প্রায় চার দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরান নেতৃত্ব পরিবর্তনের দোরগোড়ায়—সম্ভবত শাসনব্যবস্থারও পরিবর্তন। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনির দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘনিয়ে আসছে। জুন মাসে ১২ দিনের এক যুদ্ধে তাঁর নির্মিত ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা প্রকাশ্যে আসে। ইসরায়েল ইরানের শহর ও সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানে, আর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ১৪টি বাঙ্কার-ধ্বংসী বোমা নিক্ষেপ করে। এই যুদ্ধ দেখিয়ে দেয় তেহরানের আদর্শিক দম্ভ আর বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে বিশাল ফারাক। আঞ্চলিক প্রভাব অনেকটাই হারানো, আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, রাস্তাঘাটে কর্তৃত্ব কমে যাওয়া—সব মিলিয়ে এক ক্লান্ত শাসনব্যবস্থার চিত্র স্পষ্ট হয়। যুদ্ধ শেষে ৮৬ বছর বয়সী খামেনি আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে কর্কশ কণ্ঠে বিজয় ঘোষণা করেন—যা শক্তির প্রদর্শনের বদলে দুর্বলতাকেই উন্মোচিত করে।
আয়াতোল্লাদের এই শরৎকালে মূল প্রশ্ন হলো, ১৯৮৯ সাল থেকে যে ধর্মতান্ত্রিক শাসন চলছে তা টিকে থাকবে, রূপান্তরিত হবে, নাকি ভেঙে পড়বে—এবং তার পর কী ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লব ইরানকে পশ্চিমাপন্থী রাজতন্ত্র থেকে ইসলামি ধর্মতন্ত্রে রূপান্তর করে, রাতারাতি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র থেকে শত্রুতে পরিণত করে। আজও ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র—জ্বালানি শক্তিধর দেশ, যার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। ফলে খামেনির পর কে বা কী আসছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
গত দুই বছরে—বিশেষত ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের পর, যেটিকে খামেনি প্রকাশ্যে সমর্থন করেন—ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রকল্পকে কার্যত ছাইয়ে পরিণত করেছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ সামরিক ও রাজনৈতিক সহচররা নিহত বা হত্যা হয়েছেন। আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠী দুর্বল হয়েছে। বিপুল অর্থব্যয়ে গড়া পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র সামরিক অপমানকে জাতীয়তাবাদী উন্মাদনায় রূপ দিতে চাইলেও দৈনন্দিন জীবনের সংকট আড়াল করা যায় না। ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের দেশ ইরান দশকের পর দশক বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন। তাদের অর্থনীতি বিশ্বের অন্যতম নিষেধাজ্ঞাগ্রস্ত। মুদ্রা সবচেয়ে অবমূল্যায়িতগুলোর একটি। পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা সীমিত। ইন্টারনেট কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। বায়ুদূষণ মারাত্মক।
শাসনের স্লোগান—আমেরিকার মৃত্যু, ইসরায়েলের মৃত্যু—কখনও ইরানের দীর্ঘজীবন নয়। উন্নয়নের চেয়ে অস্বীকৃতি ও প্রতিরোধই অগ্রাধিকার। বিদ্যুৎ বিভ্রাট, পানি রেশনিং নিত্যসঙ্গী। বাধ্যতামূলক হিজাব, যাকে আয়াতোল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনি বিপ্লবের পতাকা বলেছিলেন, আজ ছিন্নভিন্ন। ক্রমবর্ধমান সংখ্যক নারী প্রকাশ্যে চুল ঢাকার বাধ্যবাধকতা অমান্য করছেন। রাষ্ট্র যেমন আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ, তেমনি নারীদেরও নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ।
ইরান কীভাবে এই পর্যায়ে এল তা বুঝতে খামেনির ৩৬ বছরের শাসনের মূল নীতিগুলো দেখতে হবে। তাঁর শাসন দুটি স্তম্ভে দাঁড়ানো—বিপ্লবী আদর্শে অটল থাকা এবং রাজনৈতিক সংস্কার সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান। তিনি বিশ্বাস করেন আদর্শ শিথিল করলে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো পতন অনিবার্য। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করাও তাঁর কাছে অগ্রহণযোগ্য।
খামেনির বয়স, অনমনীয়তা ও সম্ভাব্য বিদায় ইরানকে দীর্ঘ ক্ষয় আর আকস্মিক বিস্ফোরণের মাঝামাঝি ঝুলিয়ে রেখেছে। তাঁর পর ভবিষ্যৎ নানা রকম হতে পারে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বগ্রাসী আদর্শ ভেঙে শক্তিমান শাসকের জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গড়তে পারে, যেমন সোভিয়েত-পরবর্তী রাশিয়া। আবার মাও-পরবর্তী চীনের মতো কঠোর আদর্শ বাদ দিয়ে বাস্তববাদী পথে হাঁটতে পারে। উত্তর কোরিয়ার মতো দমন-পীড়ন ও বিচ্ছিন্নতায় দ্বিগুণ জোর দিতে পারে। পাকিস্তানের মতো ধর্মীয় শাসন থেকে সামরিক প্রাধান্যে যেতে পারে। কিংবা ১৯০৬ সালের সাংবিধানিক বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনের দিকে ঝুঁকতে পারে—যদিও তা এখন কম সম্ভাব্য। যে পথই হোক, তা শুধু ইরানিদের নয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করবে।

ভয় ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি
ইরানিরা নিজেদের প্রাচীন সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি মনে করলেও আধুনিক ইতিহাস বারবার আক্রমণ, অপমান ও বিশ্বাসঘাতকতায় চিহ্নিত। উনিশ শতকে রাশিয়ার কাছে ককেশাস হারায়, ব্রিটিশ চাপে হেরাত ছাড়ে। বিশ শতকের শুরুতে রাশিয়া ও যুক্তরাজ্য দেশটিকে প্রভাবক্ষেত্রে ভাগ করে। ১৯৪৬ সালে সোভিয়েত বাহিনী আজারবাইজান দখলের চেষ্টা করে। ১৯৫৩ সালে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক অপসারিত হন।
এই ইতিহাস শাসকদের মধ্যে গভীর সন্দেহ জন্ম দিয়েছে। রেজা শাহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রশক্তির চাপে সিংহাসন ত্যাগে বাধ্য হন। তাঁর ছেলে মোহাম্মদ রেজা শাহ মনে করতেন মার্কিন প্রতিশ্রুতি তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করেছে। খোমেনি ক্ষমতায় এসে হাজারো বিরোধীকে বিদেশি এজেন্টের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেন। খামেনিও প্রায় প্রতিটি ভাষণে আমেরিকা ও জায়নবাদী ষড়যন্ত্রের কথা বলেন।
এই অবিশ্বাস কেবল শাসকদের নয়, সমাজজুড়েও। জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ ইরানি মনে করেন মানুষকে সহজে বিশ্বাস করা যায় না। বহিরাগত শত্রু, ভেতরের বিশ্বাসঘাতক—এই ধারণাই রাজনীতিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
ইরান রাশিয়ার পথে?
আজকের ইসলামি প্রজাতন্ত্র অনেক দিক থেকে শেষ পর্যায়ের সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো—আদর্শিক ক্লান্তি, সংস্কারের ভয়, রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন সমাজ। সোভিয়েত পতনের পর বিশৃঙ্খলা ও বৈষম্যের ভেতর থেকে ভ্লাদিমির পুতিনের উত্থান ঘটে—যিনি কমিউনিজমের বদলে জাতীয়তাবাদকে হাতিয়ার করেন। ইরানেও তেমন এক শক্তিমান শাসক উত্থান সম্ভব—যিনি শিয়া আদর্শের বদলে ক্ষোভ-নির্ভর ইরানি জাতীয়তাবাদে নতুন কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র গড়বেন।
ইরান চীনের পথে?
মাও-পরবর্তী চীন আদর্শের কঠোরতা ছেড়ে অর্থনৈতিক বাস্তববাদে ঝুঁকে টিকে যায়। ইরানেও কেউ কেউ চান আদর্শ নরম করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে। কিন্তু খামেনির বিরোধিতা ও শক্ত ঘাঁটির কারণে তা সহজ নয়। অর্থনৈতিক উন্নতি ছাড়া আদর্শ ত্যাগ করলে শাসনব্যবস্থা জনসমর্থন হারাতে পারে।
ইরান উত্তর কোরিয়ার পথে?
যদি আদর্শই অগ্রাধিকার থাকে, তবে কঠোর দমন-পীড়ন ও বিচ্ছিন্নতার পথে হাঁটতে পারে ইরান। ক্ষমতা একটি সংকীর্ণ গোষ্ঠী বা পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত হতে পারে। তবে সমাজের বড় অংশ এমন ব্যবস্থা মেনে নিতে চাইবে না।

ইরান পাকিস্তানের পথে?
বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ইতিমধ্যে অর্থনীতি, সামরিক ও রাজনীতিতে প্রভাবশালী। পাকিস্তানের মতো সামরিক প্রাধান্যপূর্ণ রাষ্ট্রে রূপান্তরের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে গার্ডদের মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, যা খামেনির অনুপস্থিতিতে প্রকাশ্যে আসতে পারে।
স্বাভাবিক জীবনের আকাঙ্ক্ষা
ইতিহাস দেখায় ভবিষ্যদ্বাণী প্রায়ই ভুল হয়। ১৯৭৯ সালের আগে অনেকেই ভেবেছিলেন ধর্মীয় নেতারা সরাসরি শাসনে আসবেন না। বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। আজও অপ্রত্যাশিত দৃশ্যপট সম্ভব—রাজতন্ত্রপন্থী পুনরুত্থান থেকে শুরু করে জাতিগত ভাঙন পর্যন্ত।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরানিরা ফাঁকা স্লোগান বা ব্যক্তিপূজা চান না। তারা চান জবাবদিহিমূলক, দক্ষ সরকার, যা অর্থনৈতিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেবে এবং তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপনের সুযোগ দেবে—কী পরবেন, কী দেখবেন, কাকে ভালোবাসবেন বা কী খাবেন, তা রাষ্ট্র নির্ধারণ করবে না।
কারিম সাদজাদপুর 


















