জ্বালানি ব্যবসায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের শেল গ্যাস খাতে প্রবেশ করছে জাপানের শীর্ষ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মিতসুবিশি করপোরেশন। সাতশ পঞ্চাশ কোটি ডলারের এই অধিগ্রহণের মাধ্যমে লুইজিয়ানা ও টেক্সাসে অবস্থিত শেল গ্যাস সম্পদ কিনছে তারা, যা ভবিষ্যতের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কৌশলে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে মিতসুবিশির বড় প্রবেশ
শুক্রবার এক বিবৃতিতে মিতসুবিশি জানায়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কোম্পানি এইথন এবং এর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কিনছে। চুক্তির আওতায় নগদ অর্থের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বিপুল অংকের ঋণ ও নিজেদের কাঁধে নিচ্ছে মিতসুবিশি। এটিই যুক্তরাষ্ট্রে মিতসুবিশির প্রথম সরাসরি গ্যাস উৎপাদন সম্পদ অধিগ্রহণ।
হেইন্সভিল অববাহিকা ও গ্যাস উৎপাদন সম্ভাবনা
এইথনের কার্যক্রম মূলত হেইন্সভিল অববাহিকায়, যা লুইজিয়ানা ও টেক্সাস জুড়ে বিস্তৃত। এই অঞ্চলে বর্তমানে এত পরিমাণ গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে, যা থেকে বছরে প্রায় দেড় কোটি টন তরল প্রাকৃতিক গ্যাস তৈরি সম্ভব। ভবিষ্যতে উৎপাদন আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এলাকাটি যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলের কাছাকাছি হওয়ায় এখান থেকে তরল গ্যাস রপ্তানির সুবিধা অনেক বেশি। মিতসুবিশির অংশীদারিত্ব থাকা ক্যামেরন তরল গ্যাস কেন্দ্র ও এই অঞ্চলের কাছেই অবস্থিত।
সম্পূর্ণ জ্বালানি শৃঙ্খল গড়ার লক্ষ্য
মিতসুবিশির মতে, এই বিনিয়োগ শুধু আয়ের ভিত্তি শক্ত করবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাস উত্তোলন থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন, তথ্য কেন্দ্র, রাসায়নিক শিল্পসহ একটি সমন্বিত জ্বালানি শৃঙ্খল গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, অর্জিত গ্যাসের একটি অংশ ভবিষ্যতে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনেও ব্যবহার করা হতে পারে।

জাপানি কোম্পানিগুলোর যুক্তরাষ্ট্র মুখী ঝোঁক
সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের জ্বালানি কোম্পানিগুলোর যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাস সম্পদ কেনার প্রবণতা বেড়েছে। এর আগে জাপানের বড় বিদ্যুৎ উৎপাদক জেরা একই ধরনের অধিগ্রহণের ঘোষণা দেয়। টোকিও গ্যাস, ওসাকা গ্যাস ও শিজুওকা গ্যাসও গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাস সম্পদ নিশ্চিত করতে সক্রিয় হয়েছে।
বিশ্ব জ্বালানি রূপান্তর ও তরল গ্যাসের ভূমিকা
বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে জ্বালানি রূপান্তর চললেও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসকে এখনও গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরল গ্যাস রপ্তানিকারক। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ভবিষ্যতে বৈশ্বিক তরল গ্যাসের চাহিদা আরও বাড়বে। মিতসুবিশির বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য এবং আগামী দশকে তা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা
বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যকেন্দ্র দ্রুত বাড়ছে, যার ফলে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সংস্থার মতে, আগামী কয়েক বছরে বিদ্যুৎ ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বাড়বে, যা নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল জ্বালানি উৎসের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে তুলছে।
দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের বাস্তবতা
মিতসুবিশির প্রধান নির্বাহী কাটসুয়া নাকানিশি বলেন, কার্বন নিরপেক্ষ সমাজের লক্ষ্য অপরিবর্তনীয় হলেও এই রূপান্তর দীর্ঘ সময় নেবে। তার মতে, শুধুমাত্র নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভর করা অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বর্তমান বাস্তবতায় প্রাকৃতিক গ্যাসই তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন ও স্থিতিশীল দামের জ্বালানি হিসেবে সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















