বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পথচলার কঠোর প্রতিফলন এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইলন মাস্ক গর্ব করে বলেছিলেন, ইউএসএইডকে যেন কাঠচিপার যন্ত্রে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে—ঠিক তখনই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু করে সংস্থাটির ওপর অপ্রত্যাশিত আঘাত হানেন। এক বছর পর দেখা যাচ্ছে এর ভয়াবহ মানবিক প্রভাব। বিশ্বজুড়ে মানবিক সহায়তা পৌঁছেছে আগের বছরের তুলনায় আড়াই কোটি কম মানুষের কাছে, অথচ প্রয়োজন বেড়েছে। সংকটাপন্ন এলাকায় দুই হাজারের বেশি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। বৈশ্বিক খাদ্য সহায়তার অর্থায়ন কমেছে প্রায় চল্লিশ শতাংশ। লক্ষ লক্ষ মানুষ এইচআইভি চিকিৎসা ও পরীক্ষার সুযোগ হারিয়েছে।
মানবিক ক্ষতির বাইরেও এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকার গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিতে পরিচালিত প্রশাসন প্রথমেই সহায়তা গ্রহীতাদের ত্যাগ করেছে, পরে মিত্র দেশগুলোকেও দূরে ঠেলে দিয়েছে এবং আইনি প্রশ্নবিদ্ধ সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে ইউএসএইডের দ্রুত পতন এখন ভূরাজনৈতিক অন্ধকার পরিবর্তনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
নিষ্ঠুর বিশ্বদৃষ্টির প্রতিফলন
ইউএসএইড বন্ধের নির্মমতা এমন এক বিশ্বদৃষ্টির পরিচয় দেয়, যেখানে নৈতিক নেতৃত্বের বদলে কেবল ক্ষমতা, প্রাধান্য ও স্বার্থই মুখ্য। ইউএসএইড শুধু মানবিক সহায়তার কর্মসূচি ছিল না; এটি ছিল বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র কেমন ভূমিকা রাখতে চায় তার প্রতীক। নতুন নীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে এবং অনেক বৈশ্বিক নেতা দেশটিকে স্থিতিশীল মিত্রের বদলে অনিশ্চিত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন।
সহায়তা কমে যাওয়ার বাস্তব মানবিক মূল্য
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রাণ ও উন্নয়ন কর্মসূচির আশি শতাংশের বেশি বাতিল করার পর জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তায় ব্যয় কমে ২০২৪ সালের ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি থেকে ২০২৫ সালে নেমে আসে মাত্র ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে। বৈশ্বিক সহায়তায় ১০ বিলিয়ন ডলার কমানো যুক্তরাষ্ট্রের বাজেটের তুলনায় সামান্য মনে হলেও সুদান, বাংলাদেশ, গাজা কিংবা কেনিয়া ও চাদের শরণার্থী শিবিরের মানুষের জীবনের জন্য এই অর্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
রুবিও দাবি করেছিলেন, এই কাটছাঁটে কেউ মারা যায়নি এবং কম অর্থ দিয়েও বেশি ভালো করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কেনিয়ায় খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ার পর অনাহারে শিশু মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মসূচি বন্ধ হওয়ায় চিকিৎসাযোগ্য রোগে মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। এইচআইভি কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে শিশুদের এই ভাইরাস নিয়ে জন্মানোর ঘটনাও বেড়েছে।
সংকট অঞ্চলে নীরব বিপর্যয়
দৃশ্যমান মৃত্যুর বাইরে আরও ভয়াবহ প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। বহু পরিবার টিকে থাকার জন্য সম্পদ বিক্রি, খাবার কম খাওয়া, ঋণে ডুবে যাওয়া, যৌন শ্রমে বাধ্য হওয়া কিংবা পরবর্তী বছরের বীজ খেয়ে ফেলার মতো মরিয়া কৌশল নিচ্ছে—যা সাধারণত বড় দুর্ভিক্ষের আগে দেখা যায়। এসব কৌশল শেষ হয়ে গেলে মৃত্যুহার দ্রুত বাড়ে।
বিশ্বের বিভিন্ন সংকট থেকে পাওয়া তথ্য একই সতর্কবার্তা দিচ্ছে। সোমালিয়ায় তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং মৃত্যুহার প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশে শরণার্থী পরিবারগুলো সহায়তা কমে যাওয়ায় শিশুবিবাহ বাড়ছে। কেনিয়ায় রেশন কমায় শিবিরে বিক্ষোভ ও অনাহারজনিত মৃত্যু ঘটছে। আফগানিস্তানে নারী ও কন্যাশিশুদের সেবা ভেঙে পড়ছে, অনেক নারী পরিবারের পুরুষদের জন্য খাবার ছেড়ে দিচ্ছেন। দক্ষিণ সুদানে স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন কর্মসূচি বন্ধ হওয়ার পর কলেরায় মৃত্যুর হার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
রাজনীতিকরণ ও বিতর্কিত ব্যয়
একই সময়ে পররাষ্ট্র দপ্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ নানা ব্যয়ে অর্থ খুঁজে পেয়েছে। গাজায় একটি বিতর্কিত মানবিক ফাউন্ডেশনকে বিপুল অর্থ দেওয়া হয়েছে, যার কার্যক্রমের ফলে শত শত ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ। আবার শরণার্থী সহায়তার জন্য নির্ধারিত অর্থের একটি অংশ অন্য একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের কাছে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কৃত তৃতীয় দেশের নাগরিকদের গ্রহণ করে।
সহায়তার নেতৃত্ব ইউএসএইড থেকে সরিয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরে নেওয়ার ফলে নীতির লক্ষ্য বদলে গেছে—সহযোগিতা গড়ে তোলার বদলে ছাড় আদায়ই প্রধান হয়ে উঠেছে।
ঐতিহাসিক দর্শনের অবসান
১৯৬১ সালে প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি ইউএসএইড প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দুটি উদ্দেশ্যে—আমেরিকান মূল্যবোধ তুলে ধরা এবং জাতীয় নিরাপত্তা শক্তিশালী করা। ছয় দশক ধরে ধারণা ছিল, বিশ্বে কল্যাণ সাধন করলে তা যুক্তরাষ্ট্রেরও মঙ্গল বয়ে আনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সহযোগিতামূলক বৈশ্বিক ব্যবস্থাই ইতিহাসের দীর্ঘতম নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময় সৃষ্টি করেছিল।
ভবিষ্যতের অনিশ্চিত বিশ্ব
শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তা নীতি নির্ধারণ করে দেশটি বিশ্বে কেমন হতে চায় এবং কেমন বিশ্ব গড়তে চায়। বর্তমান নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এক দশক পরের বিশ্ব হবে আরও কঠোর, অস্বচ্ছ ও হতাশায় ভরা—যেখানে ক্ষুধা, প্রতিরোধযোগ্য রোগ ও মানবিক দুর্দশা ছড়িয়ে পড়বে, আর যুক্তরাষ্ট্র দাঁড়াবে আরও একাকী অবস্থানে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















