০৮:৫৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি জেন জি-র ‘ফ্রেন্ডস’ বানানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু কেন তা অসম্ভব সঙ্কুচিত পোশাক কি নষ্ট না করেই আগের মাপে ফেরানো সম্ভব? ডায়মন্ড লিগের ফাইনালে তৃতীয় অ্যামি হান্ট, দুর্দান্ত ছন্দে ছুটছেন ব্রিটিশ তারকা মারাঠি না জানলে ঝুঁকিতে লাইসেন্স, মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মিলল আরও এক বছর বয়স বাড়লেই জীবন থেমে যায় না, বরং আসে নিজের মতো বাঁচার স্বাধীনতা: প্রু লেইথ দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে আহত, ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন নিউইয়র্কের যুবক পেন্টাগনের নিয়ন্ত্রণ কি হারাচ্ছেন পিট হেগসেথ? আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন তুলে ধরা মানচিত্রের পক্ষে জাতিসংঘের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সন্তান হত্যার মামলায় রায় হয়নি, লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর্ক

মিয়ানমারের একটি স্মরণীয় দিন

গণতন্ত্রের স্বপ্ন ও বাস্তবতা

৩৫ বছর আগে, ১৯৯০ সালের ২৭ মে, মিয়ানমারের জনগণ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়েছিলেন। তিন দশক পর প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছিলেন। অনেকে ভেবেছিলেন, এই নির্বাচন দেশকে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়নি।

এই নির্বাচনে ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) অং সান সু চির নেতৃত্বে বিপুল বিজয় অর্জন করলেও সামরিক জান্তা ফলাফল মানতে অস্বীকৃতি জানায়। লাখো মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এক নিমেষে ভেঙে যায়।

প্রথম ভোটের অভিজ্ঞতা

সেদিন সকালেই লেখকের পুরো পরিবার ভোটকেন্দ্রে রওনা দেন। রাস্তায় প্রচারকর্মীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ভোট চাইছিলেন। বৃদ্ধা-অসুস্থ মানুষও বাঁশে করে ভোটকেন্দ্রে আনা হচ্ছিল, শুধু “বোগ্যোকের মেয়ের দলকে” ভোট দেওয়ার জন্য। “বোগ্যোক” বলতে বোঝানো হয় অং সানকে, যিনি সু চির পিতা।

সেদিন প্রায় দুই কোটি মানুষ ভোটদানের যোগ্য ছিলেন। এর মধ্যে এক কোটি ৫০ লাখেরও বেশি ভোটার কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। অনেক তরুণের মতো লেখকও প্রথমবার ভোট দিয়ে ভেবেছিলেন, দেশ এবার গণতন্ত্রের পথে হাঁটবে।

বিজয় ও পরাজয়ের বৈপরীত্য

কয়েক দিনের ফলাফলে দেখা যায়, এনএলডি ৮০ শতাংশ ভোট পেয়ে ৪৯২ আসনের সংসদে ৩৯২টি আসন দখল করেছে। সামরিক সমর্থিত ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি মাত্র ১০টি আসনে সীমাবদ্ধ ছিল।

কিন্তু এই জয় ছিল কেবল প্রতীকী। জান্তা ফলাফল উপেক্ষা করে, এনএলডির নির্বাচিত প্রার্থীদের কারাগারে পাঠায় বা নির্বাসিত করে। যেমন সান সান নামে এক নির্বাচিত প্রার্থীকে দুই দফায় দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

ভঙ্গ প্রতিশ্রুতি ও দমননীতি

আইন অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নতুন সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে সংসদ বসানো হয়নি; বরং ব্যাপক গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা ঘটে। অন্তত তিনজন নির্বাচিত এমপি কারাগারে মারা যান। বহুজন আজও নির্বাসিত বা বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন।

অং সান সু চি বারবার গৃহবন্দি হন এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। নির্বাচনের পরবর্তী ১৫ বছরে এনএলডি কার্যত ভেঙে পড়লেও জনগণের প্রত্যাশা বেঁচে ছিল।

আন্তর্জাতিক চাপ ও জান্তার কৌশল

১৯৯৩ সালে সামরিক সরকার তথাকথিত “ন্যাশনাল কনভেনশন” ডেকে নতুন সংবিধানের নামে প্রহসন চালায়। কিন্তু এতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা ছিল নগণ্য। পরবর্তীতে এনএলডি এই প্রক্রিয়া বর্জন করে।

২০০২ সালে সু চি কিছুটা স্বাধীনতা পেলেও ২০০৩ সালে সাগাইং অঞ্চলের দেপাইন এলাকায় তার কনভয়ের ওপর হামলা চালানো হয়, যেখানে তার বহু সমর্থক নিহত হন। আবারও তিনি গ্রেপ্তার হন।

বিভাজন ও হতাশা

সময়ের সাথে সাথে বিরোধী শিবিরের ভেতরেও বিভক্তি তৈরি হয়। তরুণ প্রজন্ম পুরনো নেতৃত্বে আস্থা হারায়। অনেকে মনে করেন, ১৯৯০ সালের নির্বাচন কেবল ইতিহাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু তখনকার ত্যাগ ও রক্তঝরা সংগ্রামের কথা ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।

এক প্রাক্তন ছাত্রনেতা কো কো গি, যিনি দীর্ঘ ১৪ বছর জেল খেটে মুক্তি পান, বলেন—“ক্ষমতা হস্তান্তরের চেয়ে জাতীয় পুনর্মিলন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

দাদীর স্মৃতি ও ভোটের মূল্য

লেখকের দাদী আজও স্পষ্ট মনে করতে পারেন সেদিনের ভোট। তিনি ভোট দিয়েছিলেন “বোগ্যোকের মেয়ের দলে”। কিন্তু যার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন — সেই প্রার্থী সাইন হ্লা উ — আজও কারাগারে আছেন।

লেখক নিজেও কারাবন্দি হয়েছিলেন, তবে পরে মুক্তি পান। তিনি প্রশ্ন করেন, তার ভোট কি সত্যিই সৌভাগ্যের ছিল, নাকি এক অপূর্ণ স্বপ্নের প্রতীক?

১৯৯০ সালের নির্বাচন মিয়ানমারের ইতিহাসে গণতন্ত্রের জন্য এক বিশাল আত্মত্যাগ ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। যদিও জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি, সেই আন্দোলন ও রক্তের দাগ এখনো মুছে যায়নি। আজও সেই দিনের স্মৃতি জনগণের হৃদয়ে অমলিন।

জনপ্রিয় সংবাদ

স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

মিয়ানমারের একটি স্মরণীয় দিন

০৪:১১:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৫

গণতন্ত্রের স্বপ্ন ও বাস্তবতা

৩৫ বছর আগে, ১৯৯০ সালের ২৭ মে, মিয়ানমারের জনগণ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়েছিলেন। তিন দশক পর প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছিলেন। অনেকে ভেবেছিলেন, এই নির্বাচন দেশকে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়নি।

এই নির্বাচনে ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) অং সান সু চির নেতৃত্বে বিপুল বিজয় অর্জন করলেও সামরিক জান্তা ফলাফল মানতে অস্বীকৃতি জানায়। লাখো মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এক নিমেষে ভেঙে যায়।

প্রথম ভোটের অভিজ্ঞতা

সেদিন সকালেই লেখকের পুরো পরিবার ভোটকেন্দ্রে রওনা দেন। রাস্তায় প্রচারকর্মীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ভোট চাইছিলেন। বৃদ্ধা-অসুস্থ মানুষও বাঁশে করে ভোটকেন্দ্রে আনা হচ্ছিল, শুধু “বোগ্যোকের মেয়ের দলকে” ভোট দেওয়ার জন্য। “বোগ্যোক” বলতে বোঝানো হয় অং সানকে, যিনি সু চির পিতা।

সেদিন প্রায় দুই কোটি মানুষ ভোটদানের যোগ্য ছিলেন। এর মধ্যে এক কোটি ৫০ লাখেরও বেশি ভোটার কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। অনেক তরুণের মতো লেখকও প্রথমবার ভোট দিয়ে ভেবেছিলেন, দেশ এবার গণতন্ত্রের পথে হাঁটবে।

বিজয় ও পরাজয়ের বৈপরীত্য

কয়েক দিনের ফলাফলে দেখা যায়, এনএলডি ৮০ শতাংশ ভোট পেয়ে ৪৯২ আসনের সংসদে ৩৯২টি আসন দখল করেছে। সামরিক সমর্থিত ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি মাত্র ১০টি আসনে সীমাবদ্ধ ছিল।

কিন্তু এই জয় ছিল কেবল প্রতীকী। জান্তা ফলাফল উপেক্ষা করে, এনএলডির নির্বাচিত প্রার্থীদের কারাগারে পাঠায় বা নির্বাসিত করে। যেমন সান সান নামে এক নির্বাচিত প্রার্থীকে দুই দফায় দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

ভঙ্গ প্রতিশ্রুতি ও দমননীতি

আইন অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নতুন সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে সংসদ বসানো হয়নি; বরং ব্যাপক গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা ঘটে। অন্তত তিনজন নির্বাচিত এমপি কারাগারে মারা যান। বহুজন আজও নির্বাসিত বা বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন।

অং সান সু চি বারবার গৃহবন্দি হন এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। নির্বাচনের পরবর্তী ১৫ বছরে এনএলডি কার্যত ভেঙে পড়লেও জনগণের প্রত্যাশা বেঁচে ছিল।

আন্তর্জাতিক চাপ ও জান্তার কৌশল

১৯৯৩ সালে সামরিক সরকার তথাকথিত “ন্যাশনাল কনভেনশন” ডেকে নতুন সংবিধানের নামে প্রহসন চালায়। কিন্তু এতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা ছিল নগণ্য। পরবর্তীতে এনএলডি এই প্রক্রিয়া বর্জন করে।

২০০২ সালে সু চি কিছুটা স্বাধীনতা পেলেও ২০০৩ সালে সাগাইং অঞ্চলের দেপাইন এলাকায় তার কনভয়ের ওপর হামলা চালানো হয়, যেখানে তার বহু সমর্থক নিহত হন। আবারও তিনি গ্রেপ্তার হন।

বিভাজন ও হতাশা

সময়ের সাথে সাথে বিরোধী শিবিরের ভেতরেও বিভক্তি তৈরি হয়। তরুণ প্রজন্ম পুরনো নেতৃত্বে আস্থা হারায়। অনেকে মনে করেন, ১৯৯০ সালের নির্বাচন কেবল ইতিহাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু তখনকার ত্যাগ ও রক্তঝরা সংগ্রামের কথা ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।

এক প্রাক্তন ছাত্রনেতা কো কো গি, যিনি দীর্ঘ ১৪ বছর জেল খেটে মুক্তি পান, বলেন—“ক্ষমতা হস্তান্তরের চেয়ে জাতীয় পুনর্মিলন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

দাদীর স্মৃতি ও ভোটের মূল্য

লেখকের দাদী আজও স্পষ্ট মনে করতে পারেন সেদিনের ভোট। তিনি ভোট দিয়েছিলেন “বোগ্যোকের মেয়ের দলে”। কিন্তু যার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন — সেই প্রার্থী সাইন হ্লা উ — আজও কারাগারে আছেন।

লেখক নিজেও কারাবন্দি হয়েছিলেন, তবে পরে মুক্তি পান। তিনি প্রশ্ন করেন, তার ভোট কি সত্যিই সৌভাগ্যের ছিল, নাকি এক অপূর্ণ স্বপ্নের প্রতীক?

১৯৯০ সালের নির্বাচন মিয়ানমারের ইতিহাসে গণতন্ত্রের জন্য এক বিশাল আত্মত্যাগ ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। যদিও জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি, সেই আন্দোলন ও রক্তের দাগ এখনো মুছে যায়নি। আজও সেই দিনের স্মৃতি জনগণের হৃদয়ে অমলিন।