বেইজিংয়ে বৃহৎ সামরিক কুচকাওয়াজ
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বুধবার বেইজিংয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজের নেতৃত্ব দেন। হাজারো সেনা ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে তিনি সতর্ক করে দেন যে, বিশ্ব আজ যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যে এক কঠিন পছন্দের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
শি পুতিন ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে পাশাপাশি মঞ্চে উপস্থিত হন। এটি শুধু কুচকাওয়াজ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার বিকল্প হিসেবে চীনের ভূমিকা স্পষ্টভাবে তুলে ধরার এক প্রতীকী পদক্ষেপ।

শির বক্তৃতা: শান্তি বনাম যুদ্ধ
শি বলেন, অতীতে চীনারা দেশ বাঁচাতে, জাতির পুনর্জাগরণের জন্য এবং মানবতার ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করেছে। এখন আবারও বিশ্বকে শান্তি নাকি যুদ্ধ, সংলাপ নাকি মুখোমুখি সংঘাত, সহযোগিতা নাকি শূন্য-যোগ প্রতিযোগিতার মধ্যে বেছে নিতে হবে।
তিনি যোগ করেন, মানবজাতি কেবল তখনই নিরাপদ থাকবে যখন সব দেশ একে অপরকে সমানভাবে দেখবে, শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করবে এবং পারস্পরিক সহযোগিতায় কাজ করবে।
কুচকাওয়াজের তাৎপর্য
২০১৫ সালের পর এটি ছিল প্রথম এ ধরনের আয়োজন। শি মাও সেতুং-এর মতো ধাঁচের পোশাক পরে খোলা বিলাসবহুল সেডানে চড়ে সেনাদের পরিদর্শন করেন। এখানে প্রথমবারের মতো কিছু নতুন অস্ত্রও উন্মোচন করা হয়।
ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, বেলারুশ, ইরান, সার্বিয়া ও স্লোভাকিয়াসহ ২০টিরও বেশি দেশের নেতারা এতে যোগ দেন। তবে পুতিনের উপস্থিতির কারণে ইউরোপের অনেক নেতা আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন।

জাতীয়তাবাদ ও ঐতিহাসিক স্মৃতি
চীনের কমিউনিস্ট পার্টি এ কুচকাওয়াজকে জাতীয়তাবাদ উস্কে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিকে জাপানবিরোধী সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করছে, যদিও সে যুদ্ধে চীনা জাতীয়তাবাদী বাহিনী (যারা পরে তাইওয়ানে আশ্রয় নেয়) বড় ভূমিকা রেখেছিল বলে অনেকে দাবি করেন।
যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে ইঙ্গিত
শি বলেন, চীনা জাতি কখনো কোনো দমনপীড়নের কাছে মাথা নত করেনি, স্বাধীনতাকে মূল্য দেয় এবং এগিয়ে যায়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি পরোক্ষ আক্রমণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। সম্প্রতি সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনেও শি ‘আধিপত্যবাদ ও শক্তির রাজনীতি’র বিরুদ্ধে ঐক্যের আহ্বান জানান, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও শুল্ক হুমকির দিকে ইঙ্গিত করে।

জাপানের প্রতিক্রিয়া
জাপানের সরকারের মুখপাত্র বলেন, তারা ঘটনাটি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, তবে চীনের উদ্দেশ্য নিয়ে মন্তব্য করার অবস্থায় নেই। টোকিও ও বেইজিং উভয়েই স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখার অঙ্গীকার করেছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শির দৃষ্টিকোণ থেকে অনুষ্ঠানটি সফল হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলেন, এখন চীন বিশ্ব ব্যবস্থায় প্রভাবশালী আসনে ফিরেছে। যুক্তরাষ্ট্রের একপাক্ষিক নীতি বরং অনিশ্চয়তার মূল উৎসে পরিণত হয়েছে।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেবাস্টিয়ান মাসলো বলেন, কুচকাওয়াজের চেয়ে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলন বেশি ইঙ্গিত দেয় যে চীন পশ্চিমা প্রভাবকে মোকাবিলা করতে নতুন অংশীদার ও মিত্রের নেটওয়ার্ক গড়ছে।

ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
রেডিও সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতা তাকে উদ্বিগ্ন করছে না। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরে এক পোস্টে তিনি বিদ্রূপ করে লেখেন, শি, পুতিন ও কিম যেন একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন।
কিম জং উনের ভূমিকা
ব্যক্তিগত বর্মযুক্ত ট্রেনে চেপে বেইজিংয়ে পৌঁছানো কিমের জন্য এটি ছিল বহুপাক্ষিক মঞ্চে প্রথম আবির্ভাব। তিনি পুতিনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে রাশিয়াকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন এবং বলেন, সম্পর্ক সবক্ষেত্রে উন্নত হচ্ছে।
অপ্রত্যাশিতভাবে কিম দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিনিধি উ উন-শিকের সঙ্গেও করমর্দন করেন। তবে চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে শি, পুতিন ও কিমের একসঙ্গে উপস্থিতির খুব অল্প অংশই সম্প্রচারিত হয়। বিদেশি সাংবাদিকদেরও সীমিত প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়।

রাশিয়া-চীন সম্পর্ক
কুচকাওয়াজের আগের দিন শি পুতিনকে ‘পুরনো বন্ধু’ বলে অভিহিত করেন। পুতিন জানান, রাশিয়া-চীনের সম্পর্ক এখন অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে।
সম্ভাব্য ত্রিমুখী জোট
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদিও শি-পুতিন-কিম ত্রিপক্ষীয় বৈঠক এখনো অনিশ্চিত, তাদের একসঙ্গে মঞ্চে দাঁড়ানোই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বার্তা। এর আগে উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়া প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, আর চীন-উত্তর কোরিয়ার মধ্যে রয়েছে ১৯৬১ সালের অনুরূপ চুক্তি।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তিন দেশের নিরাপত্তা স্বার্থ এক নয়। ফলে স্থায়ী ও কার্যকর জোট গঠনে বড় ধরনের সমঝোতা ও ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















