০২:২৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬
চীনের কয়লাখনি বিস্ফোরণ: প্রযুক্তির অগ্রগতির আড়ালে রয়ে গেছে শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ জীবন ৪৫ ডিগ্রি তাপেও থামে না জীবন, দিল্লির শ্রমজীবী মানুষের কাছে বেঁচে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ ভাইরাল নাচে নতুন প্রাণ পাচ্ছে গান, বদলে যাচ্ছে পপসংস্কৃতির চিত্র পেন্টাগনের গোপন ইউএফও নথি প্রকাশ, রহস্য আরও ঘনীভূত চালের দামের রকেট গতি, বাংলাদেশি টাকায় ১১৬ টাকা কেজি দরে ৫ লাখ টন চাল রপ্তানি করছে ইন্দোনেশিয়া দিল্লির সাকেত মেট্রো স্টেশনের কাছে বহুতল ভবন ধস, ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়ার আশঙ্কা টয়োটার বড় সিদ্ধান্ত: স্থগিত হচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মের বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রকল্প বিতর্কে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ স্থগিত মোদির মিতব্যয়ী বার্তা নিয়ে অসন্তোষ, চাপে ভারতের মধ্যবিত্ত ও করদাতা শ্রেণি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শক্তিশালী হচ্ছে কর্তৃত্ববাদী শাসন, নেতৃত্বে নতুন মুখের উত্থান

তিতাসের লাইনে তীব্র নিম্নচাপে ঢাকাজুড়ে গ্যাস সংকট, চরম ভোগান্তিতে নগরবাসী

ঢাকাজুড়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির বিতরণ লাইনে তীব্র নিম্নচাপের কারণে ভয়াবহ গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় দৈনন্দিন জীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। রান্নাসহ ঘরোয়া কাজে গ্যাস না পেয়ে বাসিন্দাদের ব্যয়বহুল ও ঝামেলাপূর্ণ বিকল্পের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে।

তিতাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঢাকার বেশিরভাগ এলাকা তাদের গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্কের আওতায়। গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন এলাকায় পাইপলাইনে একের পর এক ত্রুটির কারণে কোথাও গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম, কোথাও একেবারেই সরবরাহ নেই।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, তিতাস যাকে নিম্নচাপ বলছে, বাস্তবে তা প্রায় সম্পূর্ণ গ্যাস বন্ধ থাকারই নামান্তর। ফলে স্বাভাবিক রান্না তো দূরের কথা, নিত্যদিনের কাজ চালানোই কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবার বাড়তি দামে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছে। কোথাও কোথাও বৈদ্যুতিক চুলা, আবার কোনো এলাকায় ছাদের ওপর জ্বালানি কাঠ জ্বালিয়েও রান্না করতে দেখা যাচ্ছে।

উত্তরার বাসিন্দা রিয়াদ হোসেন জানান, বৃহস্পতিবার সারাদিনই উত্তরাসহ আশপাশের এলাকায় গ্যাস ছিল না। শুক্রবার সকালে সরবরাহ এলেও চাপ এতটাই কম যে স্বাভাবিকভাবে রান্না করা যাচ্ছে না।

আব্দুল্লাহপুরের জাহিদুর রহমান বলেন, কয়েক দিন ধরেই তার এলাকায় গ্যাস সংকট চরমে। দিনে প্রায় কোনো গ্যাসই থাকে না। অল্প যে গ্যাস আসে, তাতে এক হাঁড়ি পানি ফুটাতেই প্রায় এক ঘণ্টা লেগে যায়। বাধ্য হয়ে এলপিজি কিনতে হচ্ছে, কেউ কেউ কাঠ জ্বালিয়েও রান্না করছে।

এক বিবৃতিতে তিতাস জানিয়েছে, সার্ভিস লাইনে বারবার ত্রুটি দেখা দেওয়ায় ঘন ঘন মেরামতের কাজ করতে হচ্ছে, এতে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি আমিনবাজার এলাকায় তুরাগ নদীর নিচে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইনে একটি কার্গো ট্রলারের নোঙরের আঘাতে ক্ষতি হয়। একবার মেরামতের পরও পাইপলাইনে পানি ঢুকে পড়ায় আবার কাজ করতে হয়েছে।

এই পরিস্থিতির কারণে উত্তর, দক্ষিণখান, উত্তরখান, আব্দুল্লাহপুর, টঙ্গী ও গাজীপুর এলাকায় কয়েক দিন ধরেই গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কম রয়েছে বলে জানিয়েছে তিতাস।

এদিকে বাসাবো ও খিলগাঁওয়ের বাসিন্দারা বলছেন, সেখানে টানা তিন দিন ধরে একেবারেই গ্যাস নেই, অথচ তিতাস এটিকে নিম্নচাপ বলে উল্লেখ করছে। বাসাবোর মাদারটেক এলাকার বাসিন্দা ফরিদা আখতার জানান, ভোরে উঠে রান্না না করলে উপায় নেই। দিনে গ্যাস থাকে না, বিকেলে সামান্য এলেও তা রান্নার জন্য যথেষ্ট নয়।

খিলগাঁওয়ের তাবাসসুম শিমু প্রশ্ন তুলেছেন, নিয়মিত মাসিক বিল দেওয়ার পরও কেন গ্যাস ছাড়া থাকতে হবে। এক সপ্তাহ ধরে লাইনে সমস্যা চলছে, এর দায় তিতাসকেই নিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী ও আদাবর থেকেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় প্রায় বিশ ঘণ্টা ধরে গ্যাস পুরোপুরি বন্ধ থাকার কথা জানিয়েছেন বাসিন্দারা। মোহাম্মদপুরের তাহসিন জেবা বলেন, আগের রাত থেকে গ্যাস নেই, দুপুর গড়ালেও আসেনি। এই সুযোগে এলপিজির দামও বেড়েছে।

ধানমন্ডির জিগাতলার বাসিন্দা লিপি আখতার বলেন, কর্মজীবী নারীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন। অফিসে যাওয়ার আগে গ্যাস নেই, ফিরে এসেও নেই। পরিবারকে খাওয়াতে বাইরে থেকে খাবার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

পরবর্তীতে তিতাস জানায়, গণভবনের কাছে মিরপুর রোডে একটি গ্যাস ভালভ বিস্ফোরিত হওয়ায় কয়েকটি এলাকায় সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। নতুন ভালভ বসানো হলেও স্বাভাবিক হতে আরও কিছু সময় লাগতে পারে বলে জানানো হয়েছে।

তিতাসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নগরজুড়ে একাধিক গ্যাস লিকেজ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করেছে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় এবং আগেই কম চাপ থাকায় অনেক এলাকায় কার্যত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ তিতাসের তীব্র সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, দীর্ঘদিন গ্যাস না দিয়েও পুরো মাসের বিল নেওয়া নাগরিকদের কাছ থেকে কার্যত অর্থ লুটের শামিল। প্রতি বছর তিতাস গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দুই হাজার কোটি টাকা আদায় করলেও সেবার মানে কোনো উন্নতি নেই।

তিনি আরও বলেন, জ্বালানি বিভাগ ২০১৫ সালেই প্রিপেইড গ্যাস মিটার চালুর কথা বলেছিল। সেগুলো থাকলে গ্রাহকরা যতটুকু ব্যবহার করতেন, ততটুকুরই টাকা দিতেন এবং লিকেজও সহজে ধরা পড়ত। এক দশক পেরিয়েও কেন এটি বাস্তবায়ন হয়নি, সে প্রশ্নের জবাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকেই দিতে হবে।

তার মতে, এই সংকটে জ্বালানি বিভাগ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো দায় এড়াতে পারে না। শুধু দুঃখ প্রকাশ যথেষ্ট নয়, ভোগান্তির জন্য গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত।

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনের কয়লাখনি বিস্ফোরণ: প্রযুক্তির অগ্রগতির আড়ালে রয়ে গেছে শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ জীবন

তিতাসের লাইনে তীব্র নিম্নচাপে ঢাকাজুড়ে গ্যাস সংকট, চরম ভোগান্তিতে নগরবাসী

১০:৫৫:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

ঢাকাজুড়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির বিতরণ লাইনে তীব্র নিম্নচাপের কারণে ভয়াবহ গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় দৈনন্দিন জীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। রান্নাসহ ঘরোয়া কাজে গ্যাস না পেয়ে বাসিন্দাদের ব্যয়বহুল ও ঝামেলাপূর্ণ বিকল্পের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে।

তিতাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঢাকার বেশিরভাগ এলাকা তাদের গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্কের আওতায়। গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন এলাকায় পাইপলাইনে একের পর এক ত্রুটির কারণে কোথাও গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম, কোথাও একেবারেই সরবরাহ নেই।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, তিতাস যাকে নিম্নচাপ বলছে, বাস্তবে তা প্রায় সম্পূর্ণ গ্যাস বন্ধ থাকারই নামান্তর। ফলে স্বাভাবিক রান্না তো দূরের কথা, নিত্যদিনের কাজ চালানোই কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবার বাড়তি দামে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছে। কোথাও কোথাও বৈদ্যুতিক চুলা, আবার কোনো এলাকায় ছাদের ওপর জ্বালানি কাঠ জ্বালিয়েও রান্না করতে দেখা যাচ্ছে।

উত্তরার বাসিন্দা রিয়াদ হোসেন জানান, বৃহস্পতিবার সারাদিনই উত্তরাসহ আশপাশের এলাকায় গ্যাস ছিল না। শুক্রবার সকালে সরবরাহ এলেও চাপ এতটাই কম যে স্বাভাবিকভাবে রান্না করা যাচ্ছে না।

আব্দুল্লাহপুরের জাহিদুর রহমান বলেন, কয়েক দিন ধরেই তার এলাকায় গ্যাস সংকট চরমে। দিনে প্রায় কোনো গ্যাসই থাকে না। অল্প যে গ্যাস আসে, তাতে এক হাঁড়ি পানি ফুটাতেই প্রায় এক ঘণ্টা লেগে যায়। বাধ্য হয়ে এলপিজি কিনতে হচ্ছে, কেউ কেউ কাঠ জ্বালিয়েও রান্না করছে।

এক বিবৃতিতে তিতাস জানিয়েছে, সার্ভিস লাইনে বারবার ত্রুটি দেখা দেওয়ায় ঘন ঘন মেরামতের কাজ করতে হচ্ছে, এতে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি আমিনবাজার এলাকায় তুরাগ নদীর নিচে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইনে একটি কার্গো ট্রলারের নোঙরের আঘাতে ক্ষতি হয়। একবার মেরামতের পরও পাইপলাইনে পানি ঢুকে পড়ায় আবার কাজ করতে হয়েছে।

এই পরিস্থিতির কারণে উত্তর, দক্ষিণখান, উত্তরখান, আব্দুল্লাহপুর, টঙ্গী ও গাজীপুর এলাকায় কয়েক দিন ধরেই গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কম রয়েছে বলে জানিয়েছে তিতাস।

এদিকে বাসাবো ও খিলগাঁওয়ের বাসিন্দারা বলছেন, সেখানে টানা তিন দিন ধরে একেবারেই গ্যাস নেই, অথচ তিতাস এটিকে নিম্নচাপ বলে উল্লেখ করছে। বাসাবোর মাদারটেক এলাকার বাসিন্দা ফরিদা আখতার জানান, ভোরে উঠে রান্না না করলে উপায় নেই। দিনে গ্যাস থাকে না, বিকেলে সামান্য এলেও তা রান্নার জন্য যথেষ্ট নয়।

খিলগাঁওয়ের তাবাসসুম শিমু প্রশ্ন তুলেছেন, নিয়মিত মাসিক বিল দেওয়ার পরও কেন গ্যাস ছাড়া থাকতে হবে। এক সপ্তাহ ধরে লাইনে সমস্যা চলছে, এর দায় তিতাসকেই নিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী ও আদাবর থেকেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় প্রায় বিশ ঘণ্টা ধরে গ্যাস পুরোপুরি বন্ধ থাকার কথা জানিয়েছেন বাসিন্দারা। মোহাম্মদপুরের তাহসিন জেবা বলেন, আগের রাত থেকে গ্যাস নেই, দুপুর গড়ালেও আসেনি। এই সুযোগে এলপিজির দামও বেড়েছে।

ধানমন্ডির জিগাতলার বাসিন্দা লিপি আখতার বলেন, কর্মজীবী নারীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন। অফিসে যাওয়ার আগে গ্যাস নেই, ফিরে এসেও নেই। পরিবারকে খাওয়াতে বাইরে থেকে খাবার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

পরবর্তীতে তিতাস জানায়, গণভবনের কাছে মিরপুর রোডে একটি গ্যাস ভালভ বিস্ফোরিত হওয়ায় কয়েকটি এলাকায় সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। নতুন ভালভ বসানো হলেও স্বাভাবিক হতে আরও কিছু সময় লাগতে পারে বলে জানানো হয়েছে।

তিতাসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নগরজুড়ে একাধিক গ্যাস লিকেজ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করেছে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় এবং আগেই কম চাপ থাকায় অনেক এলাকায় কার্যত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ তিতাসের তীব্র সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, দীর্ঘদিন গ্যাস না দিয়েও পুরো মাসের বিল নেওয়া নাগরিকদের কাছ থেকে কার্যত অর্থ লুটের শামিল। প্রতি বছর তিতাস গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দুই হাজার কোটি টাকা আদায় করলেও সেবার মানে কোনো উন্নতি নেই।

তিনি আরও বলেন, জ্বালানি বিভাগ ২০১৫ সালেই প্রিপেইড গ্যাস মিটার চালুর কথা বলেছিল। সেগুলো থাকলে গ্রাহকরা যতটুকু ব্যবহার করতেন, ততটুকুরই টাকা দিতেন এবং লিকেজও সহজে ধরা পড়ত। এক দশক পেরিয়েও কেন এটি বাস্তবায়ন হয়নি, সে প্রশ্নের জবাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকেই দিতে হবে।

তার মতে, এই সংকটে জ্বালানি বিভাগ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো দায় এড়াতে পারে না। শুধু দুঃখ প্রকাশ যথেষ্ট নয়, ভোগান্তির জন্য গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত।