মধ্যপ্রাচ্য হয়তো আরেকটি বড় যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক দিনের মধ্যেই, এমনকি কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে, পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে—যা ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের পর সবচেয়ে বড় অগ্নিসংযোগ হয়ে উঠতে পারে। জেনেভায় বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান তৃতীয় দফার গুরুত্বপূর্ণ পরোক্ষ আলোচনা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও অন্যান্য ইস্যুতে সমঝোতায় পৌঁছানোর শেষ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুদ্ধের সতর্ক সংকেত থাকলেও এখনো কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাস্তবতা হলো, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠদের কঠোর বক্তব্য এবং দ্বৈত বার্তার পরও এ অঞ্চলের কেউ আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়—যে যুদ্ধ সপ্তাহের পর সপ্তাহ, এমনকি মাসের পর মাস চলতে পারে এবং যার ফল হবে বিপর্যয়কর। ব্যতিক্রম হিসেবে কেবল ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নামই আলোচনায় উঠে আসছে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা তীব্র। যুক্তরাষ্ট্র আরব উপসাগর ও ভূমধ্যসাগরে বড় নৌবহর মোতায়েন করেছে এবং ১৫০টিরও বেশি সামরিক বিমান অঞ্চলটির ঘাঁটিতে স্থানান্তর করেছে। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের সংঘর্ষের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল ও বিস্তৃত।
বিদ্রূপাত্মক হলেও সত্য, একটি চুক্তি এখনো সম্ভব—যে চুক্তি অঞ্চলকে অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধে ঠেলে দেবে না, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করবে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমকে উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিলে চুক্তি নাগালের মধ্যেই রয়েছে। সংকট নিরসনের চাবিকাঠি এখানেই।

এই সপ্তাহে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা এবং ইউরোপ এমনকি যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের অভিযোগ আনেন। তবে একই সঙ্গে তিনি জানান, তার পছন্দের পথ এখনো কূটনৈতিক সমাধান।
অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি অনেককে বিভ্রান্ত করেছে। এতে ধারণা জন্মেছে যে হোয়াইট হাউসের লক্ষ্য হয়তো কেবল চুক্তি নয়, শাসন পরিবর্তনও হতে পারে। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, এমন পদক্ষেপ অঞ্চলকে দীর্ঘ ও অনিশ্চিত সংঘাতে নিমজ্জিত করতে পারে, যার প্রভাব ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত ছড়াবে। এই বিশৃঙ্খলা থেকে লাভবান হতে পারে কেবল ইসরায়েল।
শাসন পরিবর্তনের ঝুঁকি অঞ্চলকে দীর্ঘ ও অনিশ্চিত সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে, যার প্রভাব ইরানের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিস্তৃত হবে।
ট্রাম্পের পক্ষে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালানো সহজ নয়। সীমিত লক্ষ্যভিত্তিক হামলার বাইরে গিয়ে ইরানি শাসনব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেওয়ার মতো পূর্ণমাত্রার সামরিক আক্রমণের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো অভিপ্রায় নেই বলে আশ্বাস দিয়েছে। এমনকি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম প্রতীকী পর্যায়ে নামিয়ে আনার ইঙ্গিতও দিয়েছে।
মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, দীর্ঘস্থায়ী হামলা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের গুরুত্বপূর্ণ মজুত কমিয়ে দেবে। অন্যদিকে ইরান রাশিয়া ও চীন থেকে উন্নত রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহ করেছে বলে জানা গেছে, যা গত জুনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য সামরিক অভিযান অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বোমাবর্ষণে বিধ্বস্ত স্থাপনার নিচে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পুনরুদ্ধারের চেষ্টা ইরান এখনো করেনি এবং সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিও পুনরায় চালু হয়নি। ফলে অবশিষ্ট বড় ইস্যু হলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, যা তেহরান প্রতিরোধ ক্ষমতা ও সার্বভৌম অধিকারের অংশ হিসেবে দেখে। এই বিষয়টি, যা নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকে জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়, চুক্তির পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইতোমধ্যে ইসরায়েল ইরানে হামলা চালিয়েছে এবং তেহরান পাল্টা শতাধিক দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।

সৌদি আরব ও জর্ডানসহ যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্ররা জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনো সামরিক সংঘাতে নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। ইরানও হুঁশিয়ারি দিয়েছে, প্রয়োজনে তারা মার্কিন ঘাঁটি, ইসরায়েল এবং আরব সাগরে অবস্থানরত মার্কিন নৌবহরকে লক্ষ্যবস্তু করবে।
আরব দেশসমূহ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক মহল কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। ওমানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো প্রস্তাবে ইরান উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক প্রণোদনার ইঙ্গিত দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত ইরানের জন্য যে কোনো চুক্তিতে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার থাকা অপরিহার্য, কারণ গত মাসে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া গণবিক্ষোভের পেছনে অর্থনৈতিক সংকটই ছিল প্রধান কারণ।
ট্রাম্প নিজেকে যুদ্ধ বন্ধকারী নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চান। তাই চুক্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে শাসন পরিবর্তনের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ঘুরিয়ে দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টার ব্যাপারে তাকে সতর্ক থাকতে হবে। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল ও বিতর্কিত হলেও সেসব উদ্বেগের সমাধান কূটনীতির মাধ্যমেই সম্ভব। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় রিয়াদ ও তেহরানের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া প্রমাণ করেছে যে সংলাপ সম্ভব।
ইরান ভেনেজুয়েলা নয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বড় ধরনের হামলা এমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, যা পুরো অঞ্চলকে গ্রাস করবে।
ট্রাম্প প্রশাসন ও কংগ্রেসের ভেতরে শাসন পরিবর্তনের পক্ষে যে কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে, তাদের বিপজ্জনক বক্তব্য যেন সিদ্ধান্ত নির্ধারণে প্রভাব না ফেলে। যদি কূটনীতিই তার পছন্দের পথ হয়, তবে তাকে সেই পথ কার্যকর হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
ট্রাম্প এখন ইরানের সঙ্গে নতুন একটি চুক্তি করার অবস্থানে আছেন—যা ২০১৫ সালের যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার বিকল্প হতে পারে, যে চুক্তি থেকে তিনি ২০১৮ সালে সরে গিয়েছিলেন। তিনি দাবি করতে পারেন যে তিনি আরও ভালো একটি চুক্তি করেছেন—যেখানে সময়সীমা নেই, নজরদারি কাঠামো আরও শক্তিশালী এবং তেহরানের প্রতিশ্রুতি আরও দৃঢ়। পাশাপাশি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে এক নজিরবিহীন বাণিজ্য চুক্তির কৃতিত্বও নিতে পারেন।
এমন একটি উত্তরাধিকারই অনুসরণ করার মতো—যা অনির্দিষ্ট ও অনিশ্চিত পরিণতির যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।
ওসামা আল-শরীফ 


















