ফ্রান্সে দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা আরবি
ফ্রান্সে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ আরবি ভাষায় কথা বলে। এ কারণে আরবি শুধু একটি ভাষা নয়, বরং প্যারিসের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে। খাবার, সাহিত্য, সঙ্গীত থেকে শুরু করে ক্যাফে সংস্কৃতি—সবখানেই এর প্রভাব স্পষ্ট।
প্যারিসে যারা ফরাসি শিখতে আসেন, তাদের অনেকেই অবাক হন দেখে যে স্থানীয় স্ল্যাং বা কথ্যভাষায় কতগুলো আরবি শব্দ ঢুকে পড়েছে। যেমন ‘ওয়েশ’ (কেমন আছো?), ‘কিফে’ (পছন্দ করা) কিংবা ‘ব্লেদ’ (গ্রাম বা মাতৃভূমি)। এগুলো উত্তর আফ্রিকার উপভাষা থেকে এসেছে এবং এখন প্যারিসবাসীর দৈনন্দিন শব্দভান্ডারের অংশ।

ভাষার প্রভাব ও রাজনৈতিক বিতর্ক
আরবি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ফরাসি ভাষাকে প্রভাবিত করেছে। ‘পাস্তেক’ (তরমুজ), ‘ম্যাগাজিন’ (দোকান) কিংবা ‘জুপ’ (স্কার্ট) এর মতো শব্দ আরবি থেকে এসেছে। তবে ফরাসি সংবিধানে বলা আছে—“প্রজাতন্ত্রের ভাষা হলো ফরাসি।” এ কারণে সমাজে আরবির স্থান নিয়ে বিতর্ক সবসময়ই রাজনৈতিক রঙ পায়।
ফরাসি-লেবানিজ সাংবাদিক নাবিল ওয়াকিম বলেন, “ফ্রান্সে সাধারণত আরবি ভাষার প্রতি নেতিবাচক মনোভাবই বেশি।” তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক লেখক, ইতিহাসবিদ ও সংস্কৃতিকর্মী আরবি ভাষা ও সংস্কৃতির অবদানকে নতুন করে সামনে আনছেন।
রেস্তোরাঁয় ভাষার বিনিময়
প্যারিসের ১১তম আরঁদিসমঁয়ে অবস্থিত টিউনিসিয়ান রেস্তোরাঁ ‘শে বায়া’-য় গেলে গরম গরম মালাওয়ি রুটি আর ওজ্জার গন্ধ ভেসে আসে। এর মালিক কামেল ফালাহ বলেন, ফরাসি গ্রাহকদের বিরক্ত না করতে তিনি সচরাচর মাতৃভাষায় কথা বলেন না। তবে অনেকেই আরবি শিখতে আগ্রহী। কাছেই একটি ভাষা স্কুল থাকায় শিক্ষার্থীরা নিয়মিত তাঁর রেস্তোরাঁয় আসে। তিনি বলেন, “তাদের মুখে ‘চুইয়া’ (অল্প একটু) শব্দটি শুনতে ভালো লাগে।”

আরবি শিক্ষার দীর্ঘ ঐতিহ্য
লিঙ্গুইস্ট তারেক আবু এল গামাল জানান, ফ্রান্সে আরবি শেখানো শুরু হয় ১৫৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘কোলেজ দ্য ফ্রঁস’-এ। অর্থাৎ ফরাসি শেখার আগেই এখানে আরবি শেখানো হতো। ১৯৮৭ সালে প্যারিসের আরব ওয়ার্ল্ড ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজও আরবি ভাষা ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ ও প্রচারের কেন্দ্র। এখানে নিয়মিত কবিতা পাঠ, প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়।
লাতিন কোয়ার্টারে আরব ঐতিহ্য
লাতিন কোয়ার্টারকে বলা হয় প্যারিসের বৌদ্ধিক হৃদয়ভূমি। এখানেই ১৯২০-এর দশকে তৈরি হয় গ্রঁদ মস্ক। সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এলাকায় ক্যাফে সংস্কৃতি জন্ম নেয়, যেখানে দার্শনিক ও শিক্ষার্থীরা আলোচনা করতেন।
১৭শ শতকে ওসমানীয় দূত সোলিমান আগা প্যারিসে কফি পরিচিত করান। পরে উত্তর আফ্রিকার অভিবাসীরা এ অঞ্চলের ক্যাফেগুলোকে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। এখানে স্বাধীনতা, ঔপনিবেশিকতা ও পরিচয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলত।

লেখক কলিন হুসে বলেন, “লাতিন কোয়ার্টার শুধু ফরাসি ক্যাফের জন্য বিখ্যাত নয়, বরং প্যারিসে আরব সংস্কৃতিরও প্রতীক।”
সোরবোনের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আরবি সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ নামগুলোও ছিলেন—মিসরের লেখক মুহাম্মদ হোসেন হেকাল, ‘আরব সাহিত্যের ডিন’ তাহা হুসেন এবং নাট্যকার তাওফিক আল-হাকিম।
বই, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
ক্যাটারিনা দেত্তি পরিচালিত ‘মাকতাবা বেরফিন’ বইয়ের দোকানটি সম্পূর্ণ আরবি ভাষার বই নিয়ে সাজানো। এখানে প্রাচীন ব্যাকরণ বই থেকে শুরু করে নাগিব মাহফুজের উপন্যাস পর্যন্ত রয়েছে। নিয়মিত কবিতা পাঠ, লেখালেখির কর্মশালা ও সঙ্গীত পরিবেশনা হয়।
বারবেস: আরবি সঙ্গীতের রাজধানী
মন্টমার্ত্রের নিচে অবস্থিত বারবেস এলাকায় আরবি সঙ্গীতের সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। একসময় এখানে অসংখ্য রেকর্ডের দোকান ছিল। ইউরোপীয় রেকর্ড লেবেলের মাধ্যমে উত্তর আফ্রিকার শিল্পীরা সঙ্গীত রেকর্ড করতেন।

‘সোভিয়া মিউজিক’ দোকানটি আজও টিকে আছে, যা প্রায় এক শতাব্দী আগে শুরু হয়েছিল। এখান থেকেই বারবেস ধীরে ধীরে ইউরোপে আরবি সঙ্গীতের রাজধানীতে পরিণত হয়।
আলজেরীয় লোকসঙ্গীত ‘রাই’-এরও কেন্দ্র হয়ে ওঠে বারবেস। আলজেরীয় শিল্পী শেইখা রিমিত্তি এখানে থাকতেন এবং তাঁর স্বাধীনতাকামী গান বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলেন। তাঁর নামে এখন একটি চত্বরও রয়েছে, যেখানে তাঁর গান ‘নুয়ার’-এর লিরিক ফরাসি ও আরবিতে খোদাই করা হয়েছে।
আরবি সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ
২০১৫ সালের সন্ত্রাসী হামলার পর বহু বছর প্যারিসে আরবি সঙ্গীত একেবারে আড়ালে চলে যায়। তবে বর্তমানে তা আবার ফিরে আসছে।
লেখক হুসে বলেন, “আরবি হলো ফ্রান্সের ভাষা। এর শেকড় অন্যত্র হলেও, আমি যেমন প্যারিসে এর প্রেমে পড়েছি, তেমনি অনেকেই এখানে এসে আরবির সঙ্গে নতুনভাবে পরিচিত হয়েছেন।”
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















