০১:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬
বেয়নসের অপ্রকাশিত গান চুরির মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ দাবি করেছেন “বিয়ন্সের অপ্রকাশিত সংগীত চুরির অভিযোগে গ্রেফতার ব্যক্তি দোষী নয় বলে দাবি” সিইএস ২০২৬: স্মার্ট ইটাল, কীবোর্ড কেস ও সাইবার পেটের প্রদর্শনী” দূর সমুদ্দুর মধ্য ওকলাহোমায় জানুয়ারির বিরল টর্নেডোতে পূর্বাভাস আশঙ্কা বিনা অনুমতিতে কণ্ঠ ব্যবহারে ব্যাড বানির বিরুদ্ধে ১৬ মিলিয়ন ডলারের মামলা ইরানজুড়ে বিক্ষোভে ইন্টারনেট বন্ধ, উড়োজাহাজ বাতিল উইন্ডোজ এবং আইপ্যাডের মধ্যে সেতুবন্ধ বানাচ্ছে ছোট মহাকাশচারী ডংগল মার্কিনদের মতে যুক্তরাষ্ট্র নৈতিক নেতৃত্বে পিছিয়ে, তবে তারা পরিবর্তন চায় যুক্তরাষ্ট্রকে ‘না’ বলার অধিকার রক্ষা করবে ইউরোপ, বললেন ফরাসি মন্ত্রী

বাংলাদেশে আগ্নেয়গিরি আছে বলে যে প্রচলিত ধারণা তা কতটা সঠিক

 আগ্নেয়গিরির কৌতূহল

আগ্নেয়গিরি সবসময় মানুষের কাছে ভয় ও বিস্ময়ের প্রতীক। হঠাৎ অগ্ন্যুৎপাত, গলিত লাভা, কালো ধোঁয়া—এসব দৃশ্য পৃথিবীর প্রাকৃতিক শক্তির প্রকাণ্ড রূপকে প্রকাশ করে। কিন্তু বাংলাদেশে কি কোনো আগ্নেয়গিরি আছে? প্রায়ই মানুষ পাহাড়ি টিলা বা গরম পানির উৎস দেখে ভেবে বসেন, হয়তো এখানে কোনো সুপ্ত আগ্নেয়গিরি রয়েছে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং দক্ষিণ এশিয়ার টেকটোনিক ইতিহাসে নজর দিতে হবে।

বাংলাদেশ ভূগোল ও ভূতত্ত্ব

বাংলাদেশ মূলত একটি নদীমাতৃক সমভূমি। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর পলল জমে এই ভূমি হাজার বছরের মধ্যে তৈরি হয়েছে। দেশের ৮০ শতাংশেরও বেশি অংশ সমতল। পাহাড় রয়েছে শুধু দুই অঞ্চলে—সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামে। এই পাহাড়গুলো আগ্নেয় নয়, বরং ভাঁজযুক্ত পাহাড় (Folded Hills), যা ভারতীয় প্লেট ও বার্মা প্লেটের সংঘর্ষে সৃষ্টি হয়েছে।

ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশ ইন্দো-বর্মা সঞ্চলন অঞ্চলের অংশ। এই অঞ্চল টেকটোনিকভাবে সক্রিয় হলেও এখানে পৃথিবীর গভীর থেকে লাভা উঠে আসার কোনো পথ নেই। তাই আগ্নেয়গিরি গঠনের সুযোগও নেই।

আগ্নেয়গিরির জন্য যে শর্ত দরকার

আগ্নেয়গিরি গঠনের জন্য সাধারণত তিনটি ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি দেখা যায়—

প্লেট সীমান্তে সংঘর্ষ বা বিচ্ছেদ: যেমন প্রশান্ত মহাসাগরীয় রিং অফ ফায়ার।

হটস্পট বা ভূত্বকের নিচে বিশেষ তাপীয় অঞ্চল: যেমন হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ।

সাবডাকশন জোনে শিলার গলন: যেমন আন্দেস পর্বতমালা।

বাংলাদেশের ভূগোল এ ধরনের কোনো শর্তই পূরণ করে না। এখানে প্লেট সংঘর্ষ থাকলেও তা মূলত ভাঁজযুক্ত পাহাড় তৈরির মাধ্যমে প্রকাশ পায়, আগ্নেয়গিরি হিসেবে নয়।

গরম পানির উৎস ও ভ্রান্ত ধারণা

বাংলাদেশে কয়েকটি জায়গায় গরম পানির উৎস পাওয়া যায়। যেমন সিলেটের লালখান বাজার এলাকায় বা পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানে। অনেকেই মনে করেন এগুলো আগ্নেয়গিরির কারণে সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এগুলো ভূতাত্ত্বিক চাপ ও ভূগর্ভস্থ পানির রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার ফল। ভূগর্ভে পানি মাটির ভেতর দিয়ে গিয়ে খনিজ পদার্থের সঙ্গে মিশে গরম হয়ে উপরে ওঠে। তাই এগুলোকে আগ্নেয়গিরির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা ভুল।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আগ্নেয়গিরির ভুল ধারণা

চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোকে অনেক সময় স্থানীয়রা “জ্বালামুখী পাহাড়” বলে ডাকেন। কিন্তু এগুলো প্রকৃতপক্ষে ভাঁজযুক্ত পাহাড়। মিয়ানমারের দিক থেকে ভারতীয় প্লেটের ওপর চাপ পড়ে টিলা ও পাহাড় তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে আগ্নেয়গিরির কোনো সম্পর্ক নেই।

বাংলাদেশে ভূমিকম্প, আগ্নেয় নয়

বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ দেশটি ইন্দো-বর্মা সঞ্চলন অঞ্চলে অবস্থিত। বিশেষ করে সিলেট, চট্টগ্রাম ও মেঘালয় মালভূমির সংলগ্ন এলাকায় মাঝেমধ্যেই ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এগুলো ভূতাত্ত্বিক প্লেটের ঘর্ষণজনিত, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতজনিত নয়।

দক্ষিণ এশিয়ার আগ্নেয়গিরি চিত্র

যদিও বাংলাদেশে কোনো আগ্নেয়গিরি নেই, দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চলে আগ্নেয়গিরি আছে। যেমন—

  • ভারতের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে ব্যারেন আইল্যান্ড নামক একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। এটি বর্তমানে ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র সক্রিয় আগ্নেয়গিরি।
  • মায়ানমারেও কয়েকটি নিষ্ক্রিয় আগ্নেয়গিরির অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
    তবে এগুলো বাংলাদেশের অনেক দূরে অবস্থিত এবং বাংলাদেশের ভূগোলকে প্রভাবিত করে না।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভূতাত্ত্বিক নিরাপত্তা

বাংলাদেশ আগ্নেয়গিরির ঝুঁকি থেকে নিরাপদ হলেও ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে। ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল অবকাঠামো দেশকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে ফেলতে পারে। তাই ভূমিকম্প প্রতিরোধী স্থাপত্য, সচেতনতা বৃদ্ধি ও দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই বাংলাদেশের জন্য জরুরি।

বাংলাদেশে কোনো সক্রিয় বা সুপ্ত আগ্নেয়গিরি নেই। পাহাড় বা গরম পানির উৎসকে আগ্নেয়গিরি ভেবে বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ হলো সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা ও কৌতূহল। ভূবিজ্ঞান বলছে—বাংলাদেশ মূলত ভূমিকম্পপ্রবণ একটি সমতল দেশ, আগ্নেয় নয়। তাই আমাদের আসল প্রস্তুতি হওয়া উচিত ভূমিকম্প মোকাবিলা, আগ্নেয়গিরি নয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

বেয়নসের অপ্রকাশিত গান চুরির মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ দাবি করেছেন

বাংলাদেশে আগ্নেয়গিরি আছে বলে যে প্রচলিত ধারণা তা কতটা সঠিক

০৪:০০:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫

 আগ্নেয়গিরির কৌতূহল

আগ্নেয়গিরি সবসময় মানুষের কাছে ভয় ও বিস্ময়ের প্রতীক। হঠাৎ অগ্ন্যুৎপাত, গলিত লাভা, কালো ধোঁয়া—এসব দৃশ্য পৃথিবীর প্রাকৃতিক শক্তির প্রকাণ্ড রূপকে প্রকাশ করে। কিন্তু বাংলাদেশে কি কোনো আগ্নেয়গিরি আছে? প্রায়ই মানুষ পাহাড়ি টিলা বা গরম পানির উৎস দেখে ভেবে বসেন, হয়তো এখানে কোনো সুপ্ত আগ্নেয়গিরি রয়েছে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং দক্ষিণ এশিয়ার টেকটোনিক ইতিহাসে নজর দিতে হবে।

বাংলাদেশ ভূগোল ও ভূতত্ত্ব

বাংলাদেশ মূলত একটি নদীমাতৃক সমভূমি। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর পলল জমে এই ভূমি হাজার বছরের মধ্যে তৈরি হয়েছে। দেশের ৮০ শতাংশেরও বেশি অংশ সমতল। পাহাড় রয়েছে শুধু দুই অঞ্চলে—সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামে। এই পাহাড়গুলো আগ্নেয় নয়, বরং ভাঁজযুক্ত পাহাড় (Folded Hills), যা ভারতীয় প্লেট ও বার্মা প্লেটের সংঘর্ষে সৃষ্টি হয়েছে।

ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশ ইন্দো-বর্মা সঞ্চলন অঞ্চলের অংশ। এই অঞ্চল টেকটোনিকভাবে সক্রিয় হলেও এখানে পৃথিবীর গভীর থেকে লাভা উঠে আসার কোনো পথ নেই। তাই আগ্নেয়গিরি গঠনের সুযোগও নেই।

আগ্নেয়গিরির জন্য যে শর্ত দরকার

আগ্নেয়গিরি গঠনের জন্য সাধারণত তিনটি ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি দেখা যায়—

প্লেট সীমান্তে সংঘর্ষ বা বিচ্ছেদ: যেমন প্রশান্ত মহাসাগরীয় রিং অফ ফায়ার।

হটস্পট বা ভূত্বকের নিচে বিশেষ তাপীয় অঞ্চল: যেমন হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ।

সাবডাকশন জোনে শিলার গলন: যেমন আন্দেস পর্বতমালা।

বাংলাদেশের ভূগোল এ ধরনের কোনো শর্তই পূরণ করে না। এখানে প্লেট সংঘর্ষ থাকলেও তা মূলত ভাঁজযুক্ত পাহাড় তৈরির মাধ্যমে প্রকাশ পায়, আগ্নেয়গিরি হিসেবে নয়।

গরম পানির উৎস ও ভ্রান্ত ধারণা

বাংলাদেশে কয়েকটি জায়গায় গরম পানির উৎস পাওয়া যায়। যেমন সিলেটের লালখান বাজার এলাকায় বা পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানে। অনেকেই মনে করেন এগুলো আগ্নেয়গিরির কারণে সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এগুলো ভূতাত্ত্বিক চাপ ও ভূগর্ভস্থ পানির রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার ফল। ভূগর্ভে পানি মাটির ভেতর দিয়ে গিয়ে খনিজ পদার্থের সঙ্গে মিশে গরম হয়ে উপরে ওঠে। তাই এগুলোকে আগ্নেয়গিরির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা ভুল।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আগ্নেয়গিরির ভুল ধারণা

চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোকে অনেক সময় স্থানীয়রা “জ্বালামুখী পাহাড়” বলে ডাকেন। কিন্তু এগুলো প্রকৃতপক্ষে ভাঁজযুক্ত পাহাড়। মিয়ানমারের দিক থেকে ভারতীয় প্লেটের ওপর চাপ পড়ে টিলা ও পাহাড় তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে আগ্নেয়গিরির কোনো সম্পর্ক নেই।

বাংলাদেশে ভূমিকম্প, আগ্নেয় নয়

বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ দেশটি ইন্দো-বর্মা সঞ্চলন অঞ্চলে অবস্থিত। বিশেষ করে সিলেট, চট্টগ্রাম ও মেঘালয় মালভূমির সংলগ্ন এলাকায় মাঝেমধ্যেই ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এগুলো ভূতাত্ত্বিক প্লেটের ঘর্ষণজনিত, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতজনিত নয়।

দক্ষিণ এশিয়ার আগ্নেয়গিরি চিত্র

যদিও বাংলাদেশে কোনো আগ্নেয়গিরি নেই, দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চলে আগ্নেয়গিরি আছে। যেমন—

  • ভারতের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে ব্যারেন আইল্যান্ড নামক একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। এটি বর্তমানে ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র সক্রিয় আগ্নেয়গিরি।
  • মায়ানমারেও কয়েকটি নিষ্ক্রিয় আগ্নেয়গিরির অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
    তবে এগুলো বাংলাদেশের অনেক দূরে অবস্থিত এবং বাংলাদেশের ভূগোলকে প্রভাবিত করে না।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভূতাত্ত্বিক নিরাপত্তা

বাংলাদেশ আগ্নেয়গিরির ঝুঁকি থেকে নিরাপদ হলেও ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে। ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল অবকাঠামো দেশকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে ফেলতে পারে। তাই ভূমিকম্প প্রতিরোধী স্থাপত্য, সচেতনতা বৃদ্ধি ও দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই বাংলাদেশের জন্য জরুরি।

বাংলাদেশে কোনো সক্রিয় বা সুপ্ত আগ্নেয়গিরি নেই। পাহাড় বা গরম পানির উৎসকে আগ্নেয়গিরি ভেবে বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ হলো সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা ও কৌতূহল। ভূবিজ্ঞান বলছে—বাংলাদেশ মূলত ভূমিকম্পপ্রবণ একটি সমতল দেশ, আগ্নেয় নয়। তাই আমাদের আসল প্রস্তুতি হওয়া উচিত ভূমিকম্প মোকাবিলা, আগ্নেয়গিরি নয়।