ইয়াশ রোহান—নতুন সময়ের বাংলা অভিনয়ধারাকে নতুন রূপ দিয়ে ওঠা এক তরুণ তারকা, যিনি নিজের অভিনয়ভাষা, নিজের নীরব সৌন্দর্য, নিজের ভেতরের গভীরতা এবং গল্পকে অনুভব করার অদ্ভুত সংবেদনশীল ক্ষমতার মাধ্যমে দ্রুতই দর্শকের মন জয় করেছেন। তাঁর যাত্রা কখনোই প্রচারের ঝলকানিতে ভর করে নয়, কখনোই মাত্র জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটে নয়, বরং শিল্পের প্রতি গভীর আগ্রহ, কাজের প্রতি অসম্ভব সততা এবং চরিত্রের ভেতরের অনুভূতিকে নিজের মধ্যে প্রবাহিত করে তাকে জীবন্ত করে তোলার অদ্ভুত প্রতিভায় দাঁড়িয়ে আছে। আজকের ডিজিটাল যুগে যখন অভিনয় অনেক সময়ই কৃত্রিমতা, অতিরিক্ত নাটকীয়তা বা সোশ্যাল মিডিয়া স্টারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন ইয়াশ রোহান একেবারেই অন্যরকম। তাঁর চোখ, তাঁর চাহনি, তাঁর দেহভঙ্গি, তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস—সবকিছু কেমন যেন গল্পের ভেতর ঢুকে থাকে। তিনি যেন কথা না বলেও গল্প বলে ফেলতে পারেন। এই নীরব ক্ষমতাই তাঁকে করে তুলেছে আরো আলাদা, আরো শক্তিশালী, আরো সত্যিকারের একজন অভিনেতা।
শৈশব ও পারিবারিক পরিবেশ: শিল্প-সংস্কৃতির বাতাসে বড় হয়ে ওঠা
ইয়াশ রোহান জন্মেছেন এমন একটি পরিবারে, যেখানে শিল্প-সংস্কৃতি জীবনেরই একটি স্বাভাবিক অংশ। তাঁর মা শ্যামলী নাসরিন বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের একটি পরিচিত মুখ, আর বাবা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু একজন সফল নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তাদের সংসারে ছোটবেলা থেকে নাটক, নাচ, গান, আলো, মঞ্চ এবং গল্প যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু এত শিল্পসমৃদ্ধ পরিবারে জন্ম নিয়েও ইয়াশ কখনোই বাবা-মায়ের পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের জায়গা তৈরি করতে চাননি। বরং ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল এক ধরনের আলাদা স্বভাব—নীরব পর্যবেক্ষণ। তিনি চারপাশের মানুষকে দেখতেন, তাদের কথা, অভিব্যক্তি, চোখের দৃষ্টি, অস্থিরতা, আনন্দ—সবখানেই তাঁর নিজস্ব ভাবনার কোনো না কোনো উৎস খুঁজে পেতেন। তাঁর চরিত্রের মূল ভিত্তি এখান থেকেই তৈরি হয়েছে। শিল্পীর মতো করে বাঁচার এই শুরুটিই তাঁর পরের অভিনয়জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

অভিনয়ে প্রথম আগ্রহ ও পেশাদার হওয়ার যাত্রা
অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মায় বিজ্ঞাপনচিত্র, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং ছোট ছোট নির্মাণে কাজ করার মধ্য দিয়ে। প্রথম দিকে তাঁকে দেখে বোঝাই যেত—এ যুবকের আগ্রহ গল্প বলায়, শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ফ্রেমে সুন্দর দেখানোর মধ্যে নয়। তাঁর অভিনয় ছিল খুবই স্বাভাবিক, মাটির গন্ধে ভরা, জীবনের ভেতর থেকে উঠে আসা। তিনি খুব বেশি সক্রিয় নন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, খুব বেশি কথা বলেন না কোনো অনুষ্ঠানে, কিন্তু অভিনয়ের সময় তাঁর নীরবতা যেন শব্দ হয়ে ওঠে। এটি এমন এক ধরনের অভিনয়শৈলী, যা অন্যদের থেকে তাঁকে আলাদা করে দেয়।
পেশাদার অভিনয়ে তাঁর প্রবেশ খুব দ্রুত হয়নি, কিন্তু যখনই তিনি অভিনয় শুরু করেন, তখন থেকেই বুঝিয়ে দেন—তিনি সাধারণ কোনো অভিনয়শিল্পী নন। তিনি গল্প বুঝতে পারেন, চরিত্রকে বুঝতে পারেন, চরিত্রের গভীর অনুভূতিগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারেন। অনেক অভিনেতা সংলাপ মুখস্থ করেন, কিন্তু ইয়াশ চরিত্রকে নিজের মতো করে অনুভব করেন। সেই অনুভবই পর্দায় প্রতিফলিত হয় তাঁর অভিনয়ে। এ কারণেই শুরুটা ধীরগতি হলেও খুব দ্রুতই একটি বিশ্বস্ত দর্শকগোষ্ঠী তৈরি হয় তাঁর।
বড় পর্দায় উত্থান: ‘স্বপ্নজাল’—একটি মাইলফলক
২০১৮ সালে গৌতম ঘোষ পরিচালিত ‘স্বপ্নজাল’-এ অভিনয় করে ইয়াশ রোহান প্রমাণ করেন তাঁর সামর্থ্য। এই সিনেমার চরিত্রটি ছিল কোমল, আবেগপূর্ণ, ভেতরে জমে থাকা অস্থিরতা ও অচেনা আকাঙ্ক্ষায় ভরা। ইয়াশ এই চরিত্রটিকে শুধু অভিনয় করেননি, বরং নিজেকে এতে পুরোপুরি বিলীন করে দিয়েছিলেন। তাঁর সংলাপ, তাঁর চাহনি, তাঁর প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি যেন চরিত্রের দুঃখ, প্রেম, প্রশ্ন আর নীরবতা তুলে ধরেছিল। ‘স্বপ্নজাল’ তাঁকে দেশ-বিদেশে দারুণ পরিচিতি এনে দেয়। তিনি শুধু নতুন প্রতিভা নন, বরং এমন একজন অভিনেতা যিনি আন্তর্জাতিক মানের অভিনয় করতে পারেন—এমন উপলব্ধিও তৈরি হয় দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে।

ডিজিটাল জগতের উত্থান ও ইয়াশের অবস্থান
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যখন বাংলাদেশের নাট্য–চলচ্চিত্র জগতে নতুন ধারা সৃষ্টি করতে শুরু করে, তখন ইয়াশ রোহান ছিলেন সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রতিনিধি। তিনি একের পর এক ওয়েবফিল্ম, ওয়েবড্রামা ও শর্টফিল্মে অভিনয় করেন এবং প্রতিটি কাজেই নিজের অভিনয়শৈলীকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যান। তাঁর জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে, কারণ তিনি কখনোই একই ধরনের চরিত্রে আটকে থাকেন না। কখনো হতাশ প্রেমিক, কখনো নীরব যন্ত্রণায় ভরা তরুণ, কখনো আত্মবিশ্বাসী আধুনিক যুবক, কখনো রোমান্টিক চরিত্র—তাঁর প্রতিটি অভিনয় নতুন অভিজ্ঞতা দিয়ে দর্শককে চমকে দেয়।
অভিনয়শৈলীর অনন্যতা: নীরবতা, গভীরতা এবং আবেগের খেলা
ইয়াশ রোহানের অভিনয়শৈলীকে আলাদা করে তুলেছে তাঁর নীরবতা। তিনি অনুভূতির অতিরিক্ত প্রকাশে যান না। তাঁর চরিত্র কথা বলে চোখ দিয়ে, দেহের নড়াচড়ায়, ক্ষুদ্র অভিব্যক্তিতে। এই নীরব অভিনয় অনেক বড় আবেগকে বহন করে। তাঁর অভিনয়ে একটি বিশেষ ধরনের বিষণ্ণতা, একটি অপূর্ণতা এবং একটি সুন্দর ব্যথা থাকে—যা দর্শককে ভিতরে ভিতরে স্পর্শ করে। তাঁর চরিত্রগুলো দেখে মনে হয়—এগুলো লেখা গল্প নয়, জীবনের গল্প।
ব্যক্তিজীবন: একাকীত্ব, সংবেদনশীলতা ও শিল্পীর ভুবন
ইয়াশ নিজের ব্যক্তিজীবন নিয়ে খুবই সংযত। তিনি আলোচনায় আসতে চান না। তিনি নিজের জীবনকে করেন শান্ত, নীরব ও গোপন। তাঁর সময় কাটে বই পড়া, ছবি তোলা, গান শোনা, চিত্রনাট্য লেখা এবং সৃজনশীল কাজের চিন্তায়। একজন সত্যিকারের শিল্পী যেমন নিজের ভেতরে নিজস্ব ভুবন তৈরি করেন, ইয়াশও তেমনই। তিনি জানেন—একজন অভিনেতার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তাঁর পর্যবেক্ষণ, তাঁর মনোযোগ, তাঁর নিঃসঙ্গতা। সে কারণেই তিনি আলোচনার বাইরে থাকেন, এবং কাজ দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেন।

ইয়াশ রোহানের উল্লেখযোগ্য পাঁচ নাটক — বিস্তৃত বিশ্লেষণ
টুপাই
‘টুপাই’ নাটকটি ইয়াশ রোহানের অভিনয় জীবনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। এই নাটকে তিনি অভিনয় করেন এমন এক তরুণের চরিত্রে, যার ভেতরে নীরবতা, আবেগ, দোটানা এবং জীবনযুদ্ধের বহু চাপ জমে থাকে। তাঁর অভিনয়ের গভীরতা এবং চরিত্রের প্রতি সম্পূর্ণ নিবেদন নাটকটিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। ইয়াশ পুরো নাটক জুড়ে খুব কম কথা বলেন, কিন্তু দর্শকের মনে তাঁর চরিত্র যে আবেগ সৃষ্টি করে, তা অনেক বেশি শক্তিশালী। তাঁর চোখের চাহনি, মুখের সামান্য পরিবর্তন, গলার স্বর—সব কিছু মিলিয়ে চরিত্রটিকে এমনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় যে দর্শক অনুভব করতে বাধ্য হয় চরিত্রটির অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণা এবং সংগ্রাম। এই নাটকটি প্রমাণ করে—ইয়াশ সংলাপের ওপর নির্ভরশীল নন, তিনি অভিব্যক্তির শক্তিতে একজন পূর্ণাঙ্গ অভিনেতা।
মিস্টার কুল
‘মিস্টার কুল’ নাটকে ইয়াশ অভিনয় করেন এক আধুনিক, আত্মবিশ্বাসী কিন্তু ভেতরে ভীষণ ভঙ্গুর চরিত্রে। তাঁর চরিত্রটি বাহ্যিকভাবে খুব সহজ, খুব স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে রয়েছে জটিল জীবনসংকট। ইয়াশ চরিত্রটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যেখানে বাহ্যিক রসিকতা ও চঞ্চলতার আড়ালে এক গভীর ব্যথা লুকিয়ে আছে। নাটকের প্রেম, হাস্যরস, টানাপোড়েন—সব কিছুই তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে বাস্তব হয়ে ওঠে। এটি তরুণ দর্শকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়, কারণ ইয়াশ চরিত্রটিকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন, যা আজকের যুবসমাজের মানসিকতা ও আবেগকে ঠিকভাবে ধারণ করে।
হার্টলেস

‘হার্টলেস’ নাটকটি ইয়াশ রোহানের অন্যতম জনপ্রিয় ও সফল কাজ। এতে তিনি এমন এক চরিত্রে অভিনয় করেন, যে প্রেমে ভেঙে পড়ে আবার দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। ভাঙনের যন্ত্রণা, স্মৃতির তাড়া, আশা–নিরাশা—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর চরিত্রটি হয়ে ওঠে অত্যন্ত বাস্তব ও মানবিক। ইয়াশ খুব সূক্ষ্মভাবে জীবনের হতাশাকে, ভাঙনের মুহূর্তগুলোকে এবং আবার উঠে দাঁড়ানোর দৃঢ়তাকে পর্দায় তুলে ধরেন। তাঁর অভিনয় দর্শককে নিজের জীবনের ভাঙন ও পুনরুত্থানের মুহূর্তগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। নাটকটি প্রকাশের পর দর্শকের আস্থা আরও বেড়ে যায়।
তোমার সাথে
‘তোমার সাথে’ নাটকে ইয়াশ রোহানের রোমান্টিক অভিনয়ের একটি নরম দিক ফুটে ওঠে। তিনি এখানে এমন এক চরিত্রে অভিনয় করেন, যার প্রেম, ভুল–বোঝাবুঝি, আবেগ এবং জীবনের টানাপোড়েন খুবই স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায়। কো–অ্যাকট্রেসের সঙ্গে তাঁর রসায়ন দর্শকের মন জয় করে এবং নাটকটি তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। সংলাপের পরিমিত ব্যবহারে, চরিত্রের আবেগ নিয়ন্ত্রণে এবং পরিণত অভিনয়ে তিনি নাটকটিকে আলাদা অবস্থানে নিয়ে যান।
লাভ রিটার্নস
‘লাভ রিটার্নস’ নাটকে ইয়াশ রোহান অভিনয় করেন এমন এক চরিত্রে, যে নিজের অতীতের টানাপোড়েন, হারানো সম্পর্ক এবং পুনর্মিলনের দ্বিধায় আটকে থাকে। নাটকে তাঁর অভিনয় এতটাই বাস্তব ও হৃদয়স্পর্শী ছিল যে দর্শকেরা নিজেদের গল্প এতে খুঁজে পান। ভেতরের যন্ত্রণা, ভালোবাসার স্মৃতি, সিদ্ধান্তহীনতা—সবকিছু অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলেন ইয়াশ। নাটকটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

দর্শকপ্রিয়তা: নীরব জোয়ারের মতো বিস্তার
ইয়াশ রোহানের জনপ্রিয়তা কখনোই তীব্র প্রচারণা থেকে আসেনি, বরং নীরবে, ধীরে ধীরে মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর অভিনয়ের সততা, চোখের গভীরতা, চরিত্রকে নিজের মধ্যে নেওয়া, খুব কম কথা বলে অনেক কিছু বোঝানোর ক্ষমতা—এসব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন আজকের অন্যতম প্রিয় তরুণ অভিনেতা। তিনি কখনোই কৃত্রিম আলোচনায় যেতে চান না; বরং নিজের কাজের মধ্যেই বাঁচেন এবং কাজের মাধ্যমেই নিজের পরিচয় তৈরি করেন।
ভবিষ্যতের পথচলা: অভিনয় থেকে গল্পকার হয়ে ওঠা
ইয়াশ রোহান ভবিষ্যতে শুধু অভিনয়েই সীমাবদ্ধ থাকতে চান না। তিনি গল্প লিখতে চান, পরিচালনা করতে চান, নতুন ধরনের চরিত্র ও গল্প দর্শকের সামনে তুলে ধরতে চান। তাঁর মাথায় রয়েছে নানান ধরনের গল্প, যেগুলো তিনি কোনো না কোনোভাবে পর্দায় রূপ দিতে চান। তিনি বিশ্বাস করেন—একজন অভিনেতা যদি গল্পকে গভীরভাবে বুঝতে পারে, তবে তার পরিচালনাও হবে শক্তিশালী ও অনুভবময়। আগামী দিনে তিনি দর্শকদের আরও নতুন কাজ উপহার দেবেন—এমন প্রত্যাশা রয়েছে।
শেষকথা
ইয়াশ রোহান আজ শুধু একজন অভিনেতা নন; তিনি নতুন সময়ের এক অভিনয়–ভাষা, এক অনুভূতি, এক নীরব শক্তি। তাঁর অভিনয় ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে, কোমলভাবে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। তিনি নিজের পথে হাঁটেন, নিজের নিয়মে কাজ করেন, নিজের নীরবতাকে শক্তি বানান। আর অভিনয়ের পৃথিবী বলে—যারা নিজের পথ ধরে এগোয়, তারা একদিন শিল্পের শিখরে পৌঁছায়। ইয়াশও সেই পথেই হাঁটছেন এবং তাঁর যাত্রা এখনও অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে প্রস্তুত।
#YashRohan #BanglaFeature #EntertainmentBD #BanglaNatok
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















