১১:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬
চীনের ক্ষমতার কেন্দ্রে শুদ্ধি অভিযান বিশ্ব রাজনীতির নতুন অস্থির সংকেত বিশ্বচাপের যুগে কানাডার কঠিন পরীক্ষায়, মার্ক কার্নির সামনে টিকে থাকার রাজনীতি সংখ্যালঘু ও মব সহিংসতা: জানুয়ারি ২০২৬-এ আতঙ্ক, ভাঙচুর আর বিচারহীনতার ছায়া জানুয়ারিতে হেফাজতে ও কারাগারে ১৯ প্রাণহানি খসড়া মিডিয়া অধ্যাদেশকে ‘স্বাধীন গণমাধ্যমের উপহাস’ বলে আখ্যা দিল টিআইবি বিশ্বকাপ অনিশ্চয়তায় জার্সি উন্মোচন স্থগিত করল পিসিবি কোটা বাতিলের দাবিতে গাজীপুরে রেললাইন ও সড়ক অবরোধ করলেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা নির্বাচনের ফল ঘোষণায় ১২ ঘণ্টার বেশি দেরি মানেই অসৎ উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত: মির্জা আব্বাস শিরোনাম: ৫৪ বছর ধরে বাংলাদেশ লুটপাটের শিকার, এবার নির্বাচনে জামায়াতকে সুযোগ দেওয়ার আহ্বান: মিয়া গোলাম পরওয়ার চট্টগ্রাম বন্দরে এনসিটি ইজারা পরিকল্পনার প্রতিবাদে অচল কার্যক্রম

স্ট্যাটিনের বাইরে নতুন আশা: উচ্চ কোলেস্টেরল কমাতে আসছে আধুনিক ওষুধ ও জিন-সম্পাদনার যুগ

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে নতুন চিকিৎসা সম্ভাবনা

দীর্ঘদিন ধরে স্ট্যাটিন ওষুধ উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। হৃদরোগ প্রতিরোধে এসব ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, সবার ক্ষেত্রে তা সমান কার্যকর নয়। এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে, যেখানে স্ট্যাটিন ছাড়াও কোলেস্টেরল কমানোর জন্য আরও নানা ধরনের ওষুধ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।


নতুন প্রজন্মের ওষুধ ও গবেষণার সাফল্য

বর্তমানে রোগীরা নোভার্টিসের তৈরি “লেকভিও” নামের এক আরএনএ-ভিত্তিক ইনজেকশন নিতে পারেন, যা বছরে মাত্র দুইবার প্রয়োগ করলেই যথেষ্ট। আবার কেউ চাইলে এমন ইনজেকশনও নিতে পারেন, যা শরীরের “খারাপ কোলেস্টেরল” বা এলডিএল (LDL) অপসারণে বাধা দেওয়া প্রোটিন PCSK9-কে লক্ষ্য করে কাজ করে।

অ্যামজেন নামের বায়োটেক কোম্পানি তাদের PCSK9 ওষুধ “রিপাথা” আরও বেশি রোগীর জন্য ব্যবহারের পরীক্ষা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, মার্ক (Merck) তৈরি করছে এই ওষুধের সহজে গ্রহণযোগ্য পিল সংস্করণ। পাশাপাশি, কিছু বায়োটেক প্রতিষ্ঠান জিন-সম্পাদনা (gene-editing) প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন চিকিৎসা উদ্ভাবনের চেষ্টা করছে, যা হয়তো স্থায়ীভাবে কোলেস্টেরল কমাতে সক্ষম হবে।


গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফলাফল

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সম্মেলনে সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

  • মার্কের PCSK9 পিল ছয় মাসে এলডিএল কোলেস্টেরল ৬০% পর্যন্ত কমাতে সক্ষম হয়েছে।
  • অ্যামজেনের রিপাথা ওষুধ হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি ২৫% কমিয়েছে।
  • ক্রিসপার থেরাপিউটিকসের জিন-সম্পাদনা প্রযুক্তি-ভিত্তিক ওষুধ “CTX310” মাত্র দুই মাসে রোগীদের কোলেস্টেরল ৪৯% এবং ট্রাইগ্লিসারাইড ৫৫% পর্যন্ত কমিয়েছে।

ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের প্রতিরোধমূলক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ড. লুক ল্যাফিন বলেন, “এটি ভবিষ্যতের এক নতুন দিগন্ত—যেখানে একবারের চিকিৎসায় স্থায়ী সমাধান পাওয়া সম্ভব হবে।”


 স্ট্যাটিনের সীমাবদ্ধতা ও রোগীদের সমস্যা

১৯৮০-এর দশক থেকে লিপিটর ও জোকোরের মতো স্ট্যাটিন ওষুধ হৃদরোগ প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখলেও, এর প্রভাব সবার ক্ষেত্রে সমান নয়। যুক্তরাষ্ট্রে এখনও প্রতি চারজনের একজনের এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি (১৩০ mg/dL-এর উপরে)।

ড. জামাল রানা, কাইজার পারমানেন্টের কার্ডিওলজিস্ট, বলেন, “উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের ক্ষেত্রে শুধু স্ট্যাটিন যথেষ্ট নয়, তাই আমরা এখন লেকভিও, রিপাথা বা জেটিয়া (ইজেটিমাইব)-এর মতো ওষুধ যুক্ত করছি।”

তবে, সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) জানায়, যেসব মানুষ কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধের প্রয়োজন, তাদের অর্ধেকেরও কম নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করেন। অনেকেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যেমন পেশিতে ব্যথা বা মাথাব্যথার কারণে ওষুধ বন্ধ করে দেন।


 বাস্তব উদাহরণ: নতুন পিলের সাফল্য

৭৮ বছর বয়সী মেরি-এলেন কনওয়ে কয়েক বছর ধরে দুটি ভিন্ন স্ট্যাটিন ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তাতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি। বর্তমানে তিনি মার্কের পরীক্ষামূলক PCSK9 পিলের ট্রায়ালে অংশ নিচ্ছেন, এবং তাঁর এলডিএল কোলেস্টেরল ২০০৩ সালে ১৬৬ mg/dL থেকে নেমে এসেছে মাত্র ৩৫ mg/dL-এ।

মার্ক জানিয়েছে, তাদের এই নতুন ওষুধ “এনলিসিটাইড ডেকানোয়েট” হৃদরোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধে কতটা কার্যকর তা জানতে আরও গবেষণা চলছে। আগামী বছর তারা এফডিএ’র অনুমোদনের জন্য আবেদন করবে।


জিন-সম্পাদনা চিকিৎসার ভবিষ্যৎ

ক্রিসপার থেরাপিউটিকসের ট্রায়ালে অংশ নেওয়া ১৫ জন রোগীর মধ্যে কোনো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তবে, আরেকটি কোম্পানি ইন্টেলিয়া থেরাপিউটিকসের এক ভিন্ন ট্রায়ালে সম্প্রতি এক রোগীর মৃত্যুর পর তাদের গবেষণা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

পেন মেডিসিনের কার্ডিওলজিস্ট ও জেনেটিক গবেষক ড. কিরণ মুসুনুরু বলেন, “এ ধরনের জিন-সম্পাদনা প্রযুক্তি ২০৩০-এর দশকের মধ্যে রোগীদের জন্য স্থায়ী ও নির্দিষ্ট চিকিৎসা হিসেবে আসবে বলে আশা করা যায়। যত বিকল্প আসবে, রোগীদের জন্য ততই ভালো।”


বিশ্বজুড়ে উচ্চ কোলেস্টেরল হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ। যদিও স্ট্যাটিন অনেকের জীবন বাঁচিয়েছে, তবুও নতুন ওষুধ ও জিন-সম্পাদনা প্রযুক্তির আগমন হৃদরোগ প্রতিরোধে এক নতুন যুগের সূচনা করছে। এখন চিকিৎসক ও গবেষকদের লক্ষ্য—কম খরচে, সহজ প্রয়োগযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান তৈরি করা।


#স্বাস্থ্য #চিকিৎসা #কোলেস্টেরল #জিনসম্পাদনা #হৃদরোগ #ফার্মাসিউটিকস #নতুনওষুধ #বিজ্ঞান

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনের ক্ষমতার কেন্দ্রে শুদ্ধি অভিযান বিশ্ব রাজনীতির নতুন অস্থির সংকেত

স্ট্যাটিনের বাইরে নতুন আশা: উচ্চ কোলেস্টেরল কমাতে আসছে আধুনিক ওষুধ ও জিন-সম্পাদনার যুগ

১২:২৪:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর ২০২৫

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে নতুন চিকিৎসা সম্ভাবনা

দীর্ঘদিন ধরে স্ট্যাটিন ওষুধ উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। হৃদরোগ প্রতিরোধে এসব ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, সবার ক্ষেত্রে তা সমান কার্যকর নয়। এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে, যেখানে স্ট্যাটিন ছাড়াও কোলেস্টেরল কমানোর জন্য আরও নানা ধরনের ওষুধ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।


নতুন প্রজন্মের ওষুধ ও গবেষণার সাফল্য

বর্তমানে রোগীরা নোভার্টিসের তৈরি “লেকভিও” নামের এক আরএনএ-ভিত্তিক ইনজেকশন নিতে পারেন, যা বছরে মাত্র দুইবার প্রয়োগ করলেই যথেষ্ট। আবার কেউ চাইলে এমন ইনজেকশনও নিতে পারেন, যা শরীরের “খারাপ কোলেস্টেরল” বা এলডিএল (LDL) অপসারণে বাধা দেওয়া প্রোটিন PCSK9-কে লক্ষ্য করে কাজ করে।

অ্যামজেন নামের বায়োটেক কোম্পানি তাদের PCSK9 ওষুধ “রিপাথা” আরও বেশি রোগীর জন্য ব্যবহারের পরীক্ষা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, মার্ক (Merck) তৈরি করছে এই ওষুধের সহজে গ্রহণযোগ্য পিল সংস্করণ। পাশাপাশি, কিছু বায়োটেক প্রতিষ্ঠান জিন-সম্পাদনা (gene-editing) প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন চিকিৎসা উদ্ভাবনের চেষ্টা করছে, যা হয়তো স্থায়ীভাবে কোলেস্টেরল কমাতে সক্ষম হবে।


গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফলাফল

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সম্মেলনে সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

  • মার্কের PCSK9 পিল ছয় মাসে এলডিএল কোলেস্টেরল ৬০% পর্যন্ত কমাতে সক্ষম হয়েছে।
  • অ্যামজেনের রিপাথা ওষুধ হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি ২৫% কমিয়েছে।
  • ক্রিসপার থেরাপিউটিকসের জিন-সম্পাদনা প্রযুক্তি-ভিত্তিক ওষুধ “CTX310” মাত্র দুই মাসে রোগীদের কোলেস্টেরল ৪৯% এবং ট্রাইগ্লিসারাইড ৫৫% পর্যন্ত কমিয়েছে।

ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের প্রতিরোধমূলক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ড. লুক ল্যাফিন বলেন, “এটি ভবিষ্যতের এক নতুন দিগন্ত—যেখানে একবারের চিকিৎসায় স্থায়ী সমাধান পাওয়া সম্ভব হবে।”


 স্ট্যাটিনের সীমাবদ্ধতা ও রোগীদের সমস্যা

১৯৮০-এর দশক থেকে লিপিটর ও জোকোরের মতো স্ট্যাটিন ওষুধ হৃদরোগ প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখলেও, এর প্রভাব সবার ক্ষেত্রে সমান নয়। যুক্তরাষ্ট্রে এখনও প্রতি চারজনের একজনের এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি (১৩০ mg/dL-এর উপরে)।

ড. জামাল রানা, কাইজার পারমানেন্টের কার্ডিওলজিস্ট, বলেন, “উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের ক্ষেত্রে শুধু স্ট্যাটিন যথেষ্ট নয়, তাই আমরা এখন লেকভিও, রিপাথা বা জেটিয়া (ইজেটিমাইব)-এর মতো ওষুধ যুক্ত করছি।”

তবে, সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) জানায়, যেসব মানুষ কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধের প্রয়োজন, তাদের অর্ধেকেরও কম নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করেন। অনেকেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যেমন পেশিতে ব্যথা বা মাথাব্যথার কারণে ওষুধ বন্ধ করে দেন।


 বাস্তব উদাহরণ: নতুন পিলের সাফল্য

৭৮ বছর বয়সী মেরি-এলেন কনওয়ে কয়েক বছর ধরে দুটি ভিন্ন স্ট্যাটিন ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তাতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি। বর্তমানে তিনি মার্কের পরীক্ষামূলক PCSK9 পিলের ট্রায়ালে অংশ নিচ্ছেন, এবং তাঁর এলডিএল কোলেস্টেরল ২০০৩ সালে ১৬৬ mg/dL থেকে নেমে এসেছে মাত্র ৩৫ mg/dL-এ।

মার্ক জানিয়েছে, তাদের এই নতুন ওষুধ “এনলিসিটাইড ডেকানোয়েট” হৃদরোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধে কতটা কার্যকর তা জানতে আরও গবেষণা চলছে। আগামী বছর তারা এফডিএ’র অনুমোদনের জন্য আবেদন করবে।


জিন-সম্পাদনা চিকিৎসার ভবিষ্যৎ

ক্রিসপার থেরাপিউটিকসের ট্রায়ালে অংশ নেওয়া ১৫ জন রোগীর মধ্যে কোনো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তবে, আরেকটি কোম্পানি ইন্টেলিয়া থেরাপিউটিকসের এক ভিন্ন ট্রায়ালে সম্প্রতি এক রোগীর মৃত্যুর পর তাদের গবেষণা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

পেন মেডিসিনের কার্ডিওলজিস্ট ও জেনেটিক গবেষক ড. কিরণ মুসুনুরু বলেন, “এ ধরনের জিন-সম্পাদনা প্রযুক্তি ২০৩০-এর দশকের মধ্যে রোগীদের জন্য স্থায়ী ও নির্দিষ্ট চিকিৎসা হিসেবে আসবে বলে আশা করা যায়। যত বিকল্প আসবে, রোগীদের জন্য ততই ভালো।”


বিশ্বজুড়ে উচ্চ কোলেস্টেরল হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ। যদিও স্ট্যাটিন অনেকের জীবন বাঁচিয়েছে, তবুও নতুন ওষুধ ও জিন-সম্পাদনা প্রযুক্তির আগমন হৃদরোগ প্রতিরোধে এক নতুন যুগের সূচনা করছে। এখন চিকিৎসক ও গবেষকদের লক্ষ্য—কম খরচে, সহজ প্রয়োগযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান তৈরি করা।


#স্বাস্থ্য #চিকিৎসা #কোলেস্টেরল #জিনসম্পাদনা #হৃদরোগ #ফার্মাসিউটিকস #নতুনওষুধ #বিজ্ঞান