রপ্তানিতে ধাক্কা, অনিশ্চয়তায় শিল্প
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় রপ্তানির ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপে দেশটির সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান নির্ভর খাত—টেক্সটাইল, রত্ন ও গহনা এবং ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য—চরম সংকটে পড়তে যাচ্ছে। উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের আশঙ্কা, বছরের শেষ নাগাদ রাজস্ব হ্রাস ও ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণে শিল্পের ভিত নড়ে যেতে পারে।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে চমকে গেছেন ব্যবসায়ীরা
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত “শুল্ক যুদ্ধ” এতোদিন কেবল পর্যবেক্ষণ করছিলেন ভারতীয় রপ্তানিকারকরা। কিন্তু বাস্তবায়নের পর তারা ভেঙে পড়েছেন। টেক্সটাইল রপ্তানিকারক হর্ষ মুখুন্দ সাউন্দরারাজন জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ২৫ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করেছে। এর সঙ্গে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি নিষিদ্ধ হওয়ায় আরও ২৫ শতাংশ বাড়তি শুল্ক কার্যকর হবে ২৭ আগস্ট থেকে।
“আমার সব মার্কিন ক্রেতা কার্যত অচল হয়ে গেছেন—অর্ডার বন্ধ বা বাতিল করছেন। কোম্পানি ক্লোভস যুক্তরাষ্ট্রে মোট উৎপাদনের ৬৫ শতাংশ রপ্তানি করত, সেটি এখন ঝুঁকির মুখে,” বললেন তিনি।
ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও শ্রমিক
ক্রিসিল ইন্টেলিজেন্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের মোট রপ্তানির ২৫ শতাংশই আসে টেক্সটাইল, রত্ন ও গহনা থেকে। এ খাতের বেশির ভাগ রপ্তানি নির্ভর করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর, যাদের জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে বিপজ্জনক।
২০২৪ সালে ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৪.৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি হয়েছিল, যা ভারতের মোট পোশাক রপ্তানির এক-তৃতীয়াংশ। শুধু টেক্সটাইল খাতেই প্রায় ৪৫ মিলিয়ন কর্মী যুক্ত, যাদের বেশির ভাগই নারী।
“করোনার সময়ও হয়নি এমন পরিস্থিতি”
কোইম্বাতুরের উদ্যোক্তা ভেল্লালুর অরুমুগাম থিরুমাগল বলেন, “যদি ৫০ শতাংশ শুল্ক দীর্ঘদিন বহাল থাকে তবে বাধ্য হয়ে কর্মী ছাঁটাই করতে হবে। করোনার সময়ও এমনটা হয়নি।”
শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞ ঋতুপর্ণা চক্রবর্তী সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “দক্ষ শ্রমিকদের প্রতিস্থাপন সহজ নয়। শুল্ক দীর্ঘস্থায়ী হলে এক-দুই বছরের মধ্যে চাকরি হারানো শুরু হবে।”
শ্রমিকদের হতাশা ও অনিশ্চয়তা
বেঙ্গালুরুর দর্জি মেহরুন্নিসা জানান, তিনি গত ১৫ বছর ধরে অন্তত ১৫টি পোশাক কারখানায় কাজ করেছেন। সীমিত আয়ে পরিবার চালিয়েছেন। কিন্তু আজ তার প্রশ্ন—“যদি গোটা টেক্সটাইল খাত ডুবে যায়, তাহলে আমি কোথায় যাব?”
ইউনিয়নের সতর্কবার্তা
শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা বলছেন, প্রভাব পড়বে কেবল পোশাক কারখানায় নয়—রংকারখানা, কাপড় উৎপাদক, প্যাকেজিং, পরিবহন, তুলা চাষি ও তাঁতিদের ওপরও। তামিলনাডুর গার্মেন্টস ইউনিয়নের সভাপতি সুজাতা মদী জানান, “দীর্ঘদিন ধরে মজুরি স্থবির। এখন অর্ডার কমে গেলে উদ্যোক্তারা প্রথমেই শ্রম ব্যয় কমাবেন।”
প্রতিযোগীদের সুযোগ
শুল্ক সংকটে ভারতের প্রতিযোগী দেশগুলো লাভবান হচ্ছে। বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও জাপান ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কে ছাড় পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের জন্য শুল্ক নামানো হয়েছে ২০ শতাংশে। ফলে ভারত হারানো বাজারের বড় অংশ এ দেশগুলো দখল করতে পারে।
টিকে থাকার লড়াই
সংকট মোকাবেলায় ভারতীয় উদ্যোক্তারা বিকল্প কৌশল খুঁজছেন।
হর্ষ সাউন্দরারাজন মেক্সিকোতে উৎপাদন ইউনিট স্থানান্তরের চিন্তা করছেন, যাতে পরিবহন ব্যয় কমে।
থিরুমাগল ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা করছেন, পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে নিজস্ব ব্র্যান্ড চালুর উদ্যোগ নিচ্ছেন।
গোকুলদাস এক্সপোর্টস ইতিমধ্যেই কেনিয়া ও ইথিওপিয়ায় কারখানা স্থাপন করেছে, যেখানে মাত্র ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপিত।
সরকারের দিকে তাকিয়ে শিল্প
উদ্যোক্তারা আশা করছেন, ভারত সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় সমঝোতায় পৌঁছাবে। পাশাপাশি, সম্প্রতি ব্রিটেনের সঙ্গে হওয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দাবি করছে, রাষ্ট্রীয় ও কেন্দ্রীয় সরকার যেন বিদ্যুৎ ও পানির খরচ কমায়, ব্যাংক ঋণে ভর্তুকি দেয় এবং কিছু কর মওকুফ করে।
ভারতের টেক্সটাইল ও রপ্তানি নির্ভর শিল্পের জন্য মার্কিন শুল্ক এখন এক ভয়াবহ হুমকি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে লাখ লাখ শ্রমিক পর্যন্ত সবাই অনিশ্চয়তার মধ্যে। যদি দ্রুত সমঝোতা না হয় বা বিকল্প বাজার না পাওয়া যায়, তবে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ভারতের বৃহত্তম কর্মসংস্থান নির্ভর খাত ভয়াবহ সংকটে পড়তে পারে।
মার্কিন শুল্কে বিপদে ভারতের টেক্সটাইল খাত
-
সারাক্ষণ রিপোর্ট - ০৩:০৪:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৫
- 90
জনপ্রিয় সংবাদ




















