কারিম সাদজাদপুরের সঙ্গে কানিশ্ক থারুরের কথা
২৮ ফেব্রুয়ারির সকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে। সামরিক স্থাপনা, ইরানি নেতাদের বাসভবন ও কার্যালয়, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামো এবং পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় আঘাত হানা হয়। জবাবে ইরান ইসরায়েল ও অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই হামলার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ইরানের শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করা। তাঁরা ইরানিদের রাস্তায় নেমে সরকার পতনের আহ্বানও জানিয়েছেন। অপ্রমাণিত কিছু প্রতিবেদনে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর কথা বলা হলেও ইরানি কর্মকর্তারা তা অস্বীকার করেছেন।
এই হামলার তাৎপর্য বুঝতে ফরেন অ্যাফেয়ার্স কথা বলেছে কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস–এর জ্যেষ্ঠ ফেলো কারিম সাদজাদপুরের সঙ্গে। উপসম্পাদক কানিশ্ক থারুরের সঙ্গে শনিবার সকালে তাঁর আলাপ হয়। সংক্ষিপ্ততা ও স্পষ্টতার জন্য কথোপকথনটি সম্পাদিত হয়েছে।
নতুন হামলায় ইরানিদের প্রতিক্রিয়া
২০২৫ সালের জুনে যা ঘটেছিল, তার তুলনায় এই যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযান আকার ও প্রত্যাশায় ভিন্ন। খুব প্রাথমিক পর্যায়ে হলেও দেখা যাচ্ছে, ইরানে প্রতিক্রিয়া মিশ্র। কোথাও নীরব উল্লাস, কোথাও যুদ্ধের ভয়াবহতা। সামাজিক মাধ্যমে এমন ভিডিও ছড়িয়েছে যেখানে মানুষ রাস্তায় নাচছে, বারান্দা থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখছে খামেনির কমপাউন্ডে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতের পর। একই সঙ্গে বেসামরিক হতাহতের খবরও আসছে। দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি মেয়েদের স্কুলে বোমা হামলায় কয়েক ডজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে সংবাদে জানা গেছে।
ট্রাম্প মানুষকে বোমাবর্ষণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়ে পরে দেশ পুনর্দখলের কথা বলেছেন। তিনি একে “এক প্রজন্মে একবারের সুযোগ” বলে উল্লেখ করেন। আগামী দিনগুলোতে বোঝা যাবে, ইরানিরা এটিকে শাসনের বিরুদ্ধে ওঠে দাঁড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখছেন, নাকি গত মাসে হাজারো মানুষ হত্যাকারী নিরাপত্তা বাহিনীর ভয়ে নীরব থাকবেন।
অভিযানের সময় ও উদ্দেশ্য
ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, শাসন পরিবর্তন এই অভিযানের লক্ষ্য। তবে তিনি এটাও বলেছেন যে ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল। সাদজাদপুরের মতে, ইতিহাসবিদেরা হয়তো একে প্রয়োজনের যুদ্ধ নয়, বরং পছন্দের যুদ্ধ হিসেবে দেখবেন। ইরান অবিলম্বে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে যাচ্ছে—এমন প্রমাণ ছিল না, কিংবা যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক হামলার আশঙ্কাও ছিল না। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের দুর্বল প্রতিপক্ষের দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে চেয়েছে। জুনের যুদ্ধের পর ইরান কার্যত নিজ আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে, আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠী দুর্বল হয়েছে এবং সাম্প্রতিক গণআন্দোলনে শাসনব্যবস্থা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বিশ্বাসযোগ্যতাও এখানে বড় বিষয়। জানুয়ারিতে তিনি অন্তত নয়বার সতর্ক করেছিলেন, প্রতিবাদকারীদের হত্যা করলে যুক্তরাষ্ট্র সাহায্যে আসবে। তিনি মানুষকে রাস্তায় নামতে উৎসাহিত করেছিলেন এবং বলেছিলেন সাহায্য আসছে। তাঁর কাছে তাৎক্ষণিক হুমকির চেয়ে নিজের অবস্থান রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।
ইরানের সম্ভাব্য জবাব
ইরানি শাসনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই সহিংস, কিন্তু আত্মঘাতী নয়। তাদের মূল লক্ষ্য ক্ষমতায় টিকে থাকা। এখন তাদের সামনে সিদ্ধান্ত—সব শক্তি উজাড় করে পাল্টা আঘাত হেনে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে কি, যা শাসনের পতন ডেকে আনতে পারে; নাকি সীমিত প্রতিশোধ নিয়ে আশা করবে যে অভিযান থেমে যাবে এবং তারা ধ্বংসস্তূপ থেকে টিকে উঠবে।
ইতিহাস বলছে, তারা সাধারণত সংযমের পথ বেছে নিয়েছে। প্রশ্ন হলো, তারা কি অর্থবহ প্রতিরোধ গড়বে, নাকি পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক মিত্রদের প্রশ্নে বড় ছাড় দিয়ে সামরিক অভিযান বন্ধের চেষ্টা করবে। তারা জানে, সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের তুলনা হয় না। জেতা নয়, বেঁচে থাকাই তাদের লক্ষ্য।
খামেনির মৃত্যু হলে কী
যদি সত্যিই খামেনি নিহত হন, তাহলে নিরাপত্তা বাহিনী ঐক্যবদ্ধ হয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করতে পারে। আবার এটিও হতে পারে, নেতৃত্বের শীর্ষে আঘাত জাহাজে বড় গর্তের মতো পরিস্থিতি তৈরি করবে, যার ফলে শাসন কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে। ইরানি কর্মকর্তাদের জন্য নির্বাসনের নিরাপদ জায়গা খুব কম। অনেকের বিশ্বাস, হয় হত্যা করতে হবে, নয়তো নিহত হতে হবে।
সম্ভবত দ্রুত নতুন কোনো নেতা—ধর্মীয় আলেম বা বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডারের—পেছনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা হবে। তবে চার দশক শাসন করা ব্যক্তির আকস্মিক প্রস্থান বড় ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি করে, যা পূরণে সময় লাগে।
বিদ্রোহের সম্ভাবনা
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু মনে করছেন, এই হামলা ইরানের অভ্যন্তরীণ দমনযন্ত্রকে দুর্বল করবে এবং বিরোধীদের সংগঠিত হতে সাহায্য করবে। তবে সাদজাদপুরের মতে, বিষয়টি রাজনৈতিক বিজ্ঞানের চেয়ে মনস্তত্ত্ব দিয়ে বোঝা ভালো। গত ছয় সপ্তাহে ব্যাপক হত্যাকাণ্ডে ইরানি সমাজ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। লক্ষাধিক পরিবার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। মানুষ অপেক্ষায় ছিল ট্রাম্প কী করেন।
নিরাপত্তা বাহিনী সশস্ত্র, সংগঠিত এবং ক্ষমতায় টিকে থাকতে হত্যা করতে প্রস্তুত। বিরোধীরা সংখ্যায় বেশি হলেও তারা নিরস্ত্র ও ছড়ানো। ইতিহাস বলে, বিপ্লবে অনুপ্রেরণাদায়ী ও সাংগঠনিক—দুই ধরনের নেতৃত্ব দরকার। অনেক ইরানি প্রাক্তন শাহের পুত্র রেজা পাহলভির চারপাশে অনুপ্রেরণার কেন্দ্র খুঁজেছেন, যদিও সবাই নন। কিন্তু ভেতরে সাংগঠনিক নেতৃত্ব কতটা আছে, তা অনিশ্চিত।
বিপ্লব টিকে থাকতে সমালোচনামূলক জনসমর্থন দরকার। কিন্তু মানুষ নিশ্চিত না হলে যোগ দেয় না। কেউ হারতে চায় না, কেউ নিছক বলি হতে চায় না। তাই প্রশ্ন রয়ে যায়—আবার কি প্রতিবাদ শুরু হবে, তা কি বিস্তৃত হবে, আর মানুষ কি বিশ্বাস করবে যে শাসনের দমনযন্ত্র ভেঙে পড়েছে?
জাতীয়তাবাদী প্রভাব
বাইরের হামলা সাধারণত মানুষের আগের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও জোরদার করে। শাসন সমর্থকেরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও ক্ষুব্ধ হয়। বিরোধীরা শাসনকেই দায়ী করে। ফলে অবস্থান বদল কম হয়। জুনে যেমন সাময়িক উচ্ছ্বাস ছিল, তেমন একটি স্বল্পমেয়াদি প্রভাব দেখা যেতে পারে। কিন্তু ধুলো থিতিয়ে গেলে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট আবার সামনে আসবে। খামেনি বেঁচে থাকলেও তাঁর বয়স ৮৬। নেতৃত্ব পরিবর্তনের দোরগোড়ায় ইরান দাঁড়িয়েই আছে।
পরিবর্তনের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি
অনিরাপত্তা সাধারণত নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষে যায়। ক্ষমতার শূন্যতায় লেখক বা মানবাধিকারকর্মীরা নয়, সহিংসতা সংগঠিত করতে সক্ষম শক্তিই এগিয়ে আসে। ইতিহাস বলছে, স্বৈরশাসন থেকে পরিবর্তনের তিন-চতুর্থাংশ ক্ষেত্রেই আরেক স্বৈরশাসন আসে। সহিংসতার মাধ্যমে পরিবর্তন হলে গণতন্ত্রের সম্ভাবনা আরও কমে।
সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হতে পারে আঞ্চলিক যুদ্ধ। উপসাগরীয় দেশগুলো গত কয়েক দশকে আর্থিক, পরিবহন ও প্রযুক্তি কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। ইরান যদি তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে, তা বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি করবে। অভ্যন্তরে শাসন আরও নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারে, কিংবা রাষ্ট্র ভেঙে গৃহযুদ্ধও হতে পারে।
তবু আশার জায়গা আছে। ইরানের মানবসম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও ঐতিহ্য তাকে জি-২০ দেশের কাতারে থাকার সম্ভাবনা দেয়। যদি ইরানিরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন, তাহলে প্রতিনিধিত্বমূলক সহনশীল গণতন্ত্র, অথবা অন্তত এমন এক স্থিতিশীল রাষ্ট্রের দিকে যাত্রা সম্ভব, যেখানে মতাদর্শের আগে জাতীয় স্বার্থ ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এটি জটিল ও উদ্বেগময় সময়। সুড়ঙ্গের শেষে আলো দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সেই সুড়ঙ্গ ভেঙে পড়বে কি না—তা এখনো অনিশ্চিত।
কারিম সাদজাদপুর 



















