আমরা সফটওয়্যার উন্নয়নের এক নতুন রেনেসাঁয় প্রবেশ করছি। সামনে অনিশ্চয়তা থাকলেও আমাদের সবারই উত্তেজিত হওয়া উচিত।
বাজার বারবার কেঁপে উঠছে, আর আমার ইচ্ছে করে যেন আমরা একটু ব্রেক কষতে পারতাম। কিন্তু আমরা এখন ব্রেকহীন এক যুগে বাস করছি।
সপ্তাহের কর্মদিবসে সন্ধ্যায় নিউ ইয়র্ক সিটির ইউনিয়ন স্কয়ার থেকে সাবওয়েতে বাড়ি ফেরার সময় আমি ফোন থেকে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা টুলে লগ ইন করি এবং একটি নির্দেশ লিখি। লিখি, “আমি যে ফাইলগুলো আপলোড করেছি সেগুলোর ডেটা দেখো। সেগুলো একটি ডেটাবেসে লোড করো, তারপর একটি ওয়েব ইন্টারফেসের মাধ্যমে অনুসন্ধানযোগ্য করে তোলো।” সাবওয়ে টানেলে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কিন্তু ট্রেন যখন ম্যানহাটন ব্রিজে ওঠে, তখন কয়েক মিনিটের জন্য সংযোগ ফিরে পাই এবং দেখি আমার কোডিং এজেন্ট কত কাজ শেষ করেছে। দ্রুত টাইপ করতে পারলে আরেকটি নির্দেশও পাঠাতে পারি। ব্রুকলিনে বাড়ি পৌঁছানোর আগেই আমার ছোট প্রকল্পটি সাধারণত প্রস্তুত হয়ে যায়—একটি ওয়েবসাইট, একটি মিউজিক অ্যাপের নতুন ফিচার, জটিল অনুসন্ধান টুল কিংবা ছোটখাটো একটি গেম।
একে বলা হয় ভাইব কোডিং—এক বছর আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই কারপাথি এই শব্দটি ব্যবহার করেন। ভাইব কোডিং মানে হচ্ছে বিশেষায়িত চ্যাটবটকে নির্দেশ পাঠিয়ে সফটওয়্যার তৈরি করা। নিজে কোড লেখা নয়, বরং বলা—আর বট নিজেই ত্রুটি সংশোধন করে। অনেক প্রোগ্রামারের মতো আমিও অ্যানথ্রপিকের ক্লড কোড ব্যবহার করি, যদিও ওপেনএআইয়ের কোডেক্সও প্রায় সমান কার্যকর, আর গুগল জেমিনি খুব পিছিয়ে নেই। প্রথম ছয় মাসেই ক্লড কোড অ্যানথ্রপিকের জন্য এক বিলিয়ন ডলার আয় করে। এটি আগে থেকেই সহায়ক কোডিং সহকারী ছিল, কিন্তু নভেম্বর মাসে হঠাৎই অনেক উন্নত হয়ে ওঠে। তারপর থেকে বহু বছর ধরে ফোল্ডারে পড়ে থাকা সাইড প্রজেক্টগুলো একে একে শেষ করছি। পুরোনো ধারণাগুলো জীবন্ত হয়ে উঠতে দেখা সত্যিই আনন্দের, তাই প্রতিদিনই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। দিনে হয়তো আধঘণ্টা সময় দিই, আর ক্লড দেয় প্রায় এক ঘণ্টা। নভেম্বর মাস প্রযুক্তি জগতের অনেকের মতো আমার জন্যও ছিল এক বড় চমক। আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোডিং টুলগুলো উপকারী হলেও ছিল থেমে থেমে, অদক্ষ। এখন বট একটানা এক ঘণ্টা কাজ করে সম্পূর্ণ নকশাসম্পন্ন ওয়েবসাইট ও অ্যাপ বানাতে পারে—ত্রুটিপূর্ণ হলেও বিশ্বাসযোগ্য। এ নিয়ে আমি থেরাপির পুরো একটি সেশন কাটিয়েছি।
প্রযুক্তি শিল্প একটি বৈশ্বিক সংস্কৃতি—দক্ষতা ও কারিগরি নৈপুণ্যের ওপর দাঁড়ানো এক পরিচয়। দীর্ঘদিন সফটওয়্যার উন্নয়ন ছিল স্থিতিশীল মধ্যবিত্ত পেশা। কিন্তু সেটি হয়তো বদলে যাচ্ছে। যদি একশো মিলিয়ন বা এক বিলিয়ন মানুষ নিজেদের পছন্দমতো সফটওয়্যার তৈরি করতে পারে, তবে ভবিষ্যৎ কেমন হবে? এটি কি নজিরবিহীন প্রবৃদ্ধি ও সুযোগের মুহূর্ত হতে পারে?
বাজারের উত্তর বলছে, না। সম্প্রতি সফটওয়্যার কোম্পানির শেয়ার একযোগে ধসে পড়েছে—মনডে ডটকম, সেলসফোর্স, অ্যাডোবি এবং আরও অনেক। মাত্র দুই দিনে নাসডাক ১০০ থেকে অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলার উবে গেছে। অ্যানথ্রপিক আইনি কাজ স্বয়ংক্রিয় করার টুল প্রকাশ করায় আইনি সফটওয়্যার কোম্পানির শেয়ারও পড়ে গেছে। আর্থিক ও রিয়েল এস্টেট পরিষেবা খাতেও দরপতন, কারণ ব্যবসায়ীরা মনে করছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-স্বয়ংক্রিয় ভবিষ্যতে ডেস্কে বসা মানুষের প্রয়োজন কমে যাবে। যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চোখের পলকে যেকোনো কোড লিখে দিতে পারে, তখন পুরোনো সফটওয়্যারের আর প্রয়োজন কী?
আমার কাছে বিষয়টি কিছুটা অকালপক্ব মনে হয়, কিন্তু বাজার সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করে না। বড় ভাষা মডেল যখন জটিল ও ব্যয়বহুল সমস্যার সমাধান মুহূর্তে করে ফেলে—যেমন পুরোনো প্ল্যাটফর্ম থেকে আধুনিক প্ল্যাটফর্মে ডেটা স্থানান্তর—তখন সত্যিই মনে হয় মাটি কাঁপছে। আমি একসময় সফটওয়্যার পরিষেবা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী ছিলাম, পেশাদারভাবে সফটওয়্যার ব্যয়ের হিসাব করতাম। কয়েক সপ্তাহ আগে নিজের ওয়েবসাইট নতুন করে বানাতে গিয়ে বুঝলাম—আগে হলে এ কাজের জন্য আমি ২৫ হাজার ডলার দিতাম। এক বন্ধু বড় ও জটিল ডেটাসেট রূপান্তরের অনুরোধ করলে আমি সেটি ডাউনলোড করে পরিষ্কার করে সহজে ব্যবহারযোগ্য করে দিই। আগে হলে এর জন্য ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার নিতাম।
২০২১ সালের হিসেবে এ দামে পণ্য ব্যবস্থাপক, ডিজাইনার, দুই প্রকৌশলী এবং চার থেকে ছয় মাসের কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকত। কাস্টম সফটওয়্যার ভীষণ ব্যয়বহুল। এখন তবে সঠিক নির্দেশ দিলে সপ্তাহান্তে ও সন্ধ্যায় আনন্দের জন্যই কয়েক লাখ ডলারের সমমানের কাজ করে ফেলতে পারি—মাসে ২০০ ডলারের সাবস্ক্রিপশন খরচে। অনুভূতিটা সুখকর নয়। সাবেক কর্মীদের মুখ ভেসে ওঠে। এত ডিজাইনার, জাভাস্ক্রিপ্ট প্রোগ্রামার—এখন তাদের সময়ের মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করব জানি না। কিছু কোম্পানি বলছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন চাকরি তৈরি করবে, কিন্তু কেউ মনে করে না সেগুলো আগের মতোই হবে।
আমি যে সফটওয়্যার বানাচ্ছি তা হাতে তৈরি নিখুঁত কোডের মতো নয়। কিন্তু তাৎক্ষণিক ও সস্তা। টেক্সট লাইনের পরিমাণ বিশাল। হয়তো কোনো প্রতিষ্ঠানের মান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে না, কিন্তু সময়মতো সরবরাহ হবে। এখানেই এই ধাক্কার শক্তি।
প্রোগ্রামিং জগতে একটি প্রবাদ আছে—“সত্যিকারের শিল্পীরা পণ্য সরবরাহ করে।” স্টিভ জবস একবার বলেছিলেন, নিখুঁত করার চেয়ে শেষ করে বাজারে ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ। সফটওয়্যার শিল্পের বড় অংশই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে নিবেদিত—পণ্য হয়তো কখনোই বাজারে পৌঁছাবে না, এ আশঙ্কায়। ইতিহাসে দেখা গেছে, বড় পরিবর্তন এড়িয়ে চলাই নিয়ম। কিন্তু যদি এখন তা না হয়? যদি সফটওয়্যার নিজেই দ্রুত বাজারে যেতে চায়? বিশাল আমলাতন্ত্র ও ব্যয়ের কাঠামো যদি হঠাৎ উধাও হয়ে যায়? সফটওয়্যার ভালো নাও হতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ সফটওয়্যারই তো খুব ভালো নয়। পার্থক্য শুধু, পণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে।
অনেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভাইব কোডিংয়ের সমালোচনা করেন। ডেটা সেন্টারের বিপুল পানির ব্যবহার পরিবেশগত সংকট তৈরি করছে। এটি অনিরাপদ কোড তৈরি করতে পারে। একঘেয়ে অ্যাপ বানায়। আসল মূল্য মানুষের মধ্যে, সফটওয়্যারে নয়। সব যুক্তিই সত্য। কিন্তু আমি দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্পে আছি। একসময় ওয়েবকেও “আসল” সফটওয়্যার মনে করা হতো না। ব্লগিংকে প্রকাশনা বলা হতো না। বড় কোম্পানিগুলো ক্লাউডে যাবে না বলা হতো। পরে সবাই গেছে।
এখন অবশ্য ডেভেলপাররা অতিরিক্ত কাজের চাপে ক্লান্ত। ওপেন সোর্স প্রকল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-তৈরি জমা ভিড় করছে। দক্ষতা বাড়লে ব্যবহারও বাড়ে—জেভনস প্যারাডক্স তাই বলে। তাই বড় প্রযুক্তি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান যদি একদিনে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করে, অবাক হব কি?
বাজার কাঁপছে। আমরা ব্রেক কষতে পারি না। এই পরিবর্তন যেখানেই কাজ করুন না কেন, আপনার দিকেও আসছে। প্রতিদিনের সফটওয়্যারে নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ফিচার যুক্ত হচ্ছে—এটাই ঢাল বেয়ে নামার শুরু। বীমা, অর্থনীতি, স্থাপত্য, উৎপাদন, টেক্সটাইল—সবখানেই স্বয়ংক্রিয়তার চেষ্টা চলছে।
যখন বড় ভাষা মডেল যথেষ্ট নয়, তখন কোম্পানিগুলো বাস্তব জগতের অনুকরণকারী মডেল ব্যবহার করে। স্বচালিত ট্যাক্সি কোম্পানিগুলো এই প্রযুক্তির বড় ব্যবহারকারী। নিখুঁত সিলিকন ভ্যালি ব্যবস্থায় বট কোড লিখবে বট চালানোর জন্য, প্রতি মিনিটে নতুন কোড। প্রতিটি অ্যাপ নিজেই নিজেকে তৈরি করবে। তখন সেই ট্যাক্সিতে চড়ার সামর্থ্য কার থাকবে, তা অন্য বিভাগ ঠিক করবে।
গত কয়েক বছর আমি একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে কাজ করেছি, ক্লায়েন্টদের এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পথ দেখাতে। শুনতে নিখুঁত কাজ মনে হয়। কিন্তু প্রতি ছয় মাসে নতুন এক বিস্ফোরণ ঘটে, আমাদের কৌশল বদলাতে হয়, পণ্যের দিকনির্দেশনা নতুন করে সাজাতে হয়। সবাই ক্লান্ত।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের অনেক নেতা মানব চিন্তাকে কাঁচামাল হিসেবে দেখেন। সামাজিক পরিবর্তনের এই মাত্রায় দরকার সতর্ক শাসন ও নীতিমালা। কিন্তু বাস্তবে আমরা পাচ্ছি বিশৃঙ্খল নীতি ও নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার। কোনো ব্রেক নেই।
আমার প্রিয় মানুষদের অধিকাংশই এই প্রযুক্তিকে অপছন্দ করেন, আর যাদের অপছন্দ করি তারা এটি ভালোবাসেন। তবু অদ্ভুতভাবে আমি উত্তেজিত।
কারণ আমি সফটওয়্যার দুর্ভোগের গল্প সংগ্রহ করি। অভিবাসন সহায়তা সংস্থায় কাজ করা বন্ধু অসংখ্য ক্লিক করে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন তৈরি করেন। ছোট ব্যবসায়ীরা ইমেইল দিয়ে সব চালাতে গিয়ে অর্ডার হারান। আমার ডাক্তার রোগীর সঙ্গে সময় কাটানোর বদলে ইলেকট্রনিক রেকর্ড সিস্টেমে টাইপ করতে ব্যস্ত থাকেন।
এত বছরের অভিজ্ঞতায় আমি বিশ্বাস করি, কোটি কোটি প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার এখনো তৈরি হয়নি—ড্যাশবোর্ড, প্রতিবেদন, অ্যাপ, প্রকল্প ট্র্যাকার। বাজেটের অভাবে মানুষ স্প্রেডশিট আর করণীয় তালিকায় কাজ চালান।
আমাদের শিল্প প্রায়ই না বলে, বা অপ্রয়োজনীয় কিছু বিক্রি করে। সুনাম খুব ভালো নয়। কিন্তু ভাইব কোডিং আরও একটু উন্নত, সহজলভ্য ও নির্ভরযোগ্য হলে মানুষ আমাদের অপেক্ষায় থাকবে না। কয়েকটি নির্দেশনামূলক ভিডিও দেখেই শিখে নিতে পারবে। কয়েক সপ্তাহেই জটিল ওয়েব অ্যাপ বানানো শেখানো যায়। ছয় মাসে এমন অনেক কিছু করা যাবে যা শিখতে আমার ২০ বছর লেগেছে। আমি এখন এমন কোড লিখছি যা আগে পারতাম না—আপনিও পারবেন।
সত্যিটা হলো, আমার মূল্য আগের চেয়ে কমেছে। অচল হয়ে যাওয়া কষ্টদায়ক, কিন্তু ট্রেনে বসে কোড করা মজারও বটে। যদি প্রযুক্তি উন্নত হতে থাকে, তবে যারা প্রতিবেদন বানানো, অর্ডার দেওয়া, অ্যাপ আপডেট করা বা রেকর্ড সংশোধন করা কঠিন বলে অভিযোগ করেন—তারাও তাদের প্রাপ্য সফটওয়্যার পেতে পারেন। দীর্ঘমেয়াদে সেটি হয়তো ন্যায্য বিনিময়।
পল ফোর্ড 



















