বহু বছর ধরে পশ্চিমা বিশ্বে হস্তক্ষেপপন্থীরা যুক্তি দিয়ে আসছিলেন যে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য—যেমন দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক স্থবিরতা—একটি সহিংস বাহ্যিক শাসন পরিবর্তনের ঝুঁকির চেয়ে বেশি। গত মাসে জানুয়ারির রক্তাক্ত বিক্ষোভ দমন এবং পশ্চিমা গণমাধ্যমে ইরানি বিরোধীদের বিস্তৃত ইতিবাচক প্রচারের ফলে হস্তক্ষেপের তথাকথিত ‘নৈতিক বাধা’ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
এর অল্প সময় পরই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হস্তক্ষেপ ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানিদের ‘উঠে দাঁড়াতে’ আহ্বান জানান। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও অন্যান্য শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তার হত্যাকে বড় সাফল্য হিসেবে উদযাপন করা হয়।
কিন্তু এই ধারণা যে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অপসারণ একটি ‘স্বল্প ও সিদ্ধান্তমূলক বিচ্ছেদ’ ঘটাবে এবং তারপর মসৃণ রূপান্তর আসবে—তা মোটেও নিশ্চিত নয়। বরং খামেনির পর ইরান হস্তক্ষেপপন্থীরা যেমনটি আশা করছেন, বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।

ভুল পথে শাসন পরিবর্তনের নজির
বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক তিনটি উদাহরণ দেখায় কেন বাইরের হস্তক্ষেপ স্থিতিশীলতা আনে না। আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, বাহ্যিক সামরিক অভিযানের পর দ্রুত স্থিতিশীলতা নয়, বরং বিশৃঙ্খলাই দেখা দেয়।
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর আফগানিস্তানে শাসন পরিবর্তন হয় এবং পরবর্তী দুই দশক জুড়ে যুদ্ধ ও বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা চলতে থাকে। ২০২১ সালে উৎখাত হওয়া শক্তির প্রত্যাবর্তন ঘটে, কিন্তু স্থিতিশীলতা এখনও অধরা।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর ইরাকে বিভিন্ন বিদ্রোহ ও গৃহযুদ্ধ দেখা দেয়। গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দেশটি এখনও ২০০৩-পূর্ব স্থিতিশীলতায় ফিরতে পারেনি।
২০১১ সালে ন্যাটো নেতৃত্বাধীন হস্তক্ষেপের পর লিবিয়া ভেঙে পড়ে। দেশটি ইতিবাচক স্থিতিশীলতা সূচক থেকে নেমে বিশ্বের নিম্নতম অবস্থানে পৌঁছায় এবং পুনরুদ্ধারের কোনো লক্ষণ নেই। ত্রিপোলি ও বেনগাজিকে কেন্দ্র করে দ্বৈত শাসনব্যবস্থা এখনো বিদ্যমান।
এই দেশগুলোর কোনোটিই হস্তক্ষেপ-পূর্ব স্থিতিশীলতায় ফিরতে পারেনি। তাদের পথ দীর্ঘস্থায়ী ভঙ্গুরতা ও অস্থিরতায় চিহ্নিত, ক্ষণস্থায়ী সমন্বয়ের প্রতিশ্রুতিতে নয়।

যে শাসন পরিবর্তন নাও ঘটতে পারে
ইরানের শাসনব্যবস্থা আফগানিস্তান, ইরাক বা লিবিয়ার পতিত ব্যবস্থার মতো নয়। খামেনির হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রভঙ্গের বদলে ভিন্ন ধরনের গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
শিয়া ইসলামের প্রতীকী জগতে, যেখানে অধিকাংশ ইরানির অবস্থান, খামেনির মৃত্যু শহিদির বর্ণনার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। ইসলামের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত শক্তির হাতে মৃত্যু পরাজয় নয়, বরং আত্মত্যাগের মাধ্যমে পবিত্র সমাপ্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। অন্য মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের মতো তিক্ত পতন নয়, বরং রাজনৈতিক জীবনের এক ধরনের পবিত্রীকরণ।
এই শহিদি বয়ান জনসংখ্যার একটি বড় অংশকে, এমনকি পূর্বে নেতৃত্বের সমালোচক ছিলেন এমন লোকজনকেও, জাতীয় প্রতিরক্ষার কাহিনির চারপাশে একত্র করতে পারে। ‘বিদেশি আগ্রাসন’-এর শহিদ হিসেবে পতিত নেতাকে উপস্থাপন করে রাষ্ট্র জাতীয় সংহতি ও বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে ক্ষোভ উসকে দিতে পারে। এতে নিরাপত্তা বাহিনী ও ঐতিহ্যবাদী সমাজখাত অপ্রত্যাশিতভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে।

প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা নাকি ভাঙন
ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখায়, শক্তিশালী প্রশাসনিক, নিরাপত্তা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাহ্যিক হস্তক্ষেপ দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ডেকে আনে।
ইরানের ক্ষেত্রে এখন বড় প্রশ্ন হলো প্রশাসনিক সংহতি ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় থাকবে কি না। এটি নির্ভর করছে তথাকথিত ‘গভীর রাষ্ট্র’—স্থিতিশীল আমলাতন্ত্র ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক শ্রেণির টিকে থাকার ওপর।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক, মন্ত্রণালয় ও আঞ্চলিক গভর্নরদের দপ্তর যদি নেতৃত্বশূন্যতার মধ্যেও কার্যকর থাকে, তবে লিবিয়ার মতো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা এড়ানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে নিয়মিত সেনাবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ঐক্য বজায় থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন এমন নেতৃত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন। জানুয়ারির রক্তাক্ত দমন-পীড়ন জনগণ ও রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে গভীর বিভাজন তৈরি করেছে। ব্যবস্থাপনাগত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কিছু রাজনৈতিক বা সামরিক ব্যক্তিত্ব নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক স্থিতিশীলতার চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু তারা প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার আধ্যাত্মিক কর্তৃত্বের অধিকারী নন।

খামেনির পর অস্থিরতার আশঙ্কা
প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়লে বা সেনাবাহিনী ও বিপ্লবী গার্ডের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হলে বিভক্তি ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে। যে সহিংস বিচ্ছেদের আহ্বান এখন শোনা যাচ্ছে, তা হয়তো এক গভীর নিরাপত্তাহীনতার চক্রের সূচনা করবে, যার মূল্য দেবে ইরানের সাধারণ মানুষ।
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞায় ইরানের মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। রাজনৈতিক রূপান্তরের সময় এই শ্রেণিই সাধারণত স্থিতিশীলতার ভিত্তি গড়ে তোলে। শক্তিশালী মধ্যবিত্ত না থাকলে ক্ষমতার শূন্যতা সশস্ত্র গোষ্ঠী বা চরমপন্থী শক্তি পূরণ করতে পারে।
বর্তমান নিরাপত্তা কাঠামোর কঠোরপন্থী অংশগুলো নতুন ব্যবস্থাকে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখলে তারা শান্তিপূর্ণভাবে মিলিয়ে যাবে না। বরং তারা বিকেন্দ্রীভূত বিদ্রোহী গোষ্ঠীতে রূপ নিতে পারে এবং স্থিতিশীলতার যেকোনো প্রচেষ্টা নস্যাৎ করতে পারে।
ইরানের জাতিগত ও ভাষাগত বৈচিত্র্যও বড় চ্যালেঞ্জ। কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব দুর্বল হলে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাতে রূপ নিতে পারে। বড় শহরগুলোতেও স্থানীয় মিলিশিয়াদের উত্থান ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে সামরিক ও রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে নেতৃত্ব দখলের লড়াই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংঘর্ষক্ষেত্রে পরিণত করতে পারে।

তিক্ত সমাপ্তি নাকি অনন্ত তিক্ততার শুরু
সম্প্রতি কেউ কেউ বলছেন, অন্তহীন তিক্ততার চেয়ে তিক্ত সমাপ্তি ভালো। এই যুক্তিতে ইরানে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপকে সমর্থন করা হচ্ছে, যেন দ্রুত সমাধান সম্ভব।
কিন্তু ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখায়, যুদ্ধের ফল সরলরৈখিক নয়। তা প্রায়ই অনিশ্চিত ও দীর্ঘস্থায়ী অবনতির সূচনা করে। খামেনির মৃত্যু একটি যুগের প্রতীকী সমাপ্তি হতে পারে, কিন্তু ইতিহাস ইঙ্গিত দেয় যে সহিংস বিচ্ছেদের প্রত্যাশিত ফল প্রায়ই দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়।
ইরানের মানুষের জন্য একটি শাসনের তিক্ত সমাপ্তি হয়তো তাদের কষ্টের শেষ অধ্যায় নয়; বরং অনন্ত তিক্ততার এক নতুন যুগের সূচনা, যার ছায়া বহু দশক ধরে অঞ্চলজুড়ে বিরাজ করতে পারে।
মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগান 


















