াছেন। আজ শুধু দীনেশবাবুর কথাই বলিতেছি। সেই জন্য তাঁদের কথা উল্লেখ করিলাম না। আমার ‘সোজনবাদিয়ার ঘাট’ পুস্তকের পাণ্ডুলিপি পড়িয়া তিনি এক সুদীর্ঘ সমালোচনা লিখিয়াছিলেন। সাহিত্য-সেবক সংঘের এক সভায় তিনি সেই প্রবন্ধ পাঠও করিয়াছিলেন। তাহার এক স্থানে তিনি লিখিয়াছিলেন, “আমি হিন্দু। আমার নিকট বেদ পবিত্র, গীতা পবিত্র, কিন্তু সোজনবাদিয়ার ঘাট পুস্তক তাহার চাইতেও পবিত্র। কারণ ইহাতে আমার বাঙলা দেশের মাটির মানুষগুলির কথা আছে। আমার গ্রামগুলির বর্ণনা আছে…” দীনেশবাবু এইভাবে জীবনের নানা ক্ষেত্রে একটা অবস্থা হইতে আর একটা অবস্থায়

আমাকে তুলিয়া ধরিয়াছেন। তিনি নিজে খুব দরিদ্র অবস্থার সহিত সংগ্রাম করিয়া আপনাকে জীবন-ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। সেইজন্য কোনো দুস্থ ব্যক্তি তাঁহার দ্বারস্থ হইলে তিনি তাহাকে সাহায্য করিবার জন্য পাগল হইয়া উঠিতেন।

দীনেশবাবু তখন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষার কর্ণধার। বাংলা বিভাগের ছাত্রদের মধ্যে একটি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা হইল। আমিও এই প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় যোগদান করিয়াছিলাম। প্রবন্ধগুলি পড়িয়া দীনেশবাবু আমার সম্মুখেই খাতাগুলির উপরে নম্বর দিলেন। তাহাতে তিনজনের খাতা সব চাইতে ভালো হইয়াছে বলিয়া চিহ্নিত করিলেন। এই তিনজনের মধ্যে আমার নামও ছিল। কিন্তু যখন পরীক্ষার ফল বাহির হইল তখন দেখা গেল অপর একটি ছাত্র এই প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করিল। আমি আশ্চর্য হইলাম। একদিন কথা প্রসঙ্গে দীনেশবাবু বলিলেন, “দেখ, আমার বঙ্গ-সাহিত্যের যে সেবক তার জন্য আমি চুরি করতেও রাজি আছি। অমুক নানা রকম পুঁথি সংগ্রহ করে বেশ কাজ করছিল। সেদিন তার বিছানা, বালিশ, বইপত্র সব চুরি হয়েছে। তাই প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় ওকেই প্রথম পুরস্কার দিলাম। শ’দুই টাকা ও পাবে। তাতে ওর কিছুটা সাহায্য হবে।” এই ছাত্রটি পরবর্তীকালে রিসার্চ-স্কলার হিসাবে বেশ সুনাম অর্জন করিয়াছিলেন।

কলিকাতায় থাকাকালে আমি প্রায়ই দীনেশবাবুর বাড়িতে যাইতাম। যে ঘরখানিতে তিনি বসিতেন, তাহার চারিদিকে বই, খাতা, কলম বিশৃঙ্খলভাবে ছড়ানো থাকিত। তাহারই মাঝখানে বসিয়া তিনি লেখাপড়া করিতেন। লোকজন দেখা করিতে আসিলে চতুর্দিকে বিস্তৃত বইয়ের গাদা সরাইয়া বসিবার জায়গা করিয়া দিতেন। এইভাবে সমস্ত জিনিস অগোছালো করিয়া রাখিতেন বলিয়া প্রতিদিন তাঁহার কোনো না কোনো জিনিস হারাইত। এই হারানো জিনিস খুঁজিতে তাঁহার বহু সময় নষ্ট হইত। একদিন সারাটি সকাল ভরিয়া তিনি তাঁহার চশমা খুঁজিতেছিলেন, তাঁহার নাতি গোপাল তাঁহার সুদীর্ঘ জামার পকেট হইতেই চশমাজোড়া উদ্ধার করিয়া দিল। সেবার তিনি খুব দুঃখ করিয়া আমাকে বলিতেছিলেন, “হারানো জিনিস খুঁজতে আমার যে সময় নষ্ট হয় সেই সময় যদি আমার অপব্যয় না হত তবে আমি যা লিখেছি তার ডবলসংখ্যক পুস্তক লিখতে পারতাম।”

 

চলবে…..

জনপ্রিয় সংবাদ

ট্রাম্প-মাস্কের ভাঙা সম্পর্ক আবার জোড়া লাগল, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য ১০ কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-২১৯)

১১:০০:০৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৫

দীনেশচন্দ্র

দীনেশবাবু বলিলেন, “সবুর কর। আমি পুস্তকের উপর যে বিস্তৃত সমালোচনা লিখব তা পড়ে অনেকেই এই পুস্তকের আদর করবে।” ইহার পর দীনেশবাবু নক্সীকাঁথার মাঠের উপর ৮/৯ পৃষ্ঠাব্যাপী এক বিস্তৃত সমালোচনা প্রকাশ করিলেন। এই সমালোচনা প্রকাশের পর বই বিক্রয় হইতে লাগিল। কোনো কোনো দিন চল্লিশ-পঞ্চাশখানা বই-এরও অর্ডার আসিতে লাগিল।

‘নক্সীকাঁথার মাঠ’ প্রকাশে আরও অনেক সহৃদয় ব্যক্তি আমাকে নানা দিক দিয়া সাহায্য করিয়াছেন। আজ শুধু দীনেশবাবুর কথাই বলিতেছি। সেই জন্য তাঁদের কথা উল্লেখ করিলাম না। আমার ‘সোজনবাদিয়ার ঘাট’ পুস্তকের পাণ্ডুলিপি পড়িয়া তিনি এক সুদীর্ঘ সমালোচনা লিখিয়াছিলেন। সাহিত্য-সেবক সংঘের এক সভায় তিনি সেই প্রবন্ধ পাঠও করিয়াছিলেন। তাহার এক স্থানে তিনি লিখিয়াছিলেন, “আমি হিন্দু। আমার নিকট বেদ পবিত্র, গীতা পবিত্র, কিন্তু সোজনবাদিয়ার ঘাট পুস্তক তাহার চাইতেও পবিত্র। কারণ ইহাতে আমার বাঙলা দেশের মাটির মানুষগুলির কথা আছে। আমার গ্রামগুলির বর্ণনা আছে…” দীনেশবাবু এইভাবে জীবনের নানা ক্ষেত্রে একটা অবস্থা হইতে আর একটা অবস্থায়

আমাকে তুলিয়া ধরিয়াছেন। তিনি নিজে খুব দরিদ্র অবস্থার সহিত সংগ্রাম করিয়া আপনাকে জীবন-ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। সেইজন্য কোনো দুস্থ ব্যক্তি তাঁহার দ্বারস্থ হইলে তিনি তাহাকে সাহায্য করিবার জন্য পাগল হইয়া উঠিতেন।

দীনেশবাবু তখন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষার কর্ণধার। বাংলা বিভাগের ছাত্রদের মধ্যে একটি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা হইল। আমিও এই প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় যোগদান করিয়াছিলাম। প্রবন্ধগুলি পড়িয়া দীনেশবাবু আমার সম্মুখেই খাতাগুলির উপরে নম্বর দিলেন। তাহাতে তিনজনের খাতা সব চাইতে ভালো হইয়াছে বলিয়া চিহ্নিত করিলেন। এই তিনজনের মধ্যে আমার নামও ছিল। কিন্তু যখন পরীক্ষার ফল বাহির হইল তখন দেখা গেল অপর একটি ছাত্র এই প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করিল। আমি আশ্চর্য হইলাম। একদিন কথা প্রসঙ্গে দীনেশবাবু বলিলেন, “দেখ, আমার বঙ্গ-সাহিত্যের যে সেবক তার জন্য আমি চুরি করতেও রাজি আছি। অমুক নানা রকম পুঁথি সংগ্রহ করে বেশ কাজ করছিল। সেদিন তার বিছানা, বালিশ, বইপত্র সব চুরি হয়েছে। তাই প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় ওকেই প্রথম পুরস্কার দিলাম। শ’দুই টাকা ও পাবে। তাতে ওর কিছুটা সাহায্য হবে।” এই ছাত্রটি পরবর্তীকালে রিসার্চ-স্কলার হিসাবে বেশ সুনাম অর্জন করিয়াছিলেন।

কলিকাতায় থাকাকালে আমি প্রায়ই দীনেশবাবুর বাড়িতে যাইতাম। যে ঘরখানিতে তিনি বসিতেন, তাহার চারিদিকে বই, খাতা, কলম বিশৃঙ্খলভাবে ছড়ানো থাকিত। তাহারই মাঝখানে বসিয়া তিনি লেখাপড়া করিতেন। লোকজন দেখা করিতে আসিলে চতুর্দিকে বিস্তৃত বইয়ের গাদা সরাইয়া বসিবার জায়গা করিয়া দিতেন। এইভাবে সমস্ত জিনিস অগোছালো করিয়া রাখিতেন বলিয়া প্রতিদিন তাঁহার কোনো না কোনো জিনিস হারাইত। এই হারানো জিনিস খুঁজিতে তাঁহার বহু সময় নষ্ট হইত। একদিন সারাটি সকাল ভরিয়া তিনি তাঁহার চশমা খুঁজিতেছিলেন, তাঁহার নাতি গোপাল তাঁহার সুদীর্ঘ জামার পকেট হইতেই চশমাজোড়া উদ্ধার করিয়া দিল। সেবার তিনি খুব দুঃখ করিয়া আমাকে বলিতেছিলেন, “হারানো জিনিস খুঁজতে আমার যে সময় নষ্ট হয় সেই সময় যদি আমার অপব্যয় না হত তবে আমি যা লিখেছি তার ডবলসংখ্যক পুস্তক লিখতে পারতাম।”

 

চলবে…..