০৫:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬
হাইলাইট: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণরুম–গেস্টরুম বন্ধ হয়েছে, ‘ট্যাগ’ দিয়ে নির্যাতন থামেনি ‘ফেডএক্স পার্সেলে মাদক’-ফোনকলেই ফাঁদে পড়লেন ভারতীয় কৌতুকশিল্পী চীন-রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র: নতুন এক ত্রিভুজ রাজনীতির সূচনা? গাজার নীরব কারাগার আর বিশ্বের বিবেকহীনতা রুপির সংকট শুধু মুদ্রার নয়, আস্থারও পরীক্ষা ঢাকার পশুর হাট ইজারায় বিএনপির প্রাধান্য, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে জামায়াত বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ধবলধোলাই, তাইজুলের ঘূর্ণিতে পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে হারাল টাইগাররা শান্তিনগরের শপিং মলে আগুন, দগ্ধ চারজন হাসপাতালে ভারতে ৪৮ ডিগ্রি তাপমাত্রায় অচল বান্দা, সকাল ১০টার পরই থেমে যায় জনজীবন তিস্তা সেতুর সংযোগ সড়কে ভয়াবহ ধস, উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগে বড় শঙ্কা

পাকিস্তানের ত্রাণশিবিরে যেভাবে কঠিন দিন পার করছে বন্যাকবলিতরা

লাহোরের উপকণ্ঠ চুং শহরে একটি পুরনো স্কুল ভবন এখন ত্রাণশিবিরে পরিণত হয়েছে। বন্যায় ঘরবাড়ি হারানো নারীরা এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। মলিন কাপড়, অগোছালো চুল আর ভরা ক্লাসরুমে গাদাগাদি করে দিন কাটাচ্ছেন তারা। গর্ভবতী নারীরা বিশেষভাবে কষ্ট পাচ্ছেন, তাদের শরীর ব্যথায় জর্জরিত, চোখ ক্লান্তি আর হতাশায় ভরা।

গর্ভবতী নারীদের দুর্দশা

১৯ বছরের শুমাইলা রিয়াজ সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তিনি চার দিন ধরে শিবিরে আছেন এবং ক্রমাগত প্রসব-সংক্রান্ত ব্যথায় ভুগছেন। তিনি বলেন, “আমি আমার সন্তানের কথা ভাবতে চেয়েছিলাম, কিন্তু এখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েই অনিশ্চিত।”

ফাতিমা নামের আরেক তরুণী, যিনি চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা এবং এক বছরের শিশুর মা, জানান ওষুধ ও সঠিক খাবারের অভাবে তিনি প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছেন। তিনি বলেন, “আগে নিজের মতো খেতাম, ঘুমাতাম, হাঁটতাম। এখন কিছুই পারছি না।”

বন্যার ব্যাপক প্রভাব

এক সপ্তাহের টানা বর্ষণে পাঞ্জাবের তিনটি প্রধান নদীর পানি ফেঁপে ওঠে। পাঞ্জাবের মূখ্য মন্ত্রী মারিয়ম আওরঙ্গজেবের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দুই মিলিয়নের বেশি হয়েছে।

প্রায় সাত লাখ ৫০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ১ লাখ ১৫ হাজার মানুষকে নৌকায় উদ্ধার করা হয়েছে—এটি পাঞ্জাবের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উদ্ধার অভিযান। শহর ও গ্রাম উভয় এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, যার মধ্যে লাহোরের অনেক অংশও ডুবে গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বৃষ্টি কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তা অনিয়মিত ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। জুন থেকে অস্বাভাবিক বর্ষণে ভূমিধস ও বন্যায় দেশজুড়ে ৮৫০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। সর্বশেষ বৃষ্টিপাতে অন্তত ৩২ জন মারা গেছেন।

স্বাস্থ্য ও জীবনের সংকট

ত্রাণশিবিরে নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসামগ্রী, বিশেষ করে স্যানিটারি প্যাড ও পরিষ্কার কাপড়ের অভাব তীব্র। মাসিক নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা এখনও নিষিদ্ধ মনে করা হয়, ফলে নারীরা নীরবে কষ্ট সহ্য করছেন।

আলীমা বিবি জানান, “প্যাড জোগাড় করলেও এখানে সঠিক বাথরুম নেই। তাই আশেপাশের বাড়িতে গিয়ে ব্যবহার করতে হয়।” জামিলা নামের এক নারী বলেন, পুরুষরা বাইরে গেলে তারা গোপনে বাথরুম ব্যবহার করেন।

একজন উদ্বিগ্ন নারী নিজের আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা বৌমাকে কোথায় নিয়ে যাবেন জানতে চাইছিলেন, যিনি প্রসব-বেদনায় কাতরাচ্ছিলেন। ডাক্তার ফাহাদ আব্বাস জানান, তিনি প্রতিদিন দুই থেকে তিন শত রোগী দেখেন, যাদের মধ্যে অনেকেই সংক্রমণ ও পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত। নারী ও শিশুরা বিশেষভাবে মানসিক আঘাতে ভুগছেন।

নবজাতক ও মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়েও প্রতিদিন এক মাসের কম বয়সী ৬৭৫ শিশু ও প্রসবকালীন জটিলতায় ২৭ জন নারী মারা যান—যা প্রতিরোধযোগ্য। এখন বন্যার পর এই ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে।

একজন নারী জানান, তিনি আগে ঋতুকালীন ব্যথার জন্য যে ওষুধ ব্যবহার করতেন তা এখন আর সহজে কেনা সম্ভব নয়। জামিলা বলেন, “আমরা মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে এসেছি, কিন্তু এই দুর্দশাও মৃত্যুর চেয়ে কম কিছু নয়।”

 

পাকিস্তানের চলমান বন্যা শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস করেনি, নারীদের মৌলিক স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও নিরাপত্তার উপরও ভয়াবহ আঘাত হেনেছে। ত্রাণশিবিরগুলোতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট ও মানসিক আঘাত নারীদের জীবনে অসহনীয় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হাইলাইট: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণরুম–গেস্টরুম বন্ধ হয়েছে, ‘ট্যাগ’ দিয়ে নির্যাতন থামেনি

পাকিস্তানের ত্রাণশিবিরে যেভাবে কঠিন দিন পার করছে বন্যাকবলিতরা

০১:২৯:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫

লাহোরের উপকণ্ঠ চুং শহরে একটি পুরনো স্কুল ভবন এখন ত্রাণশিবিরে পরিণত হয়েছে। বন্যায় ঘরবাড়ি হারানো নারীরা এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। মলিন কাপড়, অগোছালো চুল আর ভরা ক্লাসরুমে গাদাগাদি করে দিন কাটাচ্ছেন তারা। গর্ভবতী নারীরা বিশেষভাবে কষ্ট পাচ্ছেন, তাদের শরীর ব্যথায় জর্জরিত, চোখ ক্লান্তি আর হতাশায় ভরা।

গর্ভবতী নারীদের দুর্দশা

১৯ বছরের শুমাইলা রিয়াজ সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তিনি চার দিন ধরে শিবিরে আছেন এবং ক্রমাগত প্রসব-সংক্রান্ত ব্যথায় ভুগছেন। তিনি বলেন, “আমি আমার সন্তানের কথা ভাবতে চেয়েছিলাম, কিন্তু এখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েই অনিশ্চিত।”

ফাতিমা নামের আরেক তরুণী, যিনি চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা এবং এক বছরের শিশুর মা, জানান ওষুধ ও সঠিক খাবারের অভাবে তিনি প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছেন। তিনি বলেন, “আগে নিজের মতো খেতাম, ঘুমাতাম, হাঁটতাম। এখন কিছুই পারছি না।”

বন্যার ব্যাপক প্রভাব

এক সপ্তাহের টানা বর্ষণে পাঞ্জাবের তিনটি প্রধান নদীর পানি ফেঁপে ওঠে। পাঞ্জাবের মূখ্য মন্ত্রী মারিয়ম আওরঙ্গজেবের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দুই মিলিয়নের বেশি হয়েছে।

প্রায় সাত লাখ ৫০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ১ লাখ ১৫ হাজার মানুষকে নৌকায় উদ্ধার করা হয়েছে—এটি পাঞ্জাবের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উদ্ধার অভিযান। শহর ও গ্রাম উভয় এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, যার মধ্যে লাহোরের অনেক অংশও ডুবে গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বৃষ্টি কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তা অনিয়মিত ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। জুন থেকে অস্বাভাবিক বর্ষণে ভূমিধস ও বন্যায় দেশজুড়ে ৮৫০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। সর্বশেষ বৃষ্টিপাতে অন্তত ৩২ জন মারা গেছেন।

স্বাস্থ্য ও জীবনের সংকট

ত্রাণশিবিরে নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসামগ্রী, বিশেষ করে স্যানিটারি প্যাড ও পরিষ্কার কাপড়ের অভাব তীব্র। মাসিক নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা এখনও নিষিদ্ধ মনে করা হয়, ফলে নারীরা নীরবে কষ্ট সহ্য করছেন।

আলীমা বিবি জানান, “প্যাড জোগাড় করলেও এখানে সঠিক বাথরুম নেই। তাই আশেপাশের বাড়িতে গিয়ে ব্যবহার করতে হয়।” জামিলা নামের এক নারী বলেন, পুরুষরা বাইরে গেলে তারা গোপনে বাথরুম ব্যবহার করেন।

একজন উদ্বিগ্ন নারী নিজের আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা বৌমাকে কোথায় নিয়ে যাবেন জানতে চাইছিলেন, যিনি প্রসব-বেদনায় কাতরাচ্ছিলেন। ডাক্তার ফাহাদ আব্বাস জানান, তিনি প্রতিদিন দুই থেকে তিন শত রোগী দেখেন, যাদের মধ্যে অনেকেই সংক্রমণ ও পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত। নারী ও শিশুরা বিশেষভাবে মানসিক আঘাতে ভুগছেন।

নবজাতক ও মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়েও প্রতিদিন এক মাসের কম বয়সী ৬৭৫ শিশু ও প্রসবকালীন জটিলতায় ২৭ জন নারী মারা যান—যা প্রতিরোধযোগ্য। এখন বন্যার পর এই ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে।

একজন নারী জানান, তিনি আগে ঋতুকালীন ব্যথার জন্য যে ওষুধ ব্যবহার করতেন তা এখন আর সহজে কেনা সম্ভব নয়। জামিলা বলেন, “আমরা মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে এসেছি, কিন্তু এই দুর্দশাও মৃত্যুর চেয়ে কম কিছু নয়।”

 

পাকিস্তানের চলমান বন্যা শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস করেনি, নারীদের মৌলিক স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও নিরাপত্তার উপরও ভয়াবহ আঘাত হেনেছে। ত্রাণশিবিরগুলোতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট ও মানসিক আঘাত নারীদের জীবনে অসহনীয় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।