০৫:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
মুশফিকের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে পাকিস্তানের সামনে ৪৩৭ রানের পাহাড় হাম চিকিৎসা কেন জরুরি ঘোষণা করা হচ্ছে না র‌্যাবকে জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা, আসছে নতুন আইন ও নাম পরিবর্তনের ভাবনা ফার্নেস অয়েলের দাম আবার বাড়ল, লিটারপ্রতি এখন ১১৩ টাকা ৫৪ পয়সা ঈদে টানা ৭ দিন বন্ধ থাকবে ব্যাংক, বিশেষ এলাকায় সীমিত সেবা চালু মৃগীরোগে অচেতন চালক, সেই সুযোগে ভ্যান চুরি: ঝিনাইদহে মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন জাবিতে ধর্ষণচেষ্টা মামলার আসামি গ্রেপ্তারের দাবিতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ কোরবানির ঈদ ২৮ মে, বাংলাদেশে জিলহজ মাস শুরু তনু হত্যা মামলায় চাঞ্চল্যকর নতুন তথ্য, ডিএনএ পরীক্ষায় মিলল চতুর্থ পুরুষের রক্ত বাংলাদেশে প্রথম ‘অরেঞ্জ বন্ড’ আসছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে, ডিএসই-ব্র্যাক ইপিএলের চুক্তি

কঠোর মার্কিন নীতিতে মেধা পাচার কমার আশা থাকলেও বিদেশমুখী আকর্ষণ এখনো প্রবল

আমেরিকান স্বপ্নের শুরু

কলকাতার উত্তরপ্রান্তে ভাড়া বাড়িতে থাকা অর্ঘ্যের আমেরিকান স্বপ্ন শুরু হয় মাত্র ১০ বছর বয়সে। সেই সময় তিনি কাকার নতুন বিলাসবহুল বাড়ি দেখেন—যা কাকার মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে কাজ করে উপহার দিয়েছিলেন। বড় টিভি, ঝাড়বাতি, এল–আকৃতির সোফা—সবই ছিল আমেরিকান জীবনের প্রতীক। অর্ঘ্য তখন থেকেই ঠিক করেন, তিনিও একদিন মার্কিন মাটিতে চাকরি করবেন এবং বাবা-মাকে এমনই একটি বাড়ি কিনে দেবেন।

নতুন বাধা: ভিসার ফি বাড়ানো

কিন্তু তার এই স্বপ্ন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন এইচ–১বি ভিসার জন্য আবেদন ফি ১,৫০০–৪,৫০০ ডলার থেকে এক লাফে ১ লাখ ডলার করেছেন। এর সঙ্গে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ প্রস্তাব দিয়েছে, উচ্চ বেতনের আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ফলে মধ্যবিত্ত ভারতীয় তরুণদের জন্য পথটা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

বিশ্বজুড়ে রক্ষণশীল নীতি

আইএমবি ইমিগ্রেশন ল’ এর প্রতিষ্ঠাতা রাভনীত কৌর ব্রার বলেন, বিশ্বব্যাপী এখন রক্ষণশীল মানসিকতা বাড়ছে—যেখানে প্রতিটি দেশ নিজেদের মানুষ, চাকরি ও বাণিজ্যকে আগে গুরুত্ব দিচ্ছে। তার মতে, দক্ষ পেশাদারদের চাহিদা থাকলেও আমেরিকান স্বপ্ন অনেকের কাছেই আর বাস্তবসম্মত নয়।

ভারতীয়দের প্রভাব ও ক্ষতি

দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয়রা এইচ–১বি ভিসার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। সেপ্টেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত পাঁচ বছরে অনুমোদিত ২০.৬ লাখ আবেদনকারীর ৭৩ শতাংশই ভারতীয়। টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস ও ইনফোসিসের মতো ভারতীয় সফটওয়্যার জায়ান্ট ছিল প্রধান স্পনসর। কিন্তু নতুন ফি কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমিয়ে দেবে এবং স্পনসরশিপ কমিয়ে আনতে বাধ্য করবে। এতে হাজারো তরুণের আশা ভেঙে যাবে।

শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তা

শুধু কর্মজীবীরা নন, শিক্ষার্থীরাও নতুন বাস্তবতায় সিদ্ধান্ত পাল্টাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ৩১ লাখ ভারতীয় শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৬ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে গিয়েছিলেন। কিন্তু এখন শিক্ষা পরামর্শদাতা সংস্থাগুলো বলছে, দৈনিক অনুসন্ধান এক বছরে ৯০০ থেকে নেমে ১০০–এর নিচে নেমে গেছে। জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্স নতুন গন্তব্য হয়ে উঠছে।

মেধা পাচার থামার সম্ভাবনা?

মার্কিন অভিবাসনবিরোধী নীতি অনেককে আশা জাগাচ্ছে, হয়তো ভারত থেকে মেধা পাচার কমবে। দীর্ঘদিন ধরে অল্প বেতন, গবেষণার পুঁজি ঘাটতি ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে প্রতিভাবান তরুণেরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছিলেন। এখন দেশে রোবোটিকস, সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে চাকরির চাপ বাড়বে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।

উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ

ইনফোসিসের সাবেক বোর্ড সদস্য মোহনদাস পাইয়ের মতে, এই সংকট ভারতীয় তরুণদের উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করতে পারে। যদিও তহবিল জোগাড় করা কঠিন, তবু ভারতের বাজার সাহসী উদ্যোক্তাদের পুরস্কৃত করছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ভারতীয়রা সহজে দেশে ফিরে আসবেন, এমন সম্ভাবনা কম।

ভিন্ন অভিজ্ঞতা: দেশে ফেরার গল্প

পার্থিবান ভেলুচামি তার ব্যতিক্রম। প্রায় ১০ বছর যুক্তরাষ্ট্রে থাকার পর ২০১৭ সালে কগনিজ্যান্টে বছরে ১ লাখ ৭০ হাজার ডলারের চাকরি ছেড়ে তিনি ফিরে আসেন তামিলনাড়ুর কারুরে। শুরুতে আমেরিকা তাকে মুগ্ধ করলেও সময়ের সঙ্গে তিনি পরিবার ও আপনজনদের মিস করতে থাকেন। বর্ণবাদী অভিজ্ঞতাও তাকে তাড়িত করে। দেশে ফিরে তিনি ‘নেটিভস্পেশাল প্রোডাক্টস’ নামে খাদ্য দোকানের চেইন গড়ে তোলেন, যা প্রতিবছর প্রায় ১৪ কোটি রুপি আয় করছে।

প্রত্যেক জায়গার যেমন সুবিধা আছে, তেমনি অসুবিধাও আছে। কিন্তু অর্ঘ্যের মতো অনেক তরুণের জন্য আমেরিকান স্বপ্ন হয়তো আর ততটা হাতের নাগালে নেই। আর ভেলুচামির মতো কিছু মানুষ বলছেন—বাড়িই আসলে আসল ঠিকানা।


জনপ্রিয় সংবাদ

মুশফিকের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে পাকিস্তানের সামনে ৪৩৭ রানের পাহাড়

কঠোর মার্কিন নীতিতে মেধা পাচার কমার আশা থাকলেও বিদেশমুখী আকর্ষণ এখনো প্রবল

০৫:৫১:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫

আমেরিকান স্বপ্নের শুরু

কলকাতার উত্তরপ্রান্তে ভাড়া বাড়িতে থাকা অর্ঘ্যের আমেরিকান স্বপ্ন শুরু হয় মাত্র ১০ বছর বয়সে। সেই সময় তিনি কাকার নতুন বিলাসবহুল বাড়ি দেখেন—যা কাকার মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে কাজ করে উপহার দিয়েছিলেন। বড় টিভি, ঝাড়বাতি, এল–আকৃতির সোফা—সবই ছিল আমেরিকান জীবনের প্রতীক। অর্ঘ্য তখন থেকেই ঠিক করেন, তিনিও একদিন মার্কিন মাটিতে চাকরি করবেন এবং বাবা-মাকে এমনই একটি বাড়ি কিনে দেবেন।

নতুন বাধা: ভিসার ফি বাড়ানো

কিন্তু তার এই স্বপ্ন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন এইচ–১বি ভিসার জন্য আবেদন ফি ১,৫০০–৪,৫০০ ডলার থেকে এক লাফে ১ লাখ ডলার করেছেন। এর সঙ্গে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ প্রস্তাব দিয়েছে, উচ্চ বেতনের আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ফলে মধ্যবিত্ত ভারতীয় তরুণদের জন্য পথটা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

বিশ্বজুড়ে রক্ষণশীল নীতি

আইএমবি ইমিগ্রেশন ল’ এর প্রতিষ্ঠাতা রাভনীত কৌর ব্রার বলেন, বিশ্বব্যাপী এখন রক্ষণশীল মানসিকতা বাড়ছে—যেখানে প্রতিটি দেশ নিজেদের মানুষ, চাকরি ও বাণিজ্যকে আগে গুরুত্ব দিচ্ছে। তার মতে, দক্ষ পেশাদারদের চাহিদা থাকলেও আমেরিকান স্বপ্ন অনেকের কাছেই আর বাস্তবসম্মত নয়।

ভারতীয়দের প্রভাব ও ক্ষতি

দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয়রা এইচ–১বি ভিসার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। সেপ্টেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত পাঁচ বছরে অনুমোদিত ২০.৬ লাখ আবেদনকারীর ৭৩ শতাংশই ভারতীয়। টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস ও ইনফোসিসের মতো ভারতীয় সফটওয়্যার জায়ান্ট ছিল প্রধান স্পনসর। কিন্তু নতুন ফি কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমিয়ে দেবে এবং স্পনসরশিপ কমিয়ে আনতে বাধ্য করবে। এতে হাজারো তরুণের আশা ভেঙে যাবে।

শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তা

শুধু কর্মজীবীরা নন, শিক্ষার্থীরাও নতুন বাস্তবতায় সিদ্ধান্ত পাল্টাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ৩১ লাখ ভারতীয় শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৬ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে গিয়েছিলেন। কিন্তু এখন শিক্ষা পরামর্শদাতা সংস্থাগুলো বলছে, দৈনিক অনুসন্ধান এক বছরে ৯০০ থেকে নেমে ১০০–এর নিচে নেমে গেছে। জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্স নতুন গন্তব্য হয়ে উঠছে।

মেধা পাচার থামার সম্ভাবনা?

মার্কিন অভিবাসনবিরোধী নীতি অনেককে আশা জাগাচ্ছে, হয়তো ভারত থেকে মেধা পাচার কমবে। দীর্ঘদিন ধরে অল্প বেতন, গবেষণার পুঁজি ঘাটতি ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে প্রতিভাবান তরুণেরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছিলেন। এখন দেশে রোবোটিকস, সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে চাকরির চাপ বাড়বে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।

উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ

ইনফোসিসের সাবেক বোর্ড সদস্য মোহনদাস পাইয়ের মতে, এই সংকট ভারতীয় তরুণদের উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করতে পারে। যদিও তহবিল জোগাড় করা কঠিন, তবু ভারতের বাজার সাহসী উদ্যোক্তাদের পুরস্কৃত করছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ভারতীয়রা সহজে দেশে ফিরে আসবেন, এমন সম্ভাবনা কম।

ভিন্ন অভিজ্ঞতা: দেশে ফেরার গল্প

পার্থিবান ভেলুচামি তার ব্যতিক্রম। প্রায় ১০ বছর যুক্তরাষ্ট্রে থাকার পর ২০১৭ সালে কগনিজ্যান্টে বছরে ১ লাখ ৭০ হাজার ডলারের চাকরি ছেড়ে তিনি ফিরে আসেন তামিলনাড়ুর কারুরে। শুরুতে আমেরিকা তাকে মুগ্ধ করলেও সময়ের সঙ্গে তিনি পরিবার ও আপনজনদের মিস করতে থাকেন। বর্ণবাদী অভিজ্ঞতাও তাকে তাড়িত করে। দেশে ফিরে তিনি ‘নেটিভস্পেশাল প্রোডাক্টস’ নামে খাদ্য দোকানের চেইন গড়ে তোলেন, যা প্রতিবছর প্রায় ১৪ কোটি রুপি আয় করছে।

প্রত্যেক জায়গার যেমন সুবিধা আছে, তেমনি অসুবিধাও আছে। কিন্তু অর্ঘ্যের মতো অনেক তরুণের জন্য আমেরিকান স্বপ্ন হয়তো আর ততটা হাতের নাগালে নেই। আর ভেলুচামির মতো কিছু মানুষ বলছেন—বাড়িই আসলে আসল ঠিকানা।