চীনের নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল ডিপসিক বিশ্বকে চমকে দেওয়ার মাত্র এক বছরের মধ্যেই দেশটি আরেকটি বড় ধাক্কা দিয়েছে। এবার সেই চমক এসেছে দ্রুত অগ্রসরমান মানবাকৃতি রোবটের মাধ্যমে।
১৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ২০২৬ সালের সিসিটিভি বসন্ত উৎসব গালায়, যা সাংস্কৃতিক প্রভাবের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সুপার বোলের সমতুল্য, শত কোটি দর্শক টেলিভিশনে দেখেছেন চীনে তৈরি রোবটের জটিল মার্শাল আর্ট পরিবেশনা। মাতাল বক্সিং, নানচাকু কৌশল ও অ্যাক্রোবেটিক পারকুর প্রদর্শনের মাধ্যমে এই রোবটগুলো চীনের রোবোটিক সক্ষমতায় নাটকীয় অগ্রগতি তুলে ধরে। একই সঙ্গে বোঝায়, সফটওয়্যারভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাফল্য থেকে হার্ডওয়্যার উদ্ভাবনের দিকে চীন কত দ্রুত এগোচ্ছে।
এই মুহূর্তের শিকড় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সে সময় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং শীর্ষ বেসরকারি প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের নিয়ে একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। সেখানে আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা এবং তখনও তুলনামূলকভাবে অখ্যাত ডিপসিকের প্রতিষ্ঠাতা লিয়াং ওয়েনফেং উপস্থিত ছিলেন। এরপরের ঘটনাপ্রবাহ এখন সুপরিচিত। ডিপসিক চীনকে বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিযোগিতার শীর্ষ সারিতে নিয়ে যায়, যেখানে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি, গুগলের জেমিনি এবং মেটার লামার মতো প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। তবে শি কেবল সফটওয়্যারেই থেমে থাকেননি। গত এক বছরে তিনি মানবাকৃতি রোবোটিকসকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে উন্নীত করেছেন। সম্ভাবনাময় অন্তত পাঁচটি রোবোটিক স্টার্টআপের প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে বৈঠক করে তিনি স্পষ্ট করেছেন, চীনকে শুধু বিশ্বের কারখানা নয়, ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারখানায় রূপান্তর করতে চান।
এই কৌশলের ফল এখন দৃশ্যমান। এবারের বসন্ত উৎসব গালা ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং হার্ডওয়্যার উভয় ক্ষেত্রে চীনের অগ্রগতির স্পষ্ট প্রমাণ। সরাসরি সম্প্রচারে শীর্ষ কোম্পানির রোবটগুলো এমন উচ্চ-নির্ভুল ও গতিশীল চলাচল প্রদর্শন করে, যা কিছুদিন আগেও বর্তমান প্রযুক্তির নাগালের বাইরে বলে মনে করা হতো। ইউনিট্রি রোবোটিকসের জি১ ও এইচ১ মডেল সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাত-দেড় বার ঘূর্ণায়মান এয়ারফ্লেয়ার স্পিন, প্রতি সেকেন্ডে চার মিটার গতিতে দ্রুত ফরমেশন পরিবর্তন এবং পড়ে যাওয়ার পর তাৎক্ষণিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের মতো কৌশল প্রদর্শন করে। উন্নত গতিনিয়ন্ত্রণ অ্যালগরিদম ও ত্রিমাত্রিক লাইডার সেন্সিং ব্যবস্থার সহায়তায় এসব সম্ভব হয়েছে।

ইউনিট্রির প্রতিষ্ঠাতা ওয়াং সিংসিং, যিনি গত বছর শির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, গালার পর জানান যে ২০২৬ সালে তিনি প্রায় ২০ হাজার মানবাকৃতি রোবট সরবরাহের প্রত্যাশা করছেন। পাশাপাশি ম্যাজিকল্যাব, গ্যালবট ও নোয়েটিক্সের মতো উদীয়মান প্রতিষ্ঠানও অ্যাক্রোবেটিকস থেকে শুরু করে আখরোট ভাঙা ও ভঙ্গুর বস্তু মানবসদৃশ দক্ষতায় ধরার মতো সূক্ষ্ম কাজ প্রদর্শন করেছে। এসব পরিবেশনা বৈশ্বিক বিশেষজ্ঞদের প্রশংসা কুড়িয়েছে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ডায়নামিকসের সাম্প্রতিক মডেলগুলোর সঙ্গে তুলনায়, যেগুলো এখনও এমন জটিল রুটিনে পিছিয়ে আছে।
ওয়াংয়ের পূর্বাভাস সত্যি হলে ঘোড়া বর্ষ স্মরণীয় হয়ে থাকবে চীনের গণউৎপাদিত মানবাকৃতি রোবট যুগে প্রবেশের মুহূর্ত হিসেবে। উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা, গৃহসেবা এমনকি বয়স্কদের সেবাখাতে এসব যন্ত্র বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এর প্রভাব বিনোদনের গণ্ডি ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত।
ডিপসিক যদি চীনের নতুন সফট প্রযুক্তির প্রতীক হয়, তবে ইউনিট্রি ও অনুরূপ প্রতিষ্ঠানগুলো শক্ত প্রযুক্তিতে দেশের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার প্রতিফলন। উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষতা অর্জন করলে বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিযোগিতায় চীন শক্ত অবস্থান পাবে। যুক্তরাষ্ট্রের কড়া রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, বিশেষত উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপে বিধিনিষেধ সত্ত্বেও এই অগ্রগতি এসেছে। ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি শর্তসাপেক্ষে এনভিডিয়ার এইচ২০০ চিপ চীনে বিক্রির অনুমতি দিয়েছে।
এক সময় আধুনিক রোবোটিকসের অগ্রদূত ছিল জাপান। আশি ও নব্বইয়ের দশকে হোন্ডা, সনি ও টয়োটার মতো কোম্পানি হোন্ডার আসিমো ও সনির আইবো তৈরি করে বিশ্বমান স্থাপন করেছিল। তবে শিল্প স্বয়ংক্রিয়তা ও প্রাথমিক মানবাকৃতি গবেষণায় এগিয়ে থাকলেও পরবর্তীতে জাপানের গতি কমে যায়। সতর্ক করপোরেট সংস্কৃতি, ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা হ্রাস এবং বয়স্ক জনসংখ্যা এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে চীন তুলনামূলক দেরিতে প্রবেশ করেও বিশাল পরিসর, আগ্রাসী রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ ও দ্রুত অভিযোজিত বেসরকারি খাতের কারণে দ্রুত এগিয়েছে। গত কয়েক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোবোটিকসে বিপুল পুঁজি, দক্ষ জনবল ও নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ফলে ইউনিট্রি ও ইউবিটেক রোবোটিকসের মতো প্রতিষ্ঠান দ্রুত প্রোটোটাইপ থেকে গণবাজারের পণ্যে রূপান্তর ঘটাতে পেরেছে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। উচ্চ-নির্ভুল অ্যাকচুয়েটর, উন্নত সেন্সর এবং তাৎক্ষণিক গতিনিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চক্ষমতার চিপের ক্ষেত্রে চীন এখনও বিদেশি সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরশীল, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর।
এই প্রেক্ষাপটে শির বার্তা স্পষ্ট। কৌশলগত খাতে পশ্চিমা প্রযুক্তিনির্ভরতা কমিয়ে আত্মনির্ভরতা বাড়াতে হবে। মানবাকৃতি রোবটের সাফল্য দেশীয় উদ্ভাবনে জোরদার প্রচেষ্টাকে আরও ত্বরান্বিত করবে। ধারণা করা হয়, ২০৩০ সালের মধ্যে এনভিডিয়ার এইচ২০০-এর সমমানের চিপ তৈরিতে হুয়াওয়ে টেকনোলজিস ও এসএমআইসির মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে ইতিমধ্যে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে অনেক দর্শক গালার রোবট পরিবেশনা দেখে বিস্ময় ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবোটিকস বিশেষজ্ঞ হাউই চোসেট লিখেছেন, এটি কেবল প্রদর্শনী হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয় এবং চীনের মানবাকৃতি প্ল্যাটফর্ম প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত পরিপক্ব হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিশাস্ত্র নিয়ে পরিচিত সাবেক গুগল ও অ্যালফাবেট নির্বাহী মো গাওদাতও মন্তব্য করেন, যে কেউ যদি মনে করেন রোবোটিকসে চীন পিছিয়ে আছে, তবে তিনি বাস্তবতা খেয়াল করছেন না।

অন্যদিকে ভারতের প্রেক্ষাপট ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এআই ইমপ্যাক্ট সামিটে একটি বিশ্ববিদ্যালয় চীনে তৈরি ইউনিট্রি গো২ রোবট কুকুরকে নিজেদের উদ্ভাবন হিসেবে উপস্থাপন করার অভিযোগে বিতর্কে জড়ায়। অরিয়ন নামে পুনঃব্র্যান্ড করা রোবটটি অনলাইনে দ্রুতই ইউনিট্রির বাণিজ্যিক মডেল হিসেবে শনাক্ত হয়। কর্তৃপক্ষ কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে স্টলের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, প্রদর্শনীর চারপাশে ব্যারিকেড দেয় এবং গ্যালগোটিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্মেলন থেকে বহিষ্কার করে। ঘটনাটি পশ্চিমা সামাজিক মাধ্যমেও উপহাসের জন্ম দেয় এবং দেখায়, চীনের রোবোটিকস শিল্প এত দ্রুত এগিয়েছে যে মাঝারি মানের একটি চীনা রোবটও দেশীয় অত্যাধুনিক প্রোটোটাইপ হিসেবে ভুল হওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছেছে।

যে সপ্তাহে চীনের মানবাকৃতি রোবট বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়েছে, সে সপ্তাহেই এই বৈপরীত্য ছিল স্পষ্ট।
প্রযুক্তিক্ষেত্রে চীনের উত্থান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস এবং শিগগিরই মহাকাশ প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র করবে। ৩১ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফর নির্ধারিত রয়েছে। এক বিষয় নিশ্চিত, প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে থাকবে এবং চীনের সাম্প্রতিক রোবট প্রদর্শনী সেই প্রতিযোগিতার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

লেখক:জর্জ চেন দ্য এশিয়া গ্রুপের অংশীদার ও ডিজিটাল কার্যক্রমের সহ-প্রধান। তিনি এশিয়ায় মেটা/ফেসবুকের সাবেক আঞ্চলিক নীতি পরিচালক। মার্শাল লি দ্য এশিয়া গ্রুপের হংকং কার্যালয়ের সহযোগী এবং ২০২৫ সালের শোয়ার্জম্যান স্কলার।
জর্জ চেন ও মার্শাল লি 



















